আলিফ হোসেন, তানোর : রাজশাহীর তানোরে আমনক্ষেতে মাজরা পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে। স্থানীয় কৃষকরা জানান, এ বছর মাঠজুড়ে আমণখেতের চেহারা ভালোই ছিল ধান গাছ থোড় হবার আগেই পোকার আক্রমন দেখা দিয়েছে। পোকা দমনে সপ্তাহে দুই থেকে তিন বার কীটনাশক প্রয়োগ করা হলেও তেমন ফল মিলছে না। আক্রান্ত ধান গাছের গোড়ায় খুব ছোট আকৃতির এই পোকা দেখা যায়। মাজরা আক্রমণে দ্রুত ধানগাছ নষ্ট হয়ে যায়। তানোরের কামারগাাঁ ইউপির ছাঐড় গ্রামের কৃষক পলাশ আলীী বলেন, হাতিনান্দা মাঠে তার চার বিঘা আমণখেতে মাজরা পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে, ইতমধ্যে দুবার কীটনাশ প্রয়োগ করা হলেও কাঙ্খিত ফল পাওয়া যায়নি। একই ইউপির কামারগাঁ গ্রামের কৃষক স্বপন চন্দ্র প্রামানিক বলেন, আব্দুল্লাহপুর মাঠে তার ৫ বিঘা আলাতন আলীর ৬ বিঘা, আক্কাশ আলীর ৪ বিঘা, উসমান আলীর দেড় বিঘা ও লতিব মন্ডলের ১০ বিঘা আমণখেতে মাজরা পোকার আক্রমন দেখা দিয়েছে। এছাড়াও মাঠের প্রায় প্রতিটি আমণখেতে কম বেশী পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে। কৃষক পলাশ বলেন, এখন পর্যন্ত দুবার বিষ স্প্রে করেছি, তবুও কাজ হচ্ছে না। তারা বলেন, মাঠ পর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের তারা নিয়মিত কাছে পাচ্ছেন না।
সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় বৃষ্টির নির্ভর রোপা-আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৪৩৫ হেক্টর। এবারে বিভিন্ন জাতের আমন ধান আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সোনার বাংলা ও ব্রি-৫১ জাতের ধান বেশী। উপজেলা কৃষি অফিসের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক উপ সহকারী কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে যে আবহাওয়া বিরাজ করছে তা ধানের জন্য অনুকূল নয়। এ কারণে পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, আমরা মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা মাঠে কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি, আশা করি দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে। এবিষয়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেস্টা করা হলেও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুঠোফোনে কল গ্রহণ করেননি, এমনকি ক্ষুদে বার্তা দেয়া হলেও তিনি সাড়া না দেয়ায় তার কোনো বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
এদিকে রাজশাহীর তানোরে কৃষি বিভাগের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের (এসএএও) বিরুদ্ধে দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। এতে প্রত্যন্ত ও দুর্গম পল্লীর প্রান্তিক কৃষকেরা কৃষিসেবা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই আশানুরুপ কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এমনটাই মনে করছেন উপজেলার জনপ্রতিনিধি, প্রান্তিক চাষি ও সাধারণ মানুষ। তাদের মতে, কৃষি সম্প্রসারণ নীতির উপাদান সমূহ বাস্তবায়নে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্ত্ত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের দায়িত্বঅবহেলার কারণে কৃষকরা এ বিভাগ থেকে কাঙ্খিত সেবা পাচ্ছেন না। গ্রাম বা মাঠপর্যায়ে সেবাপ্রাপ্তি তো দুরে থাক শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ কৃষকই উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের চেনেন না জানেন না।
ফলে কোনো রকমের কৃষি বিশেষজ্ঞ মতামত বা পরামর্শ ছাড়াই বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা নিজেদের অভিজ্ঞতায় চাষাবাদ করতে। অধিকাংশ কৃষক মাটির উর্বরতার হ্রাস-বৃদ্ধি কিংবা উপাদনের ঘাটতি না জেনেই সারসহ নানা উপকরণ ব্যবহার চাষাবাদ করছেন। আর এতে করে অধিকাংশ সময়ই কৃষকরা প্রত্যাশা অনুযায়ী ফলন উৎপাদনে ব্যর্থ হচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে, উপজেলার দুটি পৌরসভা ও সাতটি ইউনিয়নে ২৩টি (এসএএও) পদের বিপরীতে ১৬ জন কর্মরত রয়েছেন। কিন্ত্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, বেশিরভাগ সময় সাধারণ কৃষক এসব কর্মকর্তাদের কাছে পাচ্ছেন না, পাচ্ছেন না কোনো কৃষি পরামর্শ। তানোরের দিব্যস্থল গ্রামের কৃষক তোজাম্মেল (৩৩), মাড়িয়া গ্রামের কৃষক সাইদুর, কৃষ্ণপুর গ্রামের রফিকুল ইসলাম বলেন, মাঠপর্যায়ে কৃষকদের পরমর্শের জন্য উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা রয়েছেন এ বিষয়টিই তারা জানেন না, কারণ তারা কখনও তাদের এলাকায় এসব কর্মকর্তাদের কর্মকান্ড চোখেই দেখেননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আদর্শ কৃষক অভিযোগ করে বলেন, কৃষি বিভাগের বেশিরভাগ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিয়মিত ও সঠিক অফিস সময়ে উপস্থিত না হওয়ার অভিযোগ অনেক পুরুনো। এমনকি কৃষি কর্মকর্তার নিজ কর্মস্থলে অবস্থান করার কথা থাকলেও তানোরে এই নিয়ম মানা হচ্ছে না। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিজ কর্মস্থলে অবস্থান না করে রাজশাহী শহর থেকে যাতায়াত করেন। তিনি সকাল ১১টায় অফিস এসে আবার দুপুর ২ টার পরে কর্মস্থল ত্যাগ করে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। যে কারণে বেশির ভাগ সময় তিনি অফিস সময়ে উপস্থিত হতে পারেন না। ফলে এলাকার কৃষকরা কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকেও তেমন কোনো পরামর্শ পান না। কৃষি কর্মকর্তার কর্মস্থলে উপস্থিত নিশ্চিত করতে এলাকার কৃষকরা স্থানীয় সাংসদ ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরী হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। এ ব্যাপারে মুঠোফনে যোগাযোগ করা হলে তানোর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, কোনো উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।