বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল একসময় শুধু ধান, ভুট্টা, আলু কিংবা তামাকের জন্য পরিচিত ছিল। কিন্তু গত এক দশকে এ অঞ্চলের কৃষি মানচিত্রে যুক্ত হয়েছে নতুন এক ফসল- চা। পাহাড়ি অঞ্চলের বাইরে সমতলভূমিতে চা চাষের এই বিপ্লব এখন দেশের চা শিল্পে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, লালমনিরহাট ও নীলফামারী- এই পাঁচ জেলায় প্রতি বছরই বাড়ছে চায়ের আবাদ, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে উৎপাদনও। জানা গেছে, সদ্য সমাপ্ত ২০২৫ মৌসুমে উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলায় ১১ হাজার ৫৯৯ দশমিক ৮৯ একর সমতল জমির ৩০টি বড় চা বাগান এবং ৮ হাজারেরও অধিক ক্ষুদ্রায়তনের চা বাগান থেকে উৎপাদিত হয়েছে দুই কোটি দুই লাখ ৪২ হাজার ৫২ কেজি চা। যা আগের মৌসুমের তুলনায় প্রায় ৫৮ লাখ কেজি বেশি। বাংলাদেশ চা বোর্ডের পঞ্চগড় আঞ্চলিক কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কৃষিবিদ আমির হোসেন জানিয়েছেন, এ বছর এসব বাগান থেকে উত্তোলিত সবুজ কাঁচা চা পাতার পরিমাণ ছিল প্রায় ৯ কোটি ৭৭ লাখ কেজি। পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওয়ের ৩১টি কারখানায় প্রক্রিয়াজাত হয়ে তা থেকে তৈরি হয়েছে এই বিপুল পরিমাণ চা। চা বোর্ডের তথ্য বলছে, প্রতিকূলতা সত্ত্বেও উত্তরাঞ্চলে চা চাষের পরিধি ক্রমেই বাড়ছে। গত মৌসুমে আবাদি জমি বেড়েছে ৭৩ একরেরও বেশি। শুধু পঞ্চগড়েই চা আবাদ হয়েছে প্রায় ৯ হাজার ৮২০ একর জমিতে। এখানকার বাগানগুলো থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে আট কোটি ৩২ লাখ কেজি সবুজ চা পাতা, যা থেকে উৎপাদিত হয়েছে এক কোটি ৭২ লাখ কেজি তৈরি চা। ঠাকুরগাঁওয়ে চা আবাদ হয়েছে ১ হাজার ৪৫৭ একর জমিতে। সেখান থেকে উৎপাদিত হয়েছে ২৫ লাখ কেজিরও বেশি তৈরি চা। লালমনিরহাট, দিনাজপুর ও নীলফামারীর ৩২২ একর জমিতে চা চাষ হচ্ছে, যেখানকার উৎপাদিত পাতা প্রক্রিয়াজাত হয় পঞ্চগড়ের কারখানাগুলোতে। জানা গেছে, চা চাষের এই বিস্তৃতি শুধু উৎপাদন বাড়াচ্ছে না, কর্মসংস্থানেরও নতুন দিগন্ত খুলছে। চা বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, উত্তরাঞ্চলের এই পাঁচ জেলায় প্রায় ৩০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। মৌসুমভেদে আরও কয়েক হাজার শ্রমিক যুক্ত হন চা পাতা সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজে। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে চায়ের অবদান দিন দিন বাড়ছে। সূত্র বলছে, শীতের কারণে প্রতি বছর ডিসেম্বরের শেষ দিকে সবুজ চা পাতার সরবরাহ কমে যায়। তখন প্রায় দুই মাস বন্ধ থাকে কারখানাগুলো। নতুন মৌসুমে মার্চের শেষ দিকে আবারও উৎপাদন শুরু হয়। এ বছর মৌসুমের শুরুতেই সবুজ চা পাতার দামে ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা গেছে। বটলিফ কমিটির নির্ধারিত দর ২৮ টাকা হলেও বর্তমানে প্রতি কেজি সবুজ চা পাতা বিক্রি হচ্ছে ৩৪ থেকে ৩৫ টাকায়। তবে পূর্ণমাত্রায় উত্তোলন শুরু হলে দাম কিছুটা কমতে পারে বলে মনে করছেন কারখানা মালিকরা। তথ্যমতে, বর্তমানে উত্তরাঞ্চলে ৪৮টি চা প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার অনুমোদন দিয়েছে চা বোর্ড। এর মধ্যে পঞ্চগড়ে ৩০টি এবং ঠাকুরগাঁওয়ে একটি কারখানা চালু রয়েছে। এসব কারখানা চাষিদের কাছ থেকে সবুজ চা পাতা কিনে তা থেকে তৈরি চা উৎপাদন করে। পরে সেই চা পঞ্চগড়, চট্টগ্রাম ও শ্রীমঙ্গলের নিলাম বাজারে বিক্রি করা হয়। চা বোর্ডের আঞ্চলিক কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আমির হাসান বলেন, উত্তরের সমতলভূমিতে চা চাষ দেশের চায়ের ইতিহাসে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। পার্বত্য অঞ্চলকে পেছনে ফেলে এখন দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎপাদন কেন্দ্র হয়ে উঠেছে এ অঞ্চল। মানসম্মত পাতার কারণে এখানকার চায়ের অকশন বাজারে চাহিদাও বাড়ছে। বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না এলে চলতি মৌসুমে এ অঞ্চল থেকে আড়াই কোটি কেজি তৈরি চা উৎপাদন সম্ভব হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চা উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে স্থানীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। কৃষকরা ধান বা ভুট্টার তুলনায় চা চাষে বেশি লাভবান হচ্ছেন। একই সঙ্গে নারী শ্রমিকদের অংশগ্রহণও বেড়েছে। অনেক পরিবারে চা বাগানের কাজই এখন প্রধান আয়ের উৎস। চা শিল্পের এই বিস্তৃতি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও অবদান রাখছে। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের চা বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে চায়ের অবদান আরও সুদৃঢ় হচ্ছে। তবে চা শিল্পের এই অগ্রযাত্রায় কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, শীতকালে উৎপাদন বন্ধ থাকা, প্রক্রিয়াজাতকরণে আধুনিক প্রযুক্তির অভাব, ক্ষুদ্র চাষিদের জন্য পর্যাপ্ত ঋণ ও সহায়তার অভাব- এসব সমস্যা সমাধান জরুরি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখতে মান উন্নয়ন ও ব্র্যান্ডিংয়ের ওপর জোর দিতে হবে। চা বোর্ড ও স্থানীয় উদ্যোক্তারা বলছেন, সরকারি সহায়তা ও নীতি সহায়তা বাড়ানো গেলে উত্তরাঞ্চল অচিরেই দেশের সবচেয়ে বড় চা উৎপাদন কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।-এফএনএস