শাহানুর রহমান রানা : রাজশাহী নগরীর ৯নং ওয়ার্ডের অন্তর্গত হোসেনীগঞ্জ বালক সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়টি স্থাপিত হয়েছিল ১৮৫১ সালে। জাতীয়করণের তালিকায় নাম উঠে ১৯৭৩ সালে। নতুন ভবন নির্মাণকাল ১৯৮৮। ব্রিটিশ শাসনামলে ঐ স্থানে ছিল বিখ্যাত একটি ধর্মশালা। বর্তমানে যেটি মিলন মন্দির নামে পরিচিত নগরবাসির কাছে। প্রথমদিকে এই বিদ্যালয়টিকে ডাকা হতো পাঠশালা নামে। প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্জনের ক্ষেত্রে নগরীর ৮, ৯ ও ১০ নং ওয়ার্ডের মধ্যবিত্ত আর নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের একমাত্র ভরসা এই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি।
বর্তমান ছাত্র সংখ্যা প্রায় ২২৫ জন। এই বিদ্যালয়টির কল্যানেই শিক্ষানগরী রাজশাহীর স্থানীয় অধিবাসিদের প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা ব্যবস্থার হাতখড়ি বলে জানান স্থানীয় বয়জেষ্ঠ্যরা। নগরীর আর কোথাও এতো প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই বলে দাবি এলাকাবাসির। এর স্থাপত্যকাল আজ থেকে ১৭০ বছর আগে। এক কথায় বলা চলে প্রাথমিক এই বিদ্যালয়টি একটি ঐতিহ্য হিসেবে মাথা উচুঁ করে জানান দিচ্ছে রাজশাহী শহরের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাচীন ঐতিহ্যের বিষয়টিকে। কিন্তু, বিশেষ একটি মহলের চোখ পড়েছে ঐতিহ্যবাহী ও গর্বের এই প্রাচীনতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির দিকে বলে জানান বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও স্থানীয়রা।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ঐতিহ্যবাহী স্কুল ভবনটিকে করা হবে রাজশাহী থানা শিক্ষা অফিসারের কার্যালয়। আর স্কুলটি স্থানান্তর করা হবে হড়গ্রাম এলাকায়। এমন একটি সিদ্ধান্তকে বাস্তবে রূপ দিলে একদিকে যেমন আশেপাশের এলাকার মধ্যবিত্ত আর নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের শিক্ষা সেবায় পড়বে ভাটা, ঠিক অন্যদিকে, নগরীর ঐতিহাসিক সেই প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ইতিহাসের পাতা থেকে চিরতরে হয়ে যাবে ধুলিৎসাত বলে মন্তব্য করেন স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ফরিদ আহমেদ খাঁন স্বপনসহ প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা।
এর আগেও এই ঐতিহাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি বেদখল করার চেষ্টা চালানো হয়েছিল। কিন্তু, সে যাত্রায় সেটি সম্ভব না হলেও এবার সংশ্লিষ্টরা যেভাবে চেষ্টা ততবির করছেন তাতে করে হয়তো প্রাচীন এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করা যাবেনা বলে আক্ষেপ করেন বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা। সূত্রমতে, বিদ্যালয়টিকে রাজশাহী থানা শিক্ষা অফিস এর কার্যালয় করার জন্য ইতিমধ্যেই রাজশাহী সদর আসনের এমপি ফজলে হোসেন বাদশা’র কাছ থেকে ‘ডিও’ লেটার নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ঐ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে প্রাক্তন ছাত্র ঘোষপাড়া নিবাসী জুয়েল, লক্ষিপুরের আক্কাস আলী, পাঠানপাড়া নিবাসি ইমানুর রহমান, ঢাকাস্থ ল্যাব এইড হাসপাতালে কর্মরত ডা. টি.আই খান বলেন, এখানে শুধু আমি না, আমাদের বাবা-চাচা, দাদা-নানা’রও প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। এমন প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী একটি স্কুলকে অন্যত্র স্থানান্তর করলে একদিকে যেমন শিক্ষার ঐতিহ্যগত বিষয়টিকে বিনষ্ট করা হবে। ঠিক অন্যদিকে, ইতিহাসকে গলাচেপে মেরে ফেলার সমতুল্য বিষয়ও হবে। স্কুলটিতে একসময় বিশ্বকবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর এক অনুষ্ঠানে এসে কবিতা আবৃতি করেছিলেন বলেও জানান স্থানীয় বয়জৈষ্ঠ্যরা।
ব্রিটিশ আমলে এই স্কুলকে পাঠশালা নামে ডাকা হতো বলে জানান স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা সিরাজুন নাজনীন শান্তা। স্কুল কমিটির সভাপতি এ বিষয়ে বলেন, নগরীর অনেক স্থানে এখনো অনেক ফাঁকা জায়গা কিংবা সরকারি খাস জমি আছে। সেখানে নতুন করে কোন কার্যালয় নির্মাণ করাটা খুব একটা জটিল বিষয় নয়। বর্তামন সরকার যেহেতু শিক্ষা বান্ধব সরকার তাই নগরীর ১ নং ওয়ার্ডের শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টরা চাইলে সেখানেও একটি নতুন বিদ্যালয় নির্মাণ করতে পারেন। কিন্তু সেটি না করে, সংশ্লিষ্টরা কেনো যে, প্রাচীন ও ঐতিহাসিক একটি স্কুলকে অন্যত্র স্থানান্তর করে সেখানে অন্যকোন সরকারি কার্যালয় করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন সেটা আমার বোধগম্য নয়। বৃহৎত্তর রাজশাহীর শিক্ষা ব্যবস্থায় ঐতিহ্যবাহী এই স্কুলটিকে রক্ষা করার জন্য রাসিক মেয়র ও সংশ্লিষ্টদের কাছে যথোপযুক্ত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসি ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা।
ইতিহাস ঘেটে জানা গেছে, রাজা রামমোহন রায় ১৮২৮ সালে কলকাতায় ব্রাহ্মসমাজ গঠন করেছিলেন। সেই ব্রাহ্মসমাজের আদলে ১৮৫৯ সালে রাজশাহীতে একটি ধর্মশালা গড়ে তোলা হয়। ঐ ধর্মশালার পার্শ্বে ১৮৫১ সালে নির্মিত একটি টিনশেডের ঘর ছিল। কালক্রমে মাদারবক্সের উদ্যোগে ও পৃষ্ঠপোষকতায় এবং জমিদার খালেক চৌধুরীর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় সেই টিনের ঘরটি হয়ে উঠে আজকের হোসেনীগঞ্জ বালক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বর্তমানে দ্বিতল বিশিষ্ট পাকা স্কুলটির জমির পরিমাণ ২১.১২ শতাংশ।