ভারতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে বিশেষ দ্রুত বিচার আদালত গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তবে তার এই আশ্বাসেও রাজধানী দিল্লিতে শিক্ষার্থী ও তরুণদের বিক্ষোভ থামেনি। বরং আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, সরকারের ঘোষণায় তাদের মূল দাবিগুলোর কোনো সমাধান আসেনি। খবর এনডিটিভি ও আল-জাজিরার। বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক বিবৃতিতে মোদি বলেন, “আমাদের তরুণদের কল্যাণ ও ভবিষ্যতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু নেই।” তিনি জানান, “সরকার প্রশ্নফাঁস মামলার বিচারের জন্য দ্রুত বিচার আদালত গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।” একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, “তরুণদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করার চেষ্টা করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।” তবে আন্দোলনকারী ও বিরোধী দলগুলো এই পদক্ষেপকে ‘মূল সমস্যা থেকে নজর ঘোরানোর চেষ্টা’ আখ্যা দিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী পাল্টা বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীকে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ‘নষ্ট’ করার জন্য অভিযুক্ত করেন। এক্স-এ একটি পোস্টে রাহুল গান্ধী বলেন, “আপনিই সেই ব্যক্তি যিনি আমাদের যুবসমাজের ভবিষ্যৎ সবচেয়ে বেশি নষ্ট করেছেন। আপনি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সম্পূর্ণ দখল ও ধ্বংসের সুযোগ করে দিয়েছেন ও উৎসাহিত করেছেন- এবং এর জন্য দায়ী প্রতিটি মানুষকে সুরক্ষা দিয়েছেন।” রাহুল গান্ধী শিক্ষার্থীদের দাবিগুলোর কথাও আবারো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো একদম পরিষ্কার- শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে বরখাস্ত করুন, শিক্ষার্থীদের কাছে ক্ষমা চান এবং তাদের ওপর হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন। এর আগে গত বুধবার রাহুল গান্ধী গত বুধবার দাবি করেছিলেন, গত ১০ বছরে ১৫০টিরও বেশি প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু একটি ঘটনাতেও কারো সাজা হয়নি। দিল্লির যন্তর মন্তর ও পার্লামেন্ট সড়কে গত তিন দিন ধরে হাজার হাজার শিক্ষার্থী অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে প্রতিবাদস্থলের আশপাশের অন্তত ১৬টি মেট্রোস্টেশন বন্ধ করে দিয়েছে। গত সোমবার আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপের পর বিক্ষোভের মাত্রা আরোা তীব্র রূপ নেয়। মুম্বাই, বেঙ্গালুরু ও পাটনার মতো প্রধান শহরগুলোতেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। এটি গত মে মাসে গঠিত হয়। পরে এটি পরীক্ষা ব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কার এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে জাতীয় প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী মোদির ঘোষণা প্রত্যাখান করে ককরোচ জনতা পার্টির মুখপাত্র আশুতোষ রঙ্কা বলেন, “দ্রুত বিচার আদালতের ঘোষণা কোনো আসল সমাধান নয়, এটি কেবল নজর ঘোরানোর কৌশল। দ্রুত বিচার আদালতের অভাবে প্রশ্নফাঁস হচ্ছে না; প্রশ্নফাঁস হচ্ছে কারণ শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান সম্পূর্ণ ব্যর্থ ও অযোগ্য।” ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অভিজিৎ দীপকে ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআইকে বলেন, বাইরে থেকে লোক এনে ইচ্ছাকৃতভাবে আন্দোলনে সহিংসতা উসকে দিয়ে বিক্ষোভকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। পরে এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি মন্তব্য করেন, “মনে হচ্ছে মোদি পুরো দিল্লি বন্ধ করতে প্রস্তুত, কিন্তু ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অপসারণ করতে প্রস্তুত নন।” সংগঠনটির মূল দাবিগুলো হলো- শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্ব পদত্যাগ, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহার এবং সাম্প্রতিক নিট পরীক্ষা বাতিলের পর আত্মহত্যা করা অন্তত ১২ জন শিক্ষার্থীর পরিবারকে ১ কোটি রুপি করে আর্থিক সহায়তা প্রদান। বিশ্লেষকদের মতে, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র দ্রুত উত্থান উচ্চ বেকারত্ব এবং বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ভারতের তরুণদের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের প্রতিফলন। একই সঙ্গে এই আন্দোলন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির বিরুদ্ধে বিরোধীদের জন্যও নতুন রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে।
এদিকে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ছাত্র বিক্ষোভে পুনরায় অংশগ্রহণ রোধ করতে মুম্বাই পুলিশ শিক্ষার্থীদের অবস্থান ডিজিটাল ট্র্যাক করছে এবং তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হাজির হচ্ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার এনডিটিভি অনলাইন এ তথ্য জানিয়েছে। বিদ্যমান ফার্স্ট ইনফরমেশন রিপোর্ট (এফআইআর)-এ নাম থাকা বা পূর্বে আইনি নোটিশ পাওয়া বিক্ষোভকারীরা স্থানীয় থানা থেকে সরাসরি ফোন কল এবং খুদেবার্তার মাধ্যমে অনুরোধ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট এবং যাচাইকৃত স্ক্রিনশটগুলোতে এমন ঘটনা দেখা গেছে, যেখানে থানার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ব্যক্তিদের বাড়িতে থাকতে এবং নির্দেশ পালন নিশ্চিত করার জন্য ক্রমাগত তাদের হোয়াটসঅ্যাপ লাইভ লোকেশন শেয়ার করতে নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া, ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (বিএনএসএস)-এর ধারা ৩৫(৩)-এর অধীনে ভোরবেলা মেসেজিং অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে ডিজিটালভাবে আইনি নোটিশ জারি করা হয়েছে। তাতে বার্তা প্রাপকদের পূর্ববর্তী সমাবেশ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হাজির হতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল প্রচারণার পাশাপাশি, মুম্বাইয়ের উপশহর এবং পার্শ্ববর্তী পৌর এলাকাজুড়ে ছাত্র বিক্ষোভকারীদের বাসভবনে সরাসরি উর্দিধারী পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। কর্মকর্তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবারগুলোকে চলমান তদন্তের বিষয়ে অবহিত করেন এবং জনসমাবেশে আর যোগদান না করার পরামর্শ দেন। অন্যদিকে, প্রধান মেট্রো ও রেলপথে প্রবেশের স্থানগুলোর কাছে মোতায়েন থাকা পুলিশ দলগুলো মূল সমাবেশস্থলের দিকে যাতায়াতকারী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে অন্য পথে পাঠিয়ে দেওয়ার কাজ করছে। রাস্তায় তল্লাশির সময় দ্রুত শনাক্তকরণের সুবিধার্থে পূর্বে আটককৃত ব্যক্তিদের তথ্য ও নথিও বিভিন্ন থানাজুড়ে বিতরণ করা হয়েছিল। বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই পদক্ষেপগুলোকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এর উদ্দেশ্য হলো তরুণ নাগরিকদের নামে আনুষ্ঠানিক ফৌজদারি রেকর্ড তৈরি হওয়া থেকে বিরত রাখা, যা পাসপোর্ট প্রক্রিয়াকরণ, উচ্চশিক্ষায় ভর্তি এবং ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের সুযোগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে, বিক্ষোভকারীদের সহায়তাকারী প্রতিরক্ষা আইনজীবী এবং আইনি সহায়তাকারী গোষ্ঠীগুলো যুক্তি দেখিয়েছে, ইলেকট্রনিক অবস্থান ট্র্যাকিং, মেসেজিং গ্রুপ চেক এবং বাড়িতে পরিদর্শন সাধারণ প্রতিরোধমূলক প্রোটোকলের সীমা অতিক্রম করে এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও চলাচলের সাংবিধানিক স্বাধীনতা নিয়ে গুরুতর আইনি প্রশ্ন উত্থাপন করে। এদিকে, দিল্লিতে সিজেপি সমর্থকরা বৃহস্পতিবারও যন্তর মন্তরে তাদের অবস্থান ধর্মঘট অব্যাহত রেখেছে। তারা নিট-ইউজি ২০২৬ সহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনিয়মের বিষয়ে জবাবদিহিতা, শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি জানিয়েছে। গত সোমবার ককরোচ জনতা পার্টি সংসদ ভবন অভিমুখে মিছিল নিয়ে যায়। ওই সময় বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জসহ সহিংস পদক্ষেপ নেয় পুলিশ।-এফএনএস