মঙ্গলবার

২১শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

৮ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নওগাঁয় বোরোর বাম্পার ফলন

Paris
Update : সোমবার, ৮ মে, ২০২৩

সুমন আলী, নওগাঁ

নওগাঁর মাঠে মাঠে বোরো ধান ঘরে তুলতে এখন ব্যস্ত কৃষকরা। প্রতিদিন সূর্য ওঠার আগেই কাস্তে হাতে মাঠে ছুটছেন তারা। প্রচণ্ড রোদের মধ্যেই জমি থেকে কষ্টের ফসল ঘরে তোলায় তাদের যেন নেই ক্লান্তি। এ বছর পোকামাকড় ও রোগবালাই কম হওয়ায় ধানের ফলন ভালো হয়েছে। বাজারে ধানের দামও ভালো পাচ্ছেন কৃষকরা।

নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরও বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইতোমধ্যে জেলায় পুরো দমে শুরু হয়েছে ধান কাটা ও মাড়াই। কৃষকের ঘরে ঘরে চলছে নতুন ধান তোলার উৎসব। শনিবার পর্যন্ত জেলায় ৪৫ শতাংশ ধান কাটা-মাড়াই শেষ হয়েছে।

চলতি বোরো মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৯০ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। প্রতি হেক্টর জমিতে ৬ দশমিক ৫৭ মেট্রিক টন ধান এবং ৪ দশমিক ৩৮ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এই হিসেবে জেলায় চলতি বোরো মৌসুমে ১২ লাখ ৫৪ হাজার ৫৪০ মেট্রিক টন ধান ও ৮ লাখ ৩৬ হাজার ৩৬০ মেট্রিক চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এবার জেলায় জিরা, কাটারি, উচ্চফলনশীল (উফশী) ব্রি-২৮, ব্রি-৯০ ও শুভলতা জাতের ধান বেশি চাষ হয়েছে। মাঝে লোডশোডিংয়ের কারণে সেচের পানির সংকট দেখা দিলেও ফলনে তেমন প্রভাব পড়েনি। বিঘাপ্রতি ২২ থেকে ২৫ মণ ধান হচ্ছে। এবার প্রতি কেজি ধান উৎপাদনে কৃষকের খরচ পড়েছে ২৩ টাকা ৬০ পয়সা। গত বছর প্রতি কেজি ধানের উৎপাদন খরচ ছিলো ১৭ টাকা ৮০ পয়সা। সার ও কীটনাশকের দাম বৃদ্ধি এবং কৃষি শ্রমিকের মজুরি বাড়ায় প্রতি কেজি ধান উৎপাদনে খরচ বেড়েছে ৫ টাকা ২০ পয়সা।

কৃষকেরা জানান, এ জেলার মানুষের প্রধান ফসল ধান। এই ধানের ওপরেই তাঁদের সব নির্ভর করে। সংসারের খরচ, ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া, সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানসহ আনুষঙ্গিক ব্যয়- সবই ধান বিক্রির টাকা দিয়ে করা হয়। এবার বোরো ধানের ফলন ভালো হয়েছে। প্রত বিঘায় ২২ থেকে ২৫ মণ করে ধানের ফলন হচ্ছে। গত বছর মৌসুমের শেষ দিকে ধান কাটার আগ মূহূর্তে ঝড়-বৃষ্টির কারণে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিলো। এর ফলে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ ধানের ফলন হয়েছিল। গত বছর ধানের ফলন ছিল ১৮ থেকে ২০ মণ করে। ধানের দামও গত বছরের এই সময়ের চেয়ে এবার বেশি। তবে  দফায় দফায় সার, ডিজেল ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিতে ধান উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওযায় খুব একটা লাভবান হচ্ছেন না তারা।

নওগাঁর হাটবাজারগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে জিরাশাইল, কাটারিভোগ ও বিআর-২৮ জাতের ভেজা ধান উঠতে শুরু করেছে। ধানের আর্দ্রতা ও দানার পুষ্টতা অনুযায়ী জিরাশাইল ধান প্রতি মণ ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২৭০ টাকায়, কাটারিভোগ ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায় এবং বিআর-২৮ ধান ৯৫০ থেকে ১ হাজার ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত বছর এই সময়ে প্রতিমণ জিরাশাইল ধানের দাম ছিল ১ হাজার ৫০ টাকা, কাটারিভোগের দাম ছিলো ১ হাজার ১০০ টাকা এবং প্রতি মণ বিআর-২৮ ধানের দাম ছিলো ৮৫০ টাকা।

রানীনগর উপজেলার মিরাট ইউনিয়নের কনৌজ গ্রামের কৃষক আশরাফুল বলেন, আমি দেড় বিঘা জমিতে কাটারি ধান লাগাইছিলাম। আজ ধান কাটছি। এবার পানি খরচ একটু বেশি হয়ছে। তারপরও ফলন ভালো। ৩৩ শতকের বিঘেই আমার না হলেও ২৩ মণ হারে ফলন হবে। তবে এক বিঘা জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেছি এতে করে খুব এক লাভবান হবে না। একই এলাকার কৃষক বাচ্চু মন্ডল বলেন, আমি ৫ বিঘা জমিতে জিরাশাইল ও কাটারি জাতের ধান করেছি। এর মধ্যে জিরাশাইল এক বিঘে জমির ধান বাড়িতি নিয়ে গিয়ে মাড়াই করিচি। আমার ২৪ মণ হারে ফলন হয়ছে। এবার মনে করেন পানি খরচ, জন (শ্রমিক) খরচ একটু বেশি লাগেছে। তারপরও বাজারে ধানের দাম এখন মোটামুটি ভালো। এর চাইতে যদি দাম কমে যায় তাহলে আমাদের লস হবে।

সদর উপজেলার শিকারপুর ইউনিয়নের বিল-ভবানীপুর গ্রামের মাজেদুল ইসলাম জানান, তিনি এবার ৩ বিঘা জমিতে কাটারি জাতের ধানের আবাদ করেছেন। জমিতে সেচ, সার, ধান কাটা, বাড়িতে নিয়ে যাওয়া সব মিলিয়ে তার খরচ হয়েছে ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা। তিনি বলেন, বিঘা প্রতি ২৪-২৫ মণ হারে ফলন হয়েছে। এখন যে বাজার দর, এক মণ ধান এক হাজার টাকার উপরে বিক্রি হচ্ছে। তাতে ধান বিক্রি করলে কিছু টাকা লাভ হবে।  নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর কার্যালয়ের উপ-পরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেন, এবার ধানের ফলন ভালো হওয়ায় ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রতি হেক্টরে ৬ দশমিক ৫৭ মেট্রিক টন। তবে ধানের ফলন দেখে মনে হচ্ছে, আকাশের পরিস্থিতি ভালো থাকলে এই লক্ষ্যমাত্রাও এবার ছাড়িয়ে যেতে পারে। মে মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত ধান কাটা চলবে। তিনি বলেন, যেহেতু এবার ধান উৎপাদনে কিছুটা খরচ বেশি হয়েছে। এই জন্য সরকারিভাবে ধানের দামও বাড়ানো হয়েছে। বাজারে বর্তমান ধানের দাম ভালো আছে। আশা করি কৃষকরা লাভবান হবেন।


আরোও অন্যান্য খবর
Paris