তানোর থেকে প্রতিনিধি : বরেন্দ্র অঞ্চল হিসেবে খ্যাত রাজশাহীর তানোর উপজেলার মাঠ জুড়ে রোপা আমন ধান রোপনে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষক ও কৃষানীরা। দম ফেলার সময় নেই। কে কার আগে জমি রোপন করবে এমন প্রতিযোগিতা চলছে মাঠ জুড়ে। দিগন্ত মাঠে কেউ জমি চাষ করছেন, কেউ চারা তুলছেন, আবার কেউ জমি রোপন করছেন, কেউ জমি পরিস্কার করছেন ইত্যাদি ইত্যাদি। মাঠের প্রতিটি জমিতে বর্ষার পানি জমেছে প্রচুর, সেই সঙ্গে শুরু হয়েছে আমন ধানের রোপণ কাজ। আর সেই রোপণ কাজকে ঘিরে গ্রামীণ জনপদে বইছে এক উৎসবের আমেজ। কৃষাণ-কৃষাণীরা গানের তালে তালে দল বেঁধে নেমে পড়েছেন জমিতে। বৃষ্টির পানিতে ভেজা কাদা-মাখা মাঠ যেন তাদের শ্রম ও সুরের মিলনে পরিণত হয়েছে এক প্রাণবন্ত দৃশ্যে। টানা আষাঢ় ও শ্রাবনের বৃষ্টি হওয়ায় এখন রোপা আমন ধান রোপণের ধুম পড়েছে উপজেলা জুড়ে।
রোপা আমন ধান রোপণে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছেন চাষিরা। চলছে জমি তৈরি, চারা তোলা আর ধান রোপণের কাজ। চাষিদের কোলাহলে মুখরিত মাঠের পর মাঠ। বীজতলা থেকে চারা তোলা ও মাঠ পরিষ্কারের কাজে পুরুষদের পাশাপাশি অংশ নিচ্ছেন আদিবাসী নারীরাও। সরেজমিনে গিয়ে উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে। এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে রয়েছে এবং ঠিকমতো কৃষকরা রোপা আমন ধানের আবাদ করতে পারলে অতিরিক্ত খাদ্যশস্য উৎপাদন হবে।
উপজেলায় চলতি আমন মৌসুমে ২২ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে আমন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যেটা অর্জনে মাঠ পর্যায়ে কৃষি বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বর্তমান সময়ের মতো অব্যাহত থাকলে লক্ষ্যমাত্রার অতিরিক্ত জমিতে রোপা আমন ধান লাগানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, মাঠে মাঠে আগাছা পরিষ্কার, জমি প্রস্তত বীজতলা থেকে ধানের চারা তোলা ও জমিতে চারা রোপণে ব্যাস্ত শত শত কৃষক। কেউ কেউ জৈবসার জমিতে দিতে ব্যস্ত আবার অনেকে জমি তৈরি করছেন। এখন চাষিরা জমি প্রস্তত চাষাবাদ এবং ধানের চারা রোপণে ব্যস্ত সময় কাটছে। এভাবেই ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত ফসলের মাঠে নিরলসভাবে কাজ করছেন তারা।
উপজলার কামারগাঁ ইউনিয়নের আমন চাষি আব্দুল বলেন, আমি এ বছর ৪ বিঘা জমিতে রোপা আমন চাষাবাদ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এর মধ্যে তিন বিঘা জমিতে আমন ধানের চারা রোপন করেছি। আবহাওয়া অনুকুলে থাকলে শীঘ্রই বাকি জমিতে ধান রোপন করব।
পৌর এলাকার আমন চাষি রনি, এন্তাজ, হামেদ জানান, বর্তমানে যে বৃষ্টিপাত হচ্ছে তাতে করে মাঠে আমন ধানের চেহারায় পরিবর্তন আসবে। যারা এখনও ধানের চারা রোপণ করেনি তাদের জন্যেও চারা রোপণের আবহাওয়া এখন অনুকূলে রয়েছে।
কৃষক হাসান আলী বলেন, সারের ও কিটনাশক দাম দিন দিন বেড়েই চলছে, আবার শ্রমিক খরচও অনেক বেশি ১ বিঘা জমিতে ধান চাষ করতে প্রায় ৯/১০ হাজার টাকার বেশি খরচ হচ্ছে। এনজিও থেকে লোন নিয়ে ধান চাষে নেমেছি ভালো ফলন না পেলে মাঠে মারা যাওয়া ছাড়া কোন উপায় থাকবেনা।
উপজেলা সাইফুল্লাহ আহমেদ আহমেদ বলেন, উপজেলার কৃষকদের রোপা আমন ধান চাষে আগ্রহ রয়েছে। বৃষ্টি হওয়ায় কৃষকরা বর্তমানে পুরোদমে আমন ধানের চারা রোপণে ব্যস্ত সময় পার করছেন। আবহাওয়া বর্তমানে অনুকূলে রয়েছে। এ অবস্থা থাকলে আমরা আশা করছি ঠিকঠাক মতো রোপা আমন আবাদ শেষ হবে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে রোপা আমন ধানের চাষাবাদ হবে। প্রন্তিক কৃষকদের পাশে বিভিন্ন পরামর্শ সহ যেকোনো সেবায় নিয়োজিত আছে উপজেলা কৃষি বিভাগ।
কৃষকরা জানান, জমি আছে এজন্য চাষাবাদ করা হচ্ছে। তাছাড়া চাষাবাদ করা বন্ধ হয়ে যেত। গত বোরো মৌসুম ও আলু উত্তোলনের পর ওই জমির ধানে প্রচুর লোকসান গুনতে হয়েছে। একমন ধান বিক্রি করে একজন ধান কাটা শ্রমিকের মজুরি জুটেনি। ৯০০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকা মনে ধান বিক্রি করতে হয়েছে। আবার আলুর জমির ২ মনে বস্তা ঠিকা ধান বিক্রি করতে বাধ্য হতে হয়েছে। বস্তা ঠিকা ২ মন ধান ১৫০০ টাকা থেকে ১৬০০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হতে হয়। আবার ২ মন ধানে ৩ থেকে ৪ কেজি করে ঢোলন দিতে হয়। বোরো ধানে লোকসান, আলুতে লোকসান, আলুর জমির ধানে লোকসান, এত লোকসান সহ্য করার মত অবস্থা নাম। নিজস্ব জমিতে বিঘায় ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা করে লোকসান হয়েছে। যারা লীজ নিয়ে চাষাবাদ করেছিলেন তাদেরকে পথে বসতে হয়েছে। একারনে এবারে জমি লীজ নিয়ে চাষাবাদ নাই বললেই চলে। কৃষকের ঘরেঘরে নিরব দূর্ভীক্ক চলছে। অথচ বাজারে প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়তি হলেও ধান আলুর দাম নাই।
মুনসুর নামের এক চাষী জানান, প্রতি বছর ৩ থেকে ৪ বিঘা জমি লীজ নিয়ে চাষাবাদ করি। কিন্তু এবারে যে অবস্থা তাতে লীজ নিয়ে জমি চাষাবাদ করিনি। কারন দেখা যাচ্ছে লীজ নিয়ে আবাদ করা মানে প্রচুর লোকসান গোনা। দেখেশুনে কেউ তো আর লোকসান গুনবে না।
রনি নামের এক কৃষক জানান, তিন বিঘা জমিতে রোপা আমন দান রোপন করা হয়েছে। একবিঘা জমিতে চারটা চাষ বাবদ ২ হাজার টাকা, শ্রমিক ২ হাজার টাকা, ১০কেজি ডিএপি ৩০০ টাকা,ইউরিয়া ১৫কেজি ৫০০টাকা, পটাশ ১৫ কেজি ৩৬০টাকা, বীজ ১ হাজার টাকা ও কীটনাশক ২ হাজার টাকা করে রোপনের সময় খরচ হচ্ছে। সব মিলে প্রকার ভেদে ৮ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৯ হাজার টাকা। আবার অনেকের ৯ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা করে খরচ হচ্ছে। যাদের বীজ কিনা ও জমি লীজ নিয়ে রোপন তাদের আরো বেশি খরচ হচ্ছে।
উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আকবর বলেন, এরই মধ্যে পৌর এলাকার জমিতে রোপা আমন ধান চাষ শেষের দিকে। বাকি জমিগুলোতে রোপা আমন আবাদের প্রস্ততি চলছে জোরেশোরে। রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও চারা বীজের সংকট না থাকায় কৃষক রোপা আমন ধান আবাদে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। কৃষি অফিসার সাইফুল্লাহ আহমেদ জানান, এবারে রোপা আমনের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২২ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমি। এপর্যন্ত রোপন হয়েছে ৯ হাজার হেক জমি। এক সপ্তাহের মধ্যে পুরো জমি রোপন হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তিনি আরো জানান, পানির সমস্যা নেই, বীজের সমস্যা নেই, সার কীটনাশকের সমস্যা নেই, সবকিছু অনুকূলে থাকার কারনে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রোপনের কাজ চলছে।