মঙ্গলবার

২১শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

৮ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রচন্ড খরতাপে পুড়ছে তানোর ঝরে পড়ছে আমের গুটি

Paris
Update : সোমবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২৩

আব্দুস সবুর, তানোর
বরেন্দ অঞ্চল কৃষি ভান্ডার হিসেবে খ্যাত, সপ্তাহ ধরে প্রচন্ড তাপদহ, খাল, বিল, পুকুর, নয়নজলি কোথাও পানি নেই, সব শুকিয়ে চৌচির হয়ে পড়েছে, গত সপ্তাহে যে পরিমান তাপদহ বইছিল, চলতি সপ্তাহে আরো বৃদ্ধি পাবে তাপদহ। এমন প্রচন্ড খরতাপে ঝরে পড়ছে আমের গুটি, যাকে বলে আমের গুটির সর্বোনাশ, পাক ধরা আগাম বোরো ধানের আশির্বাদে পরিনত হয়েছে, চারদিকে খাখা, কোথাও নেই বাতাস, নেই বৃষ্টি। আবার সেচ নির্ভর আলুর জমির ধান নিয়ে পড়েছেন বেকায়দায়। সকালে সেচ দিলে রাতে শুস্ক হয়ে পড়ছে জমি, অনেকে সেচের অভাবে সার কীটনাশক প্রয়োগ করতে পারছেনা। তবে বিলকুমারী বিলের আগাম বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। বিল পাড়ায়ের কৃষকরা চায় এমন খরতাপ অব্যাহত থাকুক সপ্তাহ ধরে। তাহলে শুকনো ঝরঝরে ধান ঘরে উঠবে। গত সপ্তাহের তাপমাত্র ৪০ ডিগ্রির ছিল। কিন্তু শুক্রবার, শনিবার ও রবিবার এবং পুরো সপ্তাহ জুড়ে তাপমাত্রা বাড়তেই থাকবে। এমনকি ৪৩-৪৪ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠবে তাপমাত্রা। ২৪ রমজান খরতাপের কারনে ঘর থেকে কেউ বের হতে চাচ্ছে না। রাস্তায় বের হলেই পিপাসায় কাতর হয়ে পড়ছে মানুষ। অতীতে রাস্তার দুধারে পর্যাপ্ত গাছ ছিল এজন্য শীতল বাতাস পাওয়া যেত। কিন্তু বিদ্যুৎ সরবরাহের দোহায়ে গাছপালা কেটে সাবাড় করে ফেলা হয়েছে। যে রাস্তায় শীতল হাওয়া ছিল সে রাস্তায় মরুভূমির মত প্রচন্ড গরম বাতাসে নাজেহাল হয়ে পড়ছে জনসাধারন বা পথচারীরা। সকাল ১১ টা থেকে বিকেল ৫ টা পর্যন্ত রাস্তায় ভ্যান, অটোরিক্সা বা কোন ধরনের যান তেমন দেখা মিলছেনা।
পৌর সদর গুবিরপাড়া গ্রামে সাইদুরের ঘরের টিন নষ্ট হওয়ার কারনে সব উল্টিয়ে নতুন ভাবে ছাওয়ার কাজ করা হচ্ছে। তবে সকালে সামান্য কয়েক ঘন্টা কাজ করার পর প্রচুন্ড তাপের কারনে চলে যাচ্ছে মিস্ত্রীরা। কাজে সহযোগিতা করছেন সাইদুরের স্ত্রী কাজলী বেগম। তিনি জানান, বয়স অনেক হয়েছে, তাপমাত্রা দেখেছি, রোজাও থেকেছি, কিন্ত এবারের তাপদাহের ভিন্নরুপ। গলা বুক শুকিয়ে যাচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যে শরীর প্রচন্ড ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। ঘরে ফ্যান দিয়েও তাপ যাচ্ছে না।
শনিবার রাত্রি নয়টার দিকে মুন্ডুমালা বাজারে যাওয়া হয়, ওই সময় তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি বিরাজ মান। বাজারে লোকের সমাগম নেই। বিগত আট দশ বছরে পহেলা, দ্বীতিয়, তৃতীয়, চথুর্ত, পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম বৈশাখে এমন তাপদাহ দেখেনি উপজেলা বাসী।
রবিবার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বিলের আগাম বোরো ধান পেকে গেছে। কিন্ত খরতাপের কারনে কাটতে পারছেন না। শ্রমিকরা কোনভাবেই রাজি হচ্ছে না এই খরতাপে ধান কাটতে। তাদের একটাই কথা রোজা নষ্ট করে কাজ করতে পারব না। পুরো বিলে সোনালী পাকা ধান পড়ে আছে। যা বিগত সময় থাকেনি। কারন একটাই বুকফাটা মরুভূমির মত অসহ্য তাপদাহ সহ্য করতে পারছেন না জনসাধারন। আবার শেষ রাতে কোয়াসায় ডাকা থাকছে, গাছ থেকে বৃষ্টির মত ফোটা ফোটা কোয়াসা পড়ছে।
মধ্যে প্রাচ্য মরুর দেশ সৌদি আরবে, দিনের বেলায় যেমন খরতাপ রাতের বেলায় তেমনি কোয়াসা। বালির দেশ যত তাপ তত মোটা কাপড় গায়ে জড়ানো থাকে, যার কারনে এক সময় শরীর শীতল হয়ে যায়। কিন্তু বাংলাদেশ নদী মাত্রিক সবুজ গাছপালার দেশ। সামান্য তাপ শরীর নিতে পারে না। অকারনে বনজঙ্গল, উচুঁ ডাঙ্গা কাটা, যেখানে সেখানে কলকারখানা গড়ে তোলা, জলাশয় পুকুর ভরাট, নির্বিচারে গাছপালা উজাড় করার কারনে জলবায়ুর বিরুপ প্রভাব পড়েছে বরেন্দ্রভূমিতে। দ্রুত সময়ের মধ্যে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারলে ভবিষৎ প্রজন্ম চরম হুমকিতে পড়বে। জলবায়ুর বিরুপ প্রভাব ও পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের হাজার হাজার অপরিকল্পিত বানিজ্যিক নামে সেচ মটরের কারনে ভূগর্ভের পানি শেষের দিকে। মাত্র ৭ ফিট পানি রয়েছে ভূগর্ভে। ৮০ ফিট পানির মধ্যে ১৯৯০ সাল থেকে ২০২৩ পর্যন্ত ৭৩ ফিট পানি শেষ হয়ে গেছে। ছোটখাটো ভূমিকম্পে দেবে যাবে তানোর উপজেলা বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গভীর নলকুপে উঠছেনা পানি, কয়েক ঘন্টা চলার পর হয় বিকল না হয় বালি পাথর উঠা শুরু করছে। চরম আতংকে সেচ নির্ভর বোরো চাষিরা। প্রতিদিন ৫-৭ টি করে গভীর নলকুপ বিকল হয়ে পড়ছে। অটো ভ্যান চালক ওহাব, খলিল, সামাদসহ অনেকে জানান, সাহারি খাওয়ার কিছুক্ষন পর ভ্যান নিয়ে বের হয়ে যায়। ভোর থেকে ঊর্ধ্বে সকাল ১০টা পর্যন্ত রাস্তায় থাকা যায়। তারপরে টিকায় যায় না। সামনে ঈদ লোকের সমাগম না থাকায় ভাড়া মিলছে না। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে কেউ বাহির হচ্ছে না। দূর পথে ভাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। রমজান মাস রাতেও তেমন লোকজন থাকে না। মনে করেছিলাম ঈদের আগে ধান কাটা শুরু হলে ভাড়া মিলত ভালোই। সেটা হল না। আল্লাহর দিন আল্লাহ পার করবেন, তাছাড়া তো উপায় নেই।
পৌর সদর শীতলীপাড়া গ্রামের মৎস্যজীবি আফজাল, বিসু ও আজিজুর জানান, বিগত বছরের চেয়ে এবারে বিলে পর্যাপ্ত পানি ও মাছ রয়েছে। কিন্ত প্রখর রোদের কারনে পানি গ্যাস হয়ে দুর্গন্ধ হয়ে পড়েছে। রাতে জাল ফেলে সকালে মাছ তুলে বাজারে বিক্রি করা হত। তাজা টাটকা বিলের মাছের দামও পাওয়া যেত। রোদের প্রখরতার কারনে রাতেই জাল থেকে মাছ তুলতে হচ্ছে, যারা সকালে তুলছে, তারা তাজা মাছ পাচ্ছে না, সবই মরে পচে যাচ্ছে। বিগত সময়ে এমন টা দেখিনি। যা এবার দেখতে হচ্ছে।
গত ৮ বছরের মধ্যে এবছরই সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪১ ডিগ্রী ও সর্ব নিম্ন ২৬ ডিগ্রী। উচু ও খরা প্রবন এলাকা উপজেলায় এবছরই অন্য যেকোন বছরের চেয়ে আম ও লিচুর ফলন সব চাইতে বেশি হওয়ার আসা করছিল সংশ্লিষ্ট দপ্তর। অথচ পর্যাপ্ত আমের গুটি ছিল। সপ্তাহের ব্যবধানে ঝরে পড়েছে আমের গুটি। প্রতিটি গাছের নিচে শুধু আমের গুটি পড়ে রয়েছে। গাছ মালিকরা পড়ে থাকা গুটি গুলো দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারছেননা। কিন্তু কিছুই করনীয় নাই, বিধাতার খেলা বোঝা বড় দায়। যার কারনে ফলনে প্রচুর বিপর্যয় ঘটবে বলে মনে করছেন আম চাষীরা।
চাঐড় বালিকা স্কুলের সামনে বিশাল আম বাগান, মালিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক সুলতান আহম্মেদ। তিনি জানান, আমের গুটি আসার আগ মুহুর্তে বৃষ্টির পানি হয়েছিল, সেই পানির কারনে এতপরিমান গুটি আসে কল্পনাতীত। খরতাপে সেই গুটি অর্ধেকে নেমেছে। আপসোসের শেষ নেই। সব গাছে যে পরিমান গুটি এসেছিল তা এখন অর্ধেক বা তারও কম দেখা যাচ্ছে। যদি দু একদিনের মধ্যে বৃষ্টি না হয় বাকি গুটি থাকবে কিনা সন্দেহ।
গৃহীনি, লাভলী, নারগিস, রেহেনা, পপি,সহ অনেকে জানান, রোদের প্রখরতার কারনে ঘর থেকে বের হতে ইচ্ছে করছেনা। কিন্তু রান্না করতেই হবে। আমরা জালানি পুড়িয়ে রান্না করে থাকি। বিকেল ৪ টা থেকে ইফতারের পাচ দশ মিনিট আগ পর্যন্ত রান্নার কাজ চলে। প্রচুর রোদের তাপের কারনে ঘরে ফ্যান ব্যবহার করে থাকা যাচ্ছে না, সেখানে চুলার সামনে কিভাবে থাকতে হয়, এতে কি পরিমান যন্ত্রনা বলে বোজানো যাবে না, গরমে শরীর নজেহাল হয়ে পড়ে, রোজা থাকা শরীর কিচুই সহ্য হয় না, উপায় নাই রান্না করতেই হবে। আবহাওয়ার ওয়েব সাইডে দেখা যায়, গত শুক্র ও শনিবার ৪০ ডিগ্রি, বা তার উপরে, রবিবার ৪১, সোমবার ৪২, মঙ্গল, বুধ ও বৃহস্পতিবার ৪৩ ডিগ্রী শুকবার ৪২ ডিগ্রি শনিবার ৪১, রবিবার ৩৯ সোম ও মঙ্গলবার ৩৮ ও ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপদাহ থাকবে। তানোর উপজেলা কৃষি অফিস সুত্রে জানা গেছে, এবছর সোয়া ৪ শ হেক্টর জমিতে আম বাগান রয়েছে। আমের মুকুল ও গুটি পর্যাপ্ত ছিল, কিন্তু প্রচন্ড রোদ ও খরতাপের কারনে গাছের আম ঝরে পড়ছে প্রচুর। উপজেলা কৃষি অফিসার সাইফুল্লাহ আহম্মেদ জানান, যেহেতু তাপদাহ কমের সম্ভবনা নেই, এজন্য মাঠে বাগান মালিকদের গুটি রক্ষার জন্য বিভিন্ন ওষুধ স্প্রে করার পরামর্শের পাশাপাশি গাছের গড়ায় পানিসহ ওষুধ ছেটানোর পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। তবে সামান্য পরিমান বৃষ্টির পানি পেলে গুটি ঝরে পড়বে না। আর বৃষ্টি না হলে ফলন কম হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে।


আরোও অন্যান্য খবর
Paris