ধামইরহাট থেকে প্রতিনিধি : নওগাঁর ধামইরহাটে ধানের রাজ্যে আমের রাজত্ব শুরু হয়েছে। বরেন্দ্র অঞ্চল হিসেবে খ্যাত ধামইরহাট উপজেলায় মুলত কৃষি ফসল হিসেবে ধান চাষ হয়ে থাকে। তবে এ অবস্থার পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। বর্তমানে উপজেলার উচু অঞ্চলে ধানের পরিবর্তে কৃষক লাভজনক ফসল হিসেবে আম বাগান তৈরি করছে। আম ছাড়াও মাল্টা, ড্রাগন, পেয়ারা, পেঁপেসহ বিভিন্ন ধরণের ফল তৈরিতে ধুম পড়েছে।
জানা গেছে, ৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে ধামইরহাট উপজেলা গঠিত। অধিকাংশ জমিতে আমন ধান চাষ হয়ে থাকে। বর্তমানে গভীর নলকূপের মাধ্যমে পানি সেচের ব্যবস্থা থাকায় অনেক উচুঁ জমিতে বোরো ধান চাষ করা হচ্ছে। তবে বর্তমানে বাজারে ফলমূলের ব্যাপক চাহিদা থাকায় এলাকার কৃষকরা ফল বাগান তৈরিতে ঝুঁকে পড়ছে। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে,চলতি বোরো মওসুমে এ উপজেলায় ১৮ হাজার ৬শত ৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করা হয়েছে। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। ধানের পাশাপাশি উ”ুঁ জমিতে কৃষকরা ফল বাগান তৈরি করছে।
ফল বাগানের অধিকাংশ আবার আম বাগান। ধানের থেকে আমের বাজার মূল্য অনেক বেশি হওয়ার কৃষকরা আম বাগান তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন। তাছাড়া ধান রোপন ও মাড়াইয়ের সময় কৃষি শ্রমিকের সংকট থাকায় অনেক কৃষক আম বাগান তৈরি করছেন। ফল বাগানে তেমন কোন ঝামেলা থাকে না। কৃষি শ্রমিকের উপর তেমন নির্ভর করতে হয় না। সহজে পাইকাড়রা বাগান থেকে আম ক্রয় করে। উপজেলা বিভিন্নস্থানে কয়েক শতাধিক ছোট বড় আম বাগান গড়ে ওঠেছে। এসব বাগানে এলাকার ঐতিহ্যবাহী সুমিষ্ট ফল হিসেবে পরিচিত নাক ফজলী, ল্যাংড়া, ফজলী, বারি-৪, বারি-১১, গৌড়মতি , খিরসাপতি জাতের আম গাছ রয়েছে।
উপজেলার ধামইরহাট ইউনিয়নের অন্তর্গত বড় চকগোপাল গ্রামের মামুনুর আলম বাদশা গত ৩ বছর আগে ৪৯ শতাংশ জমিতে আম গাছ রোপন করেন। বর্তমানে তার বাগানে ৩শতাট আম্রপালি গাছ রয়েছে। বাগানের গাছগুলো মুকুলে ভরে গেছে। মুকুল অবস্থায় পাইকাড়রা তার বাগানের দাম হাকিয়েছেন ৩৫ হাজার টাকা। কয়েকদিন পরও ওই বাগান ৫০হাজার টাকায় তিনি বিক্রি করতে পারবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। একই গ্রামের সদ্য এলএলবি পাশ তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা কাইছার আলমগীর পনি প্রায় ১০ বছর আগে জয়জয়পুর মৌজার ৬৫ শতাংশ জমিতে আম বাগান গড়ে তোলেন। তার বাগানে নাক ফজলী,রুপালী ও ফজলী জাতের আম রয়েছে।
পাইকাড়রা মুকুল অবস্থায় তার বাগানের দাম হাকিয়েছেন ৬০ হাজার টাকা। আমের আকার গুটি হলে তিনি ওই বাগান প্রায় এক লক্ষ টাকায় বিক্রি করতে পারবেন বলেন জানান। প্রায় ৩৬ একর জমি নিয়ে ধামইরহাটের আগ্রাদ্বিগুন ইউনিয়নের মাহমুদপুরে গড়ে উঠে এনজেলিক কৃষি ফার্ম। উচ্চ মূল্যের বারি-৪,বারি-১১,মাল্টা, ড্রাগন, থাই পেয়ারা ও গৌড়মতি আমের বাগান করা হয়েছে এ ফার্মে। প্রায় ৫০ একর জমির উপর বিভিন্ন জাতের আমের দিয়ারা নামক ফার্ম রয়েছে পাশের আরেকটি গ্রামে। নতুন কৃষি উদ্যোক্তা যোবায়ের ও মোয়াজ্জেম কৃষি বিভাগের পরামর্শে আগ্রাদ্বিগুন ইউনিয়নে গড়ে তুলেছেন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ৪৩ একর মিশ্র ফলবাগান। এই বাগান থেকে পাওয়া যাচ্ছে সুমিষ্ট বারি মাল্টা-১ ও থাই পেয়ারা। উপজেলার আরেকটি কৃষি ফার্ম এর নাম মায়াকানন।
যেখানে অর্গানিক উপায়ে ড্রাগন ফল উৎপাদন করা হচ্ছে। উপজেলার আড়ানগর ইউনিয়নের ফতেপুর বাজারের পূর্ব মাঠে কৃষক মোফাখারুল ইসলাম যাদু ৭ একর জমিতে চায়না-৩ লিচু ফার্ম, জাহানপুর ইউনিয়নের বড়শিবপুর গ্রামের কৃষক কে.এম লায়েক আলীর কৃষি ফার্ম নতুন নতুন উচ্চ মূল্যের ফল বাগান সম্প্রসারিত হচ্ছে। উপজেলা কৃষি বিভাগের কারিগরি সহায়তায় উঁচু বরেন্দ্র অঞ্চল হিসেবে পরিরিচত আগ্রাদ্বিগুনে স্থাপিত হচ্ছে উচ্চ মূল্যের ফলবাগান।
এ ব্যাপাওে উপজেলা কৃষি কর্মকর্র্তা কৃষিবিদ মোছা.শাপলা খাতুন বলেন,ধানের পর ফলের গাছের চাষের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। উপজেলা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে এলাকার শিক্ষিত ও অর্ধ শিক্ষিত যুবকদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে উচ্চমূল্যের ফলবাগান সৃজনে উপসহকারী কৃষি অফিসারদের মাধ্যমে উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়েছিল। এতে বেকার শিক্ষিক যুবকদের মাঝে ব্যাপক সাড়া পড়ে। এই কর্মসূচীর আলোকে অনেক যুবক জমি লিজ নিয়ে উপজেলা কৃষি বিভাগের পরামর্শে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ফলবাগান গড়ে তুলেছেন। এতে তাদের কর্মসংস্থান হচ্ছে, পাশাপাশি গ্রামের কিছু শ্রমিকসহ এই ফার্মগুলোতে শ্রম দিয়ে পরিবার চালাচ্ছেন। এ এলাকার ঐতিহ্যবাহী সুমিষ্ট নাক ফজলী আম সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করতে পারলে দেশের বাহিরে পাঠানো সম্ভব। আগামীতে এ অঞ্চল আমের অঞ্চল হিসেবে পরিচিত পেতে পারে।