আব্দুস সবুর, তানোর : বিল কুমারী বিলের বুকে সবুজ সোনালীর সমারোহে ভরপুর। সবুজ সোনালীর মাঝেই বিলপাড়ের হাজারো কৃষকের স্বপ্ন গাথা রয়েছে। বিলে নেই কোন পানি শুধু সবুজ আর সোনালী ধানের শীষে ভরা। উত্তরের হিমেল বাতাসের সাথে ধুলছে সবুজ সোনালী ধানের শীষ, সেই সাথে স্বপ্নে বিভর হচ্ছেন কৃষকরা। তবে কৃষকরা সবুজের মাঝে স্বপ্ন দেখলেও বিলে পানি না থাকার কারনে হাজারো মৎস্য জীবি পরিবার চরম মানবেতর জীবন যাপন করছেন। আর সপ্তাহ খানের মধ্যেই কাটা পড়বে কৃষকের রক্ত ঘামের কাংখিত বোরো ধান। তবে দু:শ্চিন্তার শেষ নেই। আবার ধান পাকা রোদও শুরু হয়েছে। বিলের জমিতে একটি করে চাষাবাদ হয়ে থাকে। পর্যাপ্ত ফলনও পায় বিল পাড়ের কৃষকরা। তবে আশায় বুক বাঁধলেও কপালে রয়েছে নানা চিন্তার ভাজ।
ভূমিহীন বিলপাড়ের কৃষক ফারুক জানান, বিলের একেবারে নিচের ২২ কাঠা জমিতে বোরো রোপন করেছি। ধান ভালো হয়েছে। নিচের জমি একারনে আরো ২০ দিন মত সময় লাগবে কাটতে। রোপন থেকে শুরু করে উত্তোলন পর্যন্ত ১৬/১৭ হাজার টাকা মত খরচ হবে।
ডাকবাংলো মাঠের নিচে ধানতৈড় মৌজায় গভীর নলকূপে ড্রেনম্যান শাকির মুনসুর সহ কৃষকরা জানান, এবারে বিলের জমিতে রোগবালা খুবই কম। সার কীটনাশক কম লাগে। আবার আবহাওয়া ছিল চমৎকার। কোন প্রতিকুলতা ছিল না। সময় মত সেচ পানি দেয়া হয়েছে। বিদ্যুতের কোন ঘাটতিও ছিল না। বিলের উপরের জমিতে আলুসহ সবজি চাষ হয়। আলু সবজি তুলে ধান রোপন হয়। তবে বেশির ভাগ জমিতে একটি আবাদ হয়ে থাকে। একারনে বিঘায় নিম্নে ২৫ মন থেকে ২৮/৩০ মন পর্যন্ত ধানের ফলন হয়ে থাকে।
শাকির আরো জানান, সাড়ে তিন বিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করা হয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে ধান কাটা শুরু হবে। বকুল নামের আরেক কৃষক বিলের ৭ বিঘা জমি টেন্ডার নিয়ে চাষ করেছেন। মোনায়েম তিন বিঘা, হালিম আড়াই বিঘা, মান্নান আট বিঘা, হাকিম টেন্ডারে তিন বিঘা, সাহেব তিন বিঘা, শাওন নামের কৃষক ৬ বিঘা, হিন্দুপাড়া গ্রামের কৃষক বিমল তিন বিঘা ও অধির নামের আরেক কৃষক ১০ বিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছেন। তারা জানান, বিলের জমির ধানে পাক ধরেছে। কয়েকদিন ধরে তাপপ্রবাহ বিরাজ করছে। ধান পাকা রোদও পড়েছে। এক সপ্তাহের আগ থেকেই ধান কাটা শুরু হবে। বিলের নিজস্ব এক বিঘা জমিতে রোপন থেকে উত্তোলন পর্যন্ত খরচ হবে ১৬/১৭ হাজার টাকা। আর লিজের এক বিঘা জমিতে খরচ হবে ২২/২৪ হাজার টাকা। ভাল ভাবে ধান কাটা মাড়ায় করতে পারলে নিজস্ব জমিতে লাভ আসতে পারে ১০/১১ হাজার টাকা। আর লীজের জমিতে বিঘায় ৪/৫ হাজার টাকা লাভ হতে পারে। তবে বৈরি আবহাওয়া হলে শুকনো খড় পাওয়া যাবেনা। সেক্ষেত্রে লাভ কম আসবে। আর আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে লাভ ভালোই আসবে। কারন খড়ের দাম ভালো আছে।
কৃষকরা জানান, ধানের দাম মনে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা কমে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারনে দেশের তেলের প্রচুর সংকট। তেলের কারনে গাড়ী আসছেনা। ধান কেনা বেচা নাই। এভাবে চলতে থাকলে পথে বসতে হবে। সব জিনিসের বাড়তি দাম হলেও ধান ও আলুর দাম কমতেই আছে। বাহির থেকে ব্যবসায়ীরা আসতে পারছেনা। দুএকজন এলেও দ্বিগুণ গাড়ি ভাড়া। কৃষকের দিকে সরকার নজর না দিলে উৎপাদিত ফসল গলার কাটা হয়ে পড়ছে।
জানা গেছে, উপজেলার চান্দুড়িয়া ব্রীজ ঘাট থেকে সীমান্তবর্তী কামারগাঁ ইউপির চৌবাড়িয়া ব্রীজ পর্যন্ত বিলকুমারী বিলের জমিতে আগাম বোরো চাষ হয়েছে। বিশেষ করে চান্দুড়িয়া, চকদমদমা, হাড়দহ, গাগরন্দ, পৌর এলাকার কালীগঞ্জ, হাবিব নগর, আকচা, বুরুজ, জিওল, চাদপুর, আমশো মুথুরাপুর, সরকার পাড়া, তাতিয়াল পাড়া, গোল্লাপাড়া, হলদারপাড়া, তানোর পাড়া, কুঠিপাড়া, হিন্দুপাড়া, গুবিরপাড়া, সিন্দুকাই, ধানতৈড়, চাপড়া, গোকুল, তালন্দ, কামারগা ইউপির, লবিয়তলা ব্রীজের পশ্চিমে, পুর্বদিকে, উত্তরে, দক্ষিনে, হাতিশাইল, বারোঘরিয়া, হাতিনান্দা, চাঐড়, কামারগা, কচুয়া, শ্রীখন্ডা, দমদমা, কৃষ্ণপুর, পারিশো, দূর্গাপুর, বাতাসপুর, মাড়িয়া, মাদারিপুর, জমসেদপুর ভবানীপুর, ধানোরিয়া, চককাজিজিয়া, মালশিরা, কলমা ইউপির, কুজিশহর, চন্দনকোঠা গ্রামের নিচে বিলের জমিতে হয় বোরো চাষ। প্রায় জমির ধানে পাক ধরেছে। এসব এলাকার জমিতে আগাম বোরো চাষ হয়ে থাকে। আর আলু উত্তোলনের পর আরেক দফা বোরো ধানের চাষ হয়। আলুর জমির ধানগাছ কালো রং ধরেছে। কেউ আগাছা দমন করছেন, কেউ রোগবালা দূর করতে কীটনাশক প্রয়োগ করছেন।
পৌরসভার বিএস আকবর আলী জানান, বিলের জমির ধানে পাক ধরেছে। এবারে ধানে রোগবালাই ছিল না। একারনে কৃষকের খরচও কম হয়েছে। দু এক জায়গায় রোগের খবর পাওয়া মাত্রই সাথে সাথে কৃষককে সঠিক পরামর্শ দেয়া হয়েছে। আবহাওয়া এখন পর্যন্ত অনুকূলে আছে। আসা করছি কৃষকরা বিলের জমির ধানে লাভবান হবে।
বিলপাড়ের কৃষক ও কৃষি বিজ্ঞানী, নুর মোহাম্মদ বলেন, বিলের জমিতে ফলন ভালো হয়। এবার আবহাওয়া অনুকূলে ছিল। কোন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল না। এক সপ্তাহের আগেই অনেকের ধান কাটা পড়বে। বৈশাখ মাস শুরু হয়েছে। কাল বৈশাখী ঝড়ের একটা আতংক থাকে বিল পাড়ের কৃষকের মাঝে। কারন পূর্ব পুরুষরা বলতেন বোরোর আসা না মরার আসা। কিন্তু তাই বলে তো চাষাবাদ ছেড়ে দিলে চলবেনা। চাষবাদ করতেই হবে। তবে ধানের দাম কমে যাওয়ার কারনে হতাশা প্রকাশ করেন তিনি। কারন কৃষকরা ফসলের ন্যায্য মূল্য না পেলে ভবিষ্যতে চাষাবাদে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। এজন্য ফসলের ন্যায্য দামের ব্যবস্থা করতে হবে।
উপজেলা কৃষি অফিসার সাইফুল্লাহ আহম্মেদ জানান, বিলের জমির ধানে পাক ধরা শুরু হয়েছে। আর দু চার দিনের মধ্যে কাটা শুরু হবে। কৃষকরা কাংখিত ফলন পাবে। কারন সবকিছু সঠিক ভাবে হয়েছে। বেশির ভাগ জমিতে একটি করে আবাদ হয়। এজন্য পর্যাপ্ত ফলন পায় বিলপাড়ের কৃষকরা। আর মাঠ কর্মীরা সার্বক্ষণিক মাঠে থেকে কাজ করেছে। সার কীটনাশকের খরচ কম হয়েছে। এবারে উপজেলায় ১৪ হাজার ১৩০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে।
মৎস্যজীবিদের হাহাকার : বিলে পানি নেই। বিলের মুল অংশ ডাকবাংলো মাঠের উত্তর পূর্ব দিকে বিলের মুল অংশ হিসেবে ধরা হয় । মুল অংশ ২ হেক্টর বিল অভয়াশ্রম। সেখানে বাঁশ দিয়ে ঘেরা আছে। বিলে পানি না থাকার কারনে মাছ নেই। এতে করে হাজারো মৎস্য জীবিরা চরম মানবেতর জীবন যাপন করছেন।
মৎস্য জীবি রফিকুল ইসলাম বিসু, আফজাল, সবুর, আজিমুল আজিজুরসহ অনেকে জানান, দীর্ঘ প্রায় এক দেড় মাস থেকে বিলে কোন মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। ঋন মহাজন করে সংসার পরিচালনা করা হচ্ছে। বিলের মাছের উপর নির্ভর করে চলে আমাদের সংসার ও জীবন জীবিকা। আমরা কৃষি কাজ করতে পারিনা। বিলের মাছ আমাদের সব কিছুর ভরসা। বিলে মাছ না থাকলে অর্ধাহারে অনাহারে দিন পার করতে হয়। আমরা এনজিও ঋনের উপর নির্ভরশীল। এখন পরিবারের সদস্যদের মুখে ভাত দিব নাকি এনজিওর কিস্তি দিব। কিস্তির চাপে অনেকে এলাকা ছাড়া হয়েছেন। এসময় সরকারি ভাবে প্রকৃত মৎস্য জীবিদের সহায়তা করা একান্ত দরকার।