স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহী নগরীর উপকন্ঠে কাটাখালি থানাধীন কুখুন্ডি গ্রামের আবু তালুকদারের ছেলে মারুফ হোসেন আকাশের (২২) আত্মহত্যার বিষয়টি নিয়ে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে নানা অজানা তথ্য। গত ২৬ নভেম্বর সকাল দশটায় আকাশের নিজের কক্ষ থেকে তার ঝুলন্ত লাশ দেখতে পান তার স্বজনরা। কাটাখালি থানায় খবর দিলে বিষয়টি ঐদিন একটি অপমৃত্যু হিসেবে থানায় লিপিবদ্ধ হয়। পরের দিন দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে বেশকিছু বিষয় উল্লেখ্যপূর্বক বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। প্রতিবেদনগুলোতে থানা কর্তৃপক্ষ ও আকাশের পরিবারের সদস্যদের ভাষ্যানুযায়ী বলা হয়েছিল, নতুন ক্রয়কৃত একটি মোবাইল ফোন আকাশ তার বন্ধুদের দেখাতে নিয়ে গেলে চারবন্ধু মিলে তার কাছে থাকা নতুন মোবাইলটিসহ আকাশের ব্যবহৃত আগের একটি মোবাইল সেটও বন্ধুরা জোরপূর্বক কেড়ে নেয়।
এবং ঐ রাত্রি দশটার পরে আকাশ তার ছোট ভাই আল-আমিন ও মামা আলমকে নিয়ে মোবাইল উদ্ধারে গেলে আকাশের বন্ধুরা পরের দিন বিষয়টি নিয়ে কথা বলবেন বলে তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়। কি এমন ছিল সেই মোবাইলকে ঘিরে যার জন্য আকাশ পরের দিন ২৬ নভেম্বর সকালে একটি চিরকুটে চারবন্ধুকে তার মৃত্যুর জন্য দায়ি করে নিজ ঘরে আত্মহত্যা করেন? উক্ত চিরকুটে একটি মেয়ের প্রতি নিজের ভালবাসা ও ভবিষ্যতে সুখে থাকার বিষয়টি উল্লেখ্য করে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আকাশ আত্মহত্যার পথ বেছে নিল! বিষয়টি নিয়ে গতকাল দুপুরে কাটাখালি থানায় অফিসার্স ইনচার্জের সাথে কথা বলতে গেলে সেখানে গিয়ে দেখামেলে আকাশের বাবা, ভাই, নানাসহ অন্যান্য স্বজনদের। তাদের সকলের সাথে কথা বলে জানতে পারা যায় নতুন বেশকিছু অজানা তথ্য।
থানার ওসি সিদ্দিকুর রহমানসহ আকাশের স্বজনরা জানান চিরকুটে যে মেয়ের নাম উল্লেখ্য ছিল সে আকাশের স্ত্রী। দুজনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্কের প্রেক্ষিতে উভয় পরিবারের সম্মতিতে পারিবারিক ভাবেই তাদের বিয়ে হয়েছিল। প্রায় আট মাস ঘর সংসার করার পর আকাশের স্ত্রী বাবার বাড়ী যাবার নাম করে সংসারে আর ফিরে আসেনি। প্রায় মাস খানেক হলো আকাশকে তালাক দিয়েছে। তবে, এবিষয়ে আকাশের বাবা ও নানা জানান, ওই মেয়ে নিজ থেকে আকাশ কে তালাক দেয়নি। তার পরিবারের চাপেই হয়তো সে আকাশকে তালাকনামা পাঠাইছিল। আকাশকে তালাক দেবার পর থেকে আকাশের প্রাত্যহিক চলাফেরাতে কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে কিনা প্রশ্নের জবাবে আকাশের ভাই আল আমিন জানান, ‘না সে স্বাভাবিক ছিল’।
তবে কেনো এই আত্মহত্যা জানতে চাইলে আকাশের পরিবার জানান, বন্ধুদের সাথে পাওনা টাকা নিয়ে হয়তো কোন সমস্যা ছিল; যার কারণে সে আত্মহত্যা করেছে! কিন্তু শুধুই টাকার জন্য একজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করবে বিষয়টি অনেকটাই প্রশ্নবিদ্ধ বলাতে আকাশের পরিবার আর কোন উত্তর দিতে না পারলেও পাশে বসে থাকা থানার অফিসার্স ইনচার্জ প্রতুত্তরে জানান, ‘ পুরাতন মোবইল ফোন ক্রয় বিক্রয়ের ব্যবসা করে আকাশের পরিচিত উজ্জল নামের একজন ছেলে। আকাশ উজ্জলের দোকানে গিয়েছিল ব্রান্ডের সেকেন্ডহ্যান্ড একটি দামি মোবাইল কিনতে। উক্ত সময় মিনারুল নামের একটি ছেলে ‘অপ্প’ ব্রান্ডের একটি মোবাইল সেট বিক্রির উদ্দেশ্যে এসেছিল উজ্জলের দোকনে। টাকা পরবর্তী সময়ে দিবে আশ্বাস দিয়ে ঐ সেটটা আকাশ নিয়ে যায়।
কিন্তু গত ২৫ নভেম্বর সন্ধ্যয় চার বন্ধুকে আকাশ তার নতুন মোবাইল ফোনটি দেখাতে গেলে বন্ধুরা আকাশের কাছ থেকে মোবাইল ফোনটি কেড়ে নেয়। এছাড়াও তারা আকাশ কে মারধর করে বাড়িতে চলে যেতে বলে। পরেরদিন আকাশ একটি চিরকুটে চার বন্ধু রবিন, হৃদয়, সজল ও জুয়েলকে তার মৃত্যুর জন্য দায়ি করে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে। কিন্তু, আত্মহত্যার দিন সকাল সাতটার সময় আকাশ নিয়মানুযায়ী ঘুম থেকে উঠে ব্রাশ করে আবারো নিজ কক্ষে প্রবেশ করে। সকাল আনুমানিক দশটার সময় তার বাড়ীর লোকজন জানালা দিয়ে দেখতে পান আকাশ গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছে। পরক্ষণেই তারা দরজা ভেঙ্গে ভিতের প্রবেশ করেন এবং আকাশের বিছানার উপর বালিশের নিচে থাকা একটি সুইসাইড নোট (চিরকুট) উদ্ধার করেন।
উক্ত চিরকুটে ‘রবিন, হৃদয়, সজল ও জুয়েল নামে চারজনের নাম লিখে গেছে। আমার মৃত্যুর জন্য এরা দায়ী’। আকাশ ওই চিরকুটে আরও লিখে গেছেন, ‘মা আমাকে মাফ করে দিস। …. আমি তোকে অনেক ভালবাসি। ভালো থাকিস তুই সুখে থাকিস।’ তবে উক্ত চিরকুটটিতে দুইরকম হাতের লিখা আছে। রবিন আর হৃদয়ের নাম দুটো এক হাতের লিখা; আর সজল ও জুয়েলের নাম লিখার ধরণটি অনেকটাই আলাদা। গত ২৬ নভেম্বর সকালে আকাশ আত্মহত্যা করলেও, গতকাল ২৯ নভেম্বর দুপুর পর্যন্ত থানা পুলিশ আকাশের মৃত্যুকালীন সময়ে লিখা বলে দাবি সেই চিরকুট (সুইসাইড নোট) ও আকাশের ব্যবহৃত ব্যক্তিগত পুরাতন মোবাইলটি জব্দ করেন নি। তবে, দুপুরের পরে সাংবাদিকদের সামনে আকাশের পরিবারের কাছে থাকা উক্ত দুটো ‘ক্লু সম্বলিত’ বস্তু দুটো জব্দ করেন কাটাখালি থানা কর্তৃপক্ষ! উক্ত চিরকুটটি আকাশের মৃত্যুর পর তার ঘরের বিছানার বালিশের নিচ থেকে উদ্ধার করে আকাশের মামী রোকসানা ও মামা নাইম।
সামান্য একটি মোবাইল ফোনকে কেন্দ্র করে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত কোন শিক্ষার্থী গলায় ওড়না পেঁচিয়ে নিজ কক্ষে আত্মহত্যা করবে এমন ওজুহাতকে অনেকেই সরাসরি উড়িয়ে দিচ্ছেন। এই হত্যাকান্ডের পেছনে থাকতে পারে সুপ্ত কোন গোপন রহস্য বলে মন্তব্য স্থানীয়দের। এ বিষয়ে, কাটাখালি থানার অসিসার্স ইনচার্জ সিদ্দিকুর রহমান বলেন, এই আত্মহত্যার প্রকৃত কারণ উৎঘাটন করতে আমরা সরেজমিনে কাজ করে যাচ্ছি। চিরকুটে লিখা আকাশের ঐ চার বন্ধু এখনো পলাতক আছে। তাদেরকে গ্রেফতার করে মোবাইলটা হস্তগত হলে আত্মহত্যার পেছনে প্রকৃত রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব হবে।