মঙ্গলবার

১৯শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

৫ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ সংবাদ

অসহায় বৃদ্ধ দম্পতির করুণ কাহিনী

Paris
Update : মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬

মাহবুবুজ্জামান সেতু, নওগাঁ : ‘একমাত্র ছেলে। কত স্বপ্ন নিয়ে, অনেক কষ্ট করে ঢাকার প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ালাম। ভেবেছিলাম বুড়ো বয়সে আমাদের দেখবে। আজ সেই ছেলেই আমাদের পথের ভিখারি বানিয়েছে। ঘরে মাত্র ৫ কেজি চাল আছে। গত ৪ বছর ধরে এই অশান্তিতে একবেলা-দুবেলা খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছি।’ শাড়ির আঁচলে চোখের জল মুছতে মুছতে কথাগুলো বলছিলেন নওগাঁ সদর উপজেলার পারবাঁকাপুর গ্রামের বৃদ্ধ আব্দুল জলিল শেখের স্ত্রী মঞ্জোয়ারা বেগম। নাড়িছেঁড়া ধনের এমন নির্মমতার শিকার হয়ে এখন দিশেহারা এই অশীতিপর দম্পতি। নিজের মেধা ও হাড়ভাঙা পরিশ্রমে গড়া কোটি টাকার সম্পত্তিই আজ তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জমিজমা আত্মসাৎ, শারীরিক-মানসিক নির্যাতন আর একের পর এক চক্রান্তের শিকার হয়ে ন্যায়বিচারের আশায় তারা এখন দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ভুক্তভোগী আব্দুল জলিল শেখের (৮৩) আদি বাড়ি নওগাঁর আত্রাই উপজেলার শাহাগোলা ইউনিয়নের তাড়াতিয়া গ্রামে। নব্বইয়ের দশকে ব্যবসায়িক কারণে তিনি নওগাঁ সদর উপজেলার শৈলগাছি ইউনিয়নের পারবাঁকাপুর গ্রামে জমি কিনে নতুনভাবে জীবনসংগ্রাম শুরু করেন। সেখানে তিনি গড়ে তোলেন একটি আধুনিক নার্সারি ব্যবসা। দিনরাত পরিশ্রম করে শূন্য থেকে প্রায় ২০-২৫ বিঘা জমি ক্রয় করেন তিনি। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই কষ্টের ফসলই যেন আজ তার জন্য ‘যম’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পারিবারিক সূত্র জানায়, ছেলে শেখ আঃ রহমান সাইক ঢাকা থেকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করার পর তাকে প্রতিষ্ঠিত করতে মামাদের সহযোগিতা নিয়ে আরজি নওগাঁ এলাকায় ‘আইআইটিএন’ নামে একটি বেসরকারি পলিটেকনিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন বাবা আব্দুল জলিল। তবে ছেলের চরম অব্যবস্থাপনার কারণে দ্রুতই কলেজটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপরই স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির মদদে বাবার সম্পত্তি গ্রাসের চক্রান্ত শুরু করে সাইক।
অভিযোগ রয়েছে, নতুন ব্যবসার অজুহাতে সাইক তার বাবার কাছে ১০ লাখ টাকা দাবি করে। সে সময় বাবা টাকা দিতে না পারায়, ব্যাংক থেকে লোন নেওয়ার কথা বলে জমি বন্ধক (মর্গেজ) রাখার ছলে কৌশলে পিতার কাছ থেকে ১২ বিঘা (দলিল নং ৮৩৪৩/০৯) এবং মাতার কাছ থেকে ৬ বিঘা (দলিল নং ৮৩৪৫/০৯) মোট ১৮ বিঘা সম্পত্তি নিজের নামে লিখে নেয় চতুর সাইক। ২০২২ সালের দিকে জালিয়াতির বিষয়টি জানাজানি হলে বৃদ্ধ বাবা-মা দলিল রদের জন্য আদালতে মামলা (যুগ্ম জেলা জজ আদালতে ২৯/২৩ ও সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে ২৭৭/২৩ নং) দায়ের করেন। আদালত বাবার পক্ষে একতরফা রায় দিলে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে ছেলে। মামলাটি বর্তমানে উচ্চ আদালতে চলমান থাকা অবস্থাতেই সাইক জালিয়াতির মাধ্যমে সেই সম্পত্তি পুনরায় তার স্ত্রীর নামে রেজিস্ট্রি করে দেয়। তবে পরবর্তীতে উক্ত সম্পত্তির খারিজ বাতিল করে মূল হোল্ডিংয়ে জমি ফেরত দেওয়ার আদেশ প্রদান করেন নওগাঁর সহকারী কমিশনার (ভূমি)।
বৃদ্ধ আব্দুল জলিল ও তার স্ত্রীর অভিযোগ, সম্পত্তি হস্তগত করার পর থেকেই তাদের ওপর শুরু হয় অমানুষিক নির্যাতন। পুত্রবধূ জিনাত জেবিন মুভি শ্বশুরকে নানাভাবে গালিগালাজ করে। ছেলে সাইক একপর্যায়ে বাবার গলায় দড়ি বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়ার হুমকি পর্যন্ত দেয়। এমনকি তাদের নাতি-নাতনিদেরও দাদা-দাদীর কাছে আসতে দেওয়া হয় না। একমাত্র বোনকেও বাপের বাড়িতে আসতে বাধা ও মারধর করা হয়। সাইক নিজে নওগাঁ শহরে বিলাসবহুল ভাড়া বাসায় থাকলেও বৃদ্ধ বাবা-মার কোনো খোঁজ নেয় না, বরং একাধিকবার গ্রামে এসে তাদের মারধর করেছে।
বর্তমানে বৃদ্ধ আব্দুল জলিল মারাত্মক অসুস্থ। দুই হাঁটু অপারেশন করতে প্রায় ১০ লক্ষাধিক টাকার প্রয়োজন। অথচ চিকিৎসার টাকা জোগাড় করা তো দূরের কথা, দুমুঠো ভাতের জন্য কাঁদছেন এই দম্পতি। এরই মধ্যে ছেলে সাইক তাদের অনুপস্থিতিতে বাড়ির লোহার সিন্দুক কেটে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, জমির মূল দলিলপত্র এবং ব্যাংকের ব্ল্যাংক চেক বই লুট করে নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে বাপের সম্পত্তি পুরোপুরি দখলে নিয়ে বীরদর্পে বেড়াচ্ছে সাইক। বাবার কষ্টার্জিত নার্সারির গাছ, সুপারি বাগানের সুপারি, পুকুরের মাছ ও বিবাদমান জমির ধান বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে সে। এই টাকার জোরে স্থানীয় প্রভাবশালী সিন্ডিকেটকে হাত করে একের পর এক অন্যায় করেও পার পেয়ে যাচ্ছে সে। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শেখ আঃ রহমান সাইক তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমি আমার বাবা-মাকে কোনো নির্যাতন করিনি। জমিজমা সংক্রান্ত যে কথা বলা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। জমিগুলো নিয়ম মেনেই রেজিস্ট্রি করা হয়েছিল। এখন অন্যের প্ররোচনায় বাবা-মা আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা ও থানায় অভিযোগ দিয়েছেন। মূলত পারিবারিক সম্পত্তি এককভাবে কুক্ষিগত করার জন্যই আমার বিরুদ্ধে এই চক্রান্ত করছেন। আমি এখনও আমার বাবা-মার ভরণপোষণ দিতে প্রস্তুত, কিন্তু তারা আমার কাছে থাকতে চান না।”
বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় শৈলগাছী ইউনিয়নের ইউপি সদস্য জালালের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “বিষয়টি নিয়ে আমরা স্থানীয়ভাবে অনেকবার সালিশ-বৈঠকে বসেছি, কিন্তু কোনো সমাধান করা সম্ভব হয়নি। ছেলে সাইক তার বাবা-মার ভরণপোষণ দিতে প্রস্তুত, কিন্তু তার বাবা-মা তা নেন না। এছাড়া বৃদ্ধ আব্দুল জলিলের অনেক ঋণ রয়েছে। বাধ্য হয়ে পাওনাদার আদালতে মামলা করেছেন।” তবে ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, ইউপি সদস্য জালালের এই বক্তব্য সম্পূর্ণ একপাক্ষিক ও পক্ষপাতদুষ্ট। মূলত এই ইউপি সদস্য ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের মদদেই ছেলে সাইক এখন লুট হওয়া চেক ব্যবহার করে বৃদ্ধ বাবার নামে ‘চেক ডিজনার’ মামলা দেওয়ার গভীর পাঁয়তারা করছে। সম্প্রতি রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) শৈলগাছি শাখা থেকে ফোন আসার পর এই নতুন চক্রান্তের বিষয়টি ফাঁস হয়। উচ্চশিক্ষিত ছেলের এমন নির্মমতা ও স্থানীয় চক্রের হয়রানির শিকার হয়ে শেষ বয়সে এসে চরম অসহায় অবস্থায় পড়েছেন এই বৃদ্ধ দম্পতি। ন্যায়বিচারের আশায় তারা এখন পথে পথে ঘুরছেন। প্রশাসনের কাছে দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা, ভরণপোষণ এবং জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতের আকুতি জানিয়েছেন এই নিরুপায় পিতা-মাতা।

 


আরোও অন্যান্য খবর
Paris