শাহানুর রহমান রানা
বিগত সময়ের মতো এবারো রাজশাহী শহরে মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ীরা ঈদ কেন্দ্রিক ব্যবসায়ে তেমন কোন মুনাফা দেখছেনা বলে মন্তব্য তাদের। বিনিয়োগের বিপরীতে আনুপাতিক লভ্যাংশের মাত্রা তলানির দিকে থাকায় দোষারোপ করছেন লবনের মূল্য বৃদ্ধিসহ চামড়ার দর পতনকে। এদিকে, চামড়ার খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে চাহিদার তুলনায় বিপুল পরিমাণ চামড়ার সরবরাহ এর মূলকারণ। আর চাহিদা কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে তারা রপ্তানী পড়ে যাওয়ার কথাও বলছেন। সরকার অবশ্য বলছে যে, গতবারের তুলনায় এবার লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম ৬ শতাংশ বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে। চামড়ার দাম ধরে রাখতে ঈদ পরবর্তী সাত দিন ঢাকার বাইরে থেকে ট্যানারিগুলোতে চামড়া প্রবেশ না করতে দেয়া। কিন্তু সরকারের এই নিয়মের বিপরীতে মৌসুমী ব্যবসায়ীদের ভাষ্যটা কিছুটা অন্যরকম।
রাজশাহী জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডক্টর জুলফিকার মোঃ আখতার হোসেন জানান, এবার রাজশাহী জেলাতে সর্বমোট ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৫৪৭ টি পশু কোরবানী হয়েছে। এরমধ্যে গরু ও মহিষের সংখ্যা ৭৪,৪৯৬ টি আর ছাগল ও ভেড়া ২ লাখ ৭১ হাজার ৫১টি। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দেয়া তথ্যানুযায়ী, রাজশাহী বিভাগে এই ঈদে সর্বমোট ৩৪ হাজার কোটি টাকার পশু বিক্রি হয়েছে। প্রায় বিশ বছর ধরে প্রতি ঈদে চামড়ার ব্যবসা করা নাসির জানান, গত কয়েক বছর ধরে চামড়ার দামে যে ধ্বস নেমেছিল বর্তমানে সেটি এখন কিছুটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠলেও; বিনিয়োগের বিপরীতে এখনো পর্যন্ত মুনাফার নেই তেমন কোন উর্দ্ধগতি। এদিকে, চামড়া ব্যবসার সাথে জড়িতরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকাতে ঈদ পরবর্তী একসপ্তাহ চামড়া প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকায় এই বর্ষা মৌসুমে লবণযুক্ত চামড়া উন্মুক্ত ও খোলামেলা স্থানে সংরক্ষণ করাটা একদিকে যেমন ঝুঁকিপূর্ণ; অন্যদিকে ব্যয়বহুলও বটে। লবণের দাম গেল বছরের তুলনায় এবার দ্বিগুণ। যার কারণে চামড়া সংরক্ষণের ক্ষেত্রে প্রাত্যহিক ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকার এবার ঢাকার বাইরে লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৪৫-৪৮ টাকা নির্ধারণ করেছে। গত বছর এই দাম ছিল ৪০-৪৪ টাকা। গত বছর ছাগলের চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রতি বর্গফুট ১৮-২০ টাকা যা এ বছরও অপরিবর্তিত রাখা রয়েছে। সরকার থেকে দাম বৃদ্ধির পরেও কেনো ক্ষতির সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছে জানতে চাইলে রাজশাহী নগরীর মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ীরা দৈনিক আমাদের রাজশাহীকে জানান, সরকার থেকে চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয়া হলেও মফস্বল শহরগুলোতে মৌসুমী ব্যবসায়ীরা ট্যানারী মালিকদের কাছে চামড়া বিক্রির সময় সেই হারে দাম পাননা। এছাড়া আরো একটি সমস্যা হলো, প্রতিবছর কুরবানীর সময় হলেই লবণ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি হয়ে যায় চামড়া ব্যবসায়ীরা। কোরবানী ঈদ আসলেই খোলাবাজারে লবণের দাম রাতারাতিই দ্বিগুণ হয়ে যায়। চামড়া কয়েকদিন মজুদ রাখার জন্য লবণ একটি অপরিহার্য উপাদান। নগরীর চামড়া ব্যবসায়ীর দোকানে কর্মরত ও লবণযুক্ত কাঁচা চামড়ার রক্ষনাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা মাহাবুল জানান, গেলবছর ৬৫ কেজি ওজনের যে বস্তার দাম ছিল ৮০০ টাকা। এবার সেই বস্তার দাম বৃদ্ধি পেয়ে দাড়িয়েছে ১৫০০ টাকায়। বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করে চামড়া ব্যবসায়ীরা বলেন, লবণের দাম প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও সেই অনুপাতে চামড়ার মূল্য বৃদ্ধির বিষয়টি একেবারেই তলানীতে। ব্যবসায়ীরা আরো জানান, এবারের সমূহ ক্ষতি হবার আরো একটি অন্যতম কারণ হলো, চামড়ার দরপতন ঠেকাতে এবং চাহিদা ও যোগানের বিষয়টিকে স্থিতিশীলবস্থায় রাখতে ঈদ পরবর্তী সাতদিন ঢাকার বাইরে থেকে রাজধানীর ট্যানারীগুলোতে লবণমুক্ত চামড়া প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা। সিদ্ধান্ত মন্দ না হলেও দেশের বিভিন্ন শহর ও অঞ্চলভিত্তিক মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ীদের জন্য সংরক্ষণের বিষয়টি বেশ ব্যয়বহুল। কারণ, সাত-আটদিন কাঁচা চামড়া রক্ষণাবেক্ষণ করতে যে অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। সেটির মার্জিনও কিন্তু কম না। এই অতিরিক্ত খরচের হিসেব চামড়ার দরের সাথে যোগ-বিয়োগ করতে গেলে লাভ লোকসানের হিসেব কষতে গেলে বলা যায়, নগরীতে এবারো গতিহীনতা গ্রাস করেছে চামড়ার ব্যবসাকে। এর অন্যতম কারণ হলো, লবণ বাজারের উর্দ্ধগতি। যার কারণে চামড়া ব্যবসায় ভর করেছে শনি। এবিষয়ে নাটোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের সদস্য আব্দুল হামিদকে ফোন করলে তিনি জানান, লবণ তো আমাদের দেশেই উৎপাদন হয়। তাছাড়া চাহিদার চাইতে উৎপাদন বেশিই হয়। তার পরেও কোরবানী ঈদ আসলেই খোলাবাজারে লবণের দাম দ্বিগুণ হয়ে যাবার কোন কারণ দেখিনা। এই লবণের জন্যই চামড়া ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে। ঢাকার ট্যানারী মালিকরা এখনো গরুর চামড়া কেনা শুরু করেনি। তারা এখন ছাগলের চামড়া ক্রয় করছেন। আরো কয়েকদিন পরে গরুর চামড়া ট্যানারী মালিকরা কেনা শুরু করবেন। সেহিসেবে মৌসুমী ব্যবসায়ীদেরকে আরো কয়েকদিন লবণযুক্ত চামড়াগুলো নিজেদের সংরক্ষণে রাখতে হবে। অর্থ্যাৎ ব্যয় আরো বৃদ্ধি পাবে। যারা এবার কোরবানি দিয়েছেন তারা বলছেন, বছর দশেক আগেও প্রতিটি গরুর চামড়ার দাম গড়ে ১৫০০ টাকা থাকলেও গত দুই-তিন বছর ধরে এটি গড়ে ৫০০ টাকায় নেমে এসেছে। মহলদারপাড় এলাকার বাসিন্দা মজিবর বলেন, ২০১২-১৩ সালের দিকে ৪-৫ মণ ওজনের গরু কোরবানি দিলে সেটির চামড়া বিক্রি করতে পারতাম ১২০০-১৫০০ টাকায়। আর গরু যদি আরো বড় অর্থাৎ ৬-৭ মন হতো তাহলে সেই চামড়া বিক্রি হতো ২০০০-২৫০০ টাকাতে। “আর সেই চামড়া গেল বছর বিক্রি হয়েছে ৩০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকায়। আর এবার কিছুটা দাম বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে সর্বোচ্চ ৬০০ থেকে ৭০০ টাকাতে। এটা কমা শুরু হয়েছে ২০১৬-১৭ সাল থেকে।” রোড নওদাপাড়া এলাকার বাসিন্দা রাব্বানি, শালবাগান এলাকার নয়ন, বেলদারপাড়া এলাকার অলিভ হাসান বলেন, ১০-১২ বছর আগে একটা গরুর চামড়া ২৫০০ থেকে থেকে শুরু করে খুব ভালমানের বড় গরুর চামড়া ৪০০০ টাকা পর্যন্তও বিক্রি করা যেতো। তিনি বলেন, “প্রত্যেক ঈদে চামড়া ব্যবসাকে নিয়ে গড়ে উঠতো মৌসুমী ব্যবসায়িদের দৌড়ঝাপ। এর অধিকাংশই ছিল যুবক ও তরুণ বয়সের উঠতি ছেলেরা। তখন ঈদকে কেন্দ্র করে এটি তাদের কাছে পছন্দের লাভজনক একটি অনিয়মিত মৌসুমী ব্যবসা হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। তাই, ঈদেরদিন গরু কোরবানী দেওয়া মাত্রই হাজির হতো একের পর এক ক্রেতা। কখনো দুইজন আবার কখনোবা তিনজনের একটি করে দল আসতো চামড়া কেনার জন্য। এছাড়াও আসতো নিয়মিত মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিও। আমরা দামাদামি করতাম। আর এখন দামাদামি তো দূরের কথা পাঁচ থেকে সাতমেঅর উর্দ্ধে বিক্রি করা প্রায় অসম্ভব।
প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্যসূত্র থেকে জানা গেছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে চামড়া ও চামড়া পণ্যের রপ্তানি হয়েছে ১১৬.০৯ কোটি ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সেটির মার্জিন বৃদ্ধি পেয়েছিল ১২৩.৪০ কেটি ডলারে। ২০১৭-১৮ তে ১০৮.৫৫ কেটি ডলার, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১০১.৯৭ কোটি ডলার, ২০১৯-২০ অর্থবছরে সেই রপ্তানি মার্জিন হ্রাস পেয়ে ৭৯.৭৬ কোটি ডলারে নেমে আসে। ২০২০-২১ অর্থবছরে কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে দাড়িয়েছিল ৯৪.১৬ কোটি ডলারে। ২০২১-২২ অর্থবছরে সর্বোচ্চ রপ্তানি হয়েছে ১২৪.৫১ কোটি ডলারে। আর সর্বশেষ ২০২২-২৩ (জুলাই-মে) অর্থবছরে আবারো কিছুটা হ্রাস পেয়ে রপ্তানি হয়েছে ১১২.০২ কোটি ডলার।