বাদীর পরিচয় নিশ্চিতে হাইকোর্টের ৫ নির্দেশনা
এফএনএস : থানা, আদালত বা ট্রাইব্যুনালে এজাহার বা অভিযোগ দায়ের করার সময় অভিযোগকারীর পরিচয় যথাযথভাবে নিশ্চিত করতে ৫ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে, রুল জারি করে ৬০ দিনের মধ্যে যেসব মামলায় বাদীর অস্তিত্ব নেই সেসব মামলা দায়েরের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে প্রতিবেদন দিতে পুলিশের মহাপরিদর্শক ও সিআইডিকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
আদেশটি প্রতিপালনের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সচিবকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। রাজধানীর শান্তিবাগ এলাকার বাসিন্দা একরামুল আহসান কাঞ্চনের বিরুদ্ধে হওয়া মামলায় অস্তিত্বহীন বাদী খুঁজে বের করার নির্দেশনা চেয়ে করা এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গত ১৪ জুন হাইকোর্টের বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত ভার্চুয়াল বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
ওই আদেশের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি গত বুধবার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবী। বাদীর পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার বিষয়ে যেসব নির্দেশনা দেয়া হয়েছে সেগুলো হলো-
১. অভিযোগ বা এজাহারে অভিযোগকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নম্বর এবং ক্ষেত্র বিশেষে পাসপোর্ট নম্বর উল্লেখ করতে হবে।
২. এজাহার দায়েরকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকলে সে ক্ষেত্রে তাকে শনাক্তকারী ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর উল্লেখ করতে হবে।
৩. বিশেষ বাস্তব পরিস্থিতিতে জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট নম্বর সহজলভ্য না হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা এজাহার দায়েরকারীর পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার জন্য স্বীয় বিবেচনায় অন্যান্য যথাযথ পদ্ধতি গ্রহণ করবেন।
৪. আদালত কিংবা ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দাখিলের ক্ষেত্রে অভিযোগকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট না থাকলে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী অভিযোগকারীকে শনাক্ত করবেন।
৫. অভিযোগকারী প্রবাসী কিংবা বিদেশি নাগরিক হলে সংশ্লিষ্ট দেশের পাসপোর্ট নম্বর উল্লেখ করতে হবে।
ধর্ষণ, মারধর, চুরি, মানবপাচার- এমন সব অভিযোগে দেশের ১৩টি জেলায় করা ২০টি মামলার চক্করে রাজধানীর শান্তিবাগের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী একরামুল আহসানকে ২ হাজার ৪৬৫ দিন কারাভোগ করতে হয়।
এ অবস্থায় ওই সব মামলা ‘মিথ্যা’ উল্লেখ করে মামলা দায়েরে সম্পৃক্ত বা বাদীকে খুঁজে বের করতে তদন্তের নির্দেশনা চেয়ে গত ৭ জুন হাইকোর্টে রিট করেন ৫৫ বছর বয়সী একরামুল আহসান কাঞ্চন। ওই রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গত ১৪ জুন হাইকোর্ট রুল জারিসহ আদেশ দেন।
রিট আবেদনকারীর (একরামুল) বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক ওই সব মামলা দায়ের জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে ৬০ দিনের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দিতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অতিরিক্ত মহাপরিদর্শককে নির্দেশ দেয়া হয়। সেই সঙ্গে মামলা বা অভিযোগ দায়েরের ক্ষেত্রে বাদীর পরিচয় নিশ্চিতে কয়েক দফা নির্দেশনা দেন আদালত।
আদালতে ওইদিন রিটের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন ও আইনজীবী এমাদুল হক বশির। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অরবিন্দ কুমার রায় ও বিপুল বাগমার। সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সিরাজুল ইসলাম ও মো. সোলায়মান। মারধর, প্রতারণা, চুরি, অ্যাসিড নিক্ষেপ, মানবপাচার, ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের অভিযোগে ১৩টি জেলায় একরামুলের বিরুদ্ধে ৪৯টি মামলা হয় বলে জানান তার আইনজীবী এমাদুল হক বশির।
তিনি বলেন, এসব মামলার মধ্যে কোনোটিতে বাদীকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। আবার কোনোটিতে সাক্ষী আসেননি। এদিক বিবেচনায় ৩৬টি মামলায় ইতোমধ্যে একরামুল নিম্ন আদালত থেকে খালাস পেয়েছেন। বাকি ১৩টি মামলা বিচারাধীন। তার বিরুদ্ধে ৪৯টি মামলার মধ্যে ২০টি মামলায় ২ হাজার ৪৬৫ দিন কারাভোগ করেছেন একরামুল। হয়রানির উদ্দেশে ‘মিথ্যা’ মামলা দিয়ে তাকে কারাগারে রাখা তার ব্যক্তিস্বাধীনতার লঙ্ঘন উল্লেখ করে রিটটি করা হয়।
আইনজীবীর দেয়া তথ্যমতে, ঘটনার শুরু ২০১১ সালে। মারধরের অভিযোগে নারায়ণগঞ্জের এক মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানাসূত্রে ওই বছরের ১৭ নভেম্বর কারাগারে যান একরামুল। একে একে তার সামনে আসতে থাকে মামলা।
পরোয়ানাসূত্রে ১৩টি জেলায় নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। একবার জামিনে বের হন, পরে আবার অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো বা গ্রেফতারি পরোয়ানা সূত্রে তাকে আবার কারাগারে যেতে হয়। আবার কোনো মামলাসূত্রে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করেন তিনি। এর মধ্যে মানবপাচারের অভিযোগে চাদপুরের এক মামলায় গত বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি জামিনে মুক্তি পান একরামুল।
মামলায় জামিনে মুক্তি পেয়ে একরামুল রিট করেন। নারায়ণগঞ্জের কুতুবপুরে অবস্থিত আনোয়ার ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিংয়ের মালিক তিনি। রিটে স্বরাষ্ট্র সচিব, পুলিশের আইজিপি, অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (এসবি), অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (সিআইডি), মহাপরিচালক র্যাব, ঢাকার পুলিশ কমিশনারসহ ৪০ জনকে বিবাদী করা হয়েছে।
