শফিকুল আলম সমাপ্ত : রজশাহী ‘শিক্ষা নগরী’ হিসেবে দেশজুড়ে সমাদৃত হলেও, বর্তমানে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা কোচিং সেন্টারগুলোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং এর বাণিজ্যিকীকরণ আমাদের মূল শিক্ষা ব্যবস্থাকে গ্রাস করে ফেলছে। আমাদের শৈশবে ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে বন্ধুদের সাথে দেখা করা, আড্ডা দেওয়া আর প্রিয় শিক্ষকের স্নেহের টানে যেভাবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্কুলে ছুটে যেতাম, সেই নিখাদ আনন্দ আজকের শিশুদের জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। আজকের বাচ্চারা স্কুলে যায় এক অদৃশ্য ও তীব্র প্রতিযোগিতার চাপ মাথায় নিয়ে, যেখানে প্লে-নার্সারি থেকেই তাদের ওপর জিপিএ-৫ পাওয়া বা ফার্স্ট হওয়ার এক মানসিক বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়। স্কুল শেষ হতে না হতেই শুরু হয় কোচিং আর প্রাইভেটের চক্কর। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একটানা এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে দৌড়াতে দৌড়াতে বাচ্চারা শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রচণ্ড ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। যে যান্ত্রিক জীবন তাদের শৈশব, আড্ডা, বিনোদন ও খেলার অবসর কেড়ে নেয়, তার প্রতি এক ধরণের প্রচ্ছন্ন অনীহা তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া, ডিজিটাল যুগের স্মার্টফোন ও ভার্চুয়াল জগত তাদের ঘরে বসেই কৃত্রিম বিনোদন দিচ্ছে, যার ফলে স্কুলের প্রতি সেই চিরন্তন টান আজ আর নেই। এই সামগ্রিক সংকট থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে “রাজশাহীর শিক্ষা ব্যবস্থায় ফিরিয়ে দাও স্কুল, কোচিং দৌড় বন্ধ হোক”—এই প্রতিপাদ্যকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আমাদের সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত কিছু সমাধানে আসতে হবে।
প্রথমত, আমাদের স্কুল-কলেজের শ্রেণীকক্ষের পাঠদানকে অনেক বেশি আকর্ষণীয়, আধুনিক ও কার্যকর করতে হবে। শিক্ষকেরা যদি মাল্টিমিডিয়া ও প্র্যাক্টিক্যাল ল্যাবের সাহায্যে প্রতিটি বিষয় সহজভাবে ক্লাসেই বুঝিয়ে দেন, তবে শিক্ষার্থীদের বাইরে যাওয়ার তাগিদ থাকবে না। বিশেষ করে যারা ক্লাসে পড়া একবারে বুঝতে পারে না, তাদের জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষ যদি নিয়মিত বাড়তি ক্লাস বা বিশেষ সহায়তার আয়োজন করে, তবে কোচিংয়ের প্রয়োজনীয়তা এমনিতেই শূন্যে নেমে আসবে। এর সাথে পরীক্ষার মূল্যায়ন পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন জরুরি। পরীক্ষায় যদি গাইড বই বা কোচিংয়ের শিট থেকে সরাসরি প্রশ্ন না এসে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও মেধা যাচাইয়ের যোগ্যতাভিত্তিক প্রশ্ন করা হয়, তবে মুখস্থ করার এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ হয়ে যাবে।
দ্বিতীয়ত, স্থানীয় কোচিং সেন্টারের মালিকদের সাথে সরাসরি সংলাপ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি সুনির্দিষ্ট আচরণবিধি তৈরি করা যেতে পারে। তাদের ডেকে এই অনুরোধ জানাতে হবে যেন তারা কোনো অবস্থাতেই স্কুল বা কলেজের মূল সময়সূচীর মধ্যে কোচিংয়ের ব্যাচ না রাখেন এবং মূলধারার সরকারি বা নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা যাতে তাদের সেন্টারে ক্লাস না নেন। প্রশাসনিকভাবে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে নিয়মিত মনিটরিং ও টাস্কফোর্স গঠনের মাধ্যমে নিবন্ধনহীন বা নিয়ম লঙ্ঘনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সাথে পাড়া-মহল্লা বা স্কুলের লাইব্রেরিগুলোকে সক্রিয় করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দলগতভাবে পড়াশোনা বা গ্রুপ স্টাডির স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
সর্বোপরি, এই সামগ্রিক পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে হবে পরিবারকে। অভিভাবকদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে সন্তানকে জিপিএ-৫ পাওয়ার অন্ধ দৌড়ে শামিল না করে, তার নিজের মতো করে শেখার স্বাধীনতা ও মানসিক বিকাশের দিকে নজর দিতে হবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় স্কুল ও পরিবার যদি শিক্ষার্থীর প্রধান ভরসাস্থল হয়ে ওঠে, তবেই রাজশাহীর শিক্ষা ব্যবস্থা এই বাণিজ্যিকীকরণ ও কোচিং সংস্কৃতির একচেটিয়া প্রভাব থেকে মুক্তি পাবে এবং শিশুরা আবার আনন্দের সাথে স্কুলমুখী হবে। লেখক : সমাজসেবক ও রাজনৈতিক কর্মী।