আব্দুস সবুর, তানোর
আলু উত্তোলন শেষ হওয়ার পর রোপন করা হয়েছে ধান, ওই সব জমিতে নানা ধরনের পোকা মাকড়ে ভরে আছে, সে সব পোকা মাকড় খেতে বকপাখির ঘটেছে আগমন, ঝাকের ঝাক সাদা রংয়ের বগপাখি জীবিকার জন্য ছুটে আসছে। দিগন্ত মাঠে সাদা রংয়ের বগপাখি সবুজ কচি পাতার ধানী জমিতে বিচরন করে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করছে, শুধু নিজেদের জন্য না বাচ্চা বগপাখিকে খাওয়াতে নিয়ে যাচ্ছে গন্তব্য স্থানে। রাজশাহীর তানোর উপজেলার বিভিন্ন ধানী মাঠে হাজার বগপাখির দেখা মিলছে। আবার এক সঙ্গে কয়েক বগপাখি উড়ে চলে যাচ্ছে। পুরো মাঠ তখন সাধা আকার ধারন করছে। তবে বন জঙ্গল না থাকা ও প্রচন্ড খরতাপের কারনে নিমিষেই হারিয়ে যাচ্ছে শুধু বগ না বিভিন্ন প্রজাতীর পাখি।
কৃষক সুলতান জানান, উপজেলার তালন্দ ইউপির বিলশহর মাঠে সপ্তাহ হয়েছে ধান রোপন করা। রোপনের দুচার দিন ঝাকেঝাকে বগপাখি পড়ত। দিনভর জমিতেই ছিল তাদের বিচরন। প্রায় পুরো মাঠেই দেখা যেত বগপাখি। ধানগাছের বিভিন্ন পোকা মাকড় খেত, একারনে রোগবালার হাত থেকেও রক্ষা পাওয়া যেত। আর বগপাখির পায়খানা জমিতে পড়ত, জমি হয় উর্বর। এদিকে রোগ থেকে মুক্ত থাকছে, অপর দিকে জমি উর্বর। আরেক চাষী মুস্তফা জানান, চাপড়া মাঠেও বগপাখি প্রচুর ভাবে দেখা যেত। কিন্ত কয়েকদিন থেকে শেষ বিকেলে সামান্য পরিমান দেখা যাচ্ছে। কারন কয়েকদিন ধরে রোদের প্রখরতার কারনে মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারছেনা। পাখির নিজ বাসা থেকে বের হচ্ছে না।
জানা গেছে, দেশের মধ্যে এউপজেলায় আলুর চাষাবাদে তৃতীয় অবস্থায়। যাকে বলে কৃষি ভান্ডার। প্রায় সাড়ে ১৪-১৫ হাজার হেক্টর জমিতে আলুর চাষাবাদ হয়ে থাকে। আলু উত্তোলনের পর ওসব জমিতে ধান চাষ হয়। আলু তোলার পর পাওয়ার টেলার দিয়ে দুএকটি চাষের পর জমি রোপন করা হয়। রোপনের সময় ও তার কয়েকদিন বগপাখির বিচরনে থাকে প্রচুর। কারণ চাষের সময় পোকা মাকড় দেখা যায় ব্যাপক হারে। রোপনের সময় ও কীটনাশক ব্যবহারের আগ পর্যন্ত বগপাখির সমারোহ। কিন্তু কীটনাশক ব্যবহারের পর থেকে আর দেখা মিলেনা পাখির।
কৃষক শরিফুল, মানিক, খলিলসহ অনেকে জানান, কয়েক বছর আগেই জমি রোপনের সময় বগপাখি শালিকসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির বিচরন ছিল মনোমুগ্ধকর। কিন্তু কালের আবর্তে মাঠের উঁচু জমিতে থাকা বন কেটে উজাড় করার জন্য হারিয়ে গেছে ধান গাছ কে রোগ মুক্ত রাখা পাখি। যার কারনে রোপনের কয়েকদিন পর থেকেই ব্যবহার করা হয় কীটনাশক, যা জমির উর্বরতা নষ্ট করে ফেলছে। অতীতে পাখির বিচরনে ধানগাছ ছোটখাটো রোগবালা থেকে মুক্ত থাকত, প্রয়োজন ছাড়া কীটনাশক ব্যবহার হত না। আর এখন রোগ আসুক আর নাই আসুক কারন অকারনে পর্যাপ্ত পরিমানে কীটনাশক ব্যবহারের কারনে প্রকৃতির পাখিকুল হারিয়ে গেছে। শুধু আলুর জমিতে ধান রোপনের সময় ও দুএক দিন বগপাখির দেখা মিলে।
সম্প্রতি বিলশহর মাঠে ঝাকের ঝাক পাখি দেখা যায়, সেখানেই কথা হয় শামসুদ্দিন নামের এক ইউপি সদস্যের সাথে তিনি জানান, জমি রোপনের সময় অতীতে প্রচুর পাখি দেখা মিলত। কৃষক শ্রমিকরাও ফাদ পেতে পাখি ধরত। পাখির কিচির মিচিরে মুগ্ধ হয়ে যেত শ্রমিকরা। পাখিকে সরিয়ে রোপন কাজ করতে হত। কিন্তু সেই দৃশ্য আর নেই। এখন মাঝে মধ্যে বগপাখি আসতে দেখা যায়। শেষ বিকেলে তার সাথে কথা হচ্ছিল ওই সময় বিভিন্ন মাঠ থেকে বকপাখি আসছে, আবার চলে যাচ্ছে।
পরিবেশ নিয়ে কাজ করা কৃষক জাইদুর জানান, প্রকৃতির গুরুত্ব কতটা সেটা আমরা বুঝতে চায়না। বিগত পাঁচ বছর আগে প্রতিটি ধানী মাঠে একাধিক বনজঙ্গল ছিল। ধান রোপনের সময় ওই সব বনজঙ্গলে থাকা পাখি গুলো রোপন থেকে উত্তোলন পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের পোকা মাকড় খেয়ে ধানগাছকে রোগ বালা থেকে মুক্ত রাখতে সক্ষম হত। কিন্ত পাঁচ বছরের মধ্যে মাঠের বনজঙ্গল উজাড় করে ফেলা হয়েছে। এজন্য পাখির আবাস্থল নেই। যার কারনে তেমন ভাবে চোখে পড়েনা।
উপজেলা কৃষি অফিসার সাইফুল্লাহ আহম্মেদ জানান, ধান রোপনের সময় ও তার কয়েকদিন ধরে নিয়োমিতই বকপাখির বিচরন দেখা মিলে। এই পাখির কৃষকের একপ্রকার আশির্বাদ। কারন পাখি একদিকে পোকামাকড় খেয়ে ধান গাছকে রোগ মুক্ত করছে, অপর দিকে পাখির টয়লেটে জমির উর্বরতা বাড়ছে। হয়তো সেটা কৃষকরা তেমন ভাবে লক্ষ করেনা। কিন্তু এক জমিতে যদি ৫০ টি পাখি তিন চার ঘন্টা থাকে তাহলে তাদের কি পরিমান টয়লেট জমিতে পড়ছে এবং কি পরিমান উর্বরতা পাচ্ছে কল্পনাতীত। বনজঙ্গল কমে যাওয়ার কারনে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি যারা ধানী জমিতে সার্বক্ষণিক থাকত সেসব পাখিগুলো কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে। অতীতে কৃষকরা ধান রোপনের অনেকদিন পরে কীটনাশক ব্যবহার করত, আর এখন রোপনের পর এরোগ আসতে পারে এজন্য আগাম কীটনাশক ব্যবহার করছে। যা জমির উর্বরতা কমিয়ে দিচ্ছে। কীটনাশক কম ব্যবহার করে অন্য পথ অবলম্বন করে রোগবালা থেকে ধানগাছ কে কিভাবে রোগবালা থেকে মুক্ত রাখা যায়, যেমন পার্চিং পদ্ধতি কাকতারুয়াসহ নানান বিষয়ে সচেতন করা হচ্ছে এবং যারা এসব বেশি ব্যবহার করছে তারা সুফলও পাচ্ছেন।