ইউসুফ চৌধুরী : সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ হয় উপজেলা ভিত্তিক। সার্কুলার হয় শুন্য পদের বিপরীতে। আর পদ শূন্য সাপেক্ষে জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত অনলাইনে আবেদনের মাধ্যমে ১০ ভাগ বহিরাগত শিক্ষক বদলী হয় উপজেলায়। এরপর অনলাইনে আবেদন প্রক্রিয়া বন্ধ যয়ে যায়। কিন্তু দেখা যায় ভিন্ন চিত্র অনলাইনে বদলীর সুযোগ না থাকলেও অফলাইনে সারা বছর বদলী হয়ে আসছেন বহিরাগত শিক্ষক। নিয়মবহির্ভূতভাবে অধিদপ্তর থেকে বদলীর আদেশ নিয়ে যোগদান করছেন রাজশাহীর পবা উপজেলার বিভিন্ন স্কুলে। ফলে শিক্ষকের পদ শুন্য হওয়ার আগেই বদলী হয়ে আসা বহিরাগত শিক্ষক দিয়ে শুন্য পদ পূরন যাচ্ছে অভিযোগ করছেন স্থানীয় শিক্ষকেরা। বহিরাগত এসব শিক্ষক বদলী বন্ধে শিক্ষকেরা গত ০২ মার্চ ২০২৫ ইং তারিখে উপজেলা শিক্ষা অফিসার ও জেলা শিক্ষা অফিসারের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর লিখিত আবেদন করেন। এছাড়াও বদলী বন্ধে হাইকোর্টে গত ২৮ মার্চ ২০২৫ ইং মামলাও করেছেন। যার মামলা নং ৫৭০৫/২০২৫। তারপরও বদলী বন্ধে নেই কোন প্রতিকার। উপরন্তু এবছর বাইরের উপজেলা থেকে ২২ জন বহিরাগত শিক্ষক বদলী হয়ে এসেছেন। বদলী হয়ে আসা শিক্ষকদের অধিকাংশই বহিরাগত। তাদের অনেকেরই নিজের বাড়ী, স্বামী বা স্ত্রীর বাড়ী অথবা বাবা-মায়ের বাড়ী এই উপজেলাতে নয় বরং তাঁরা প্রভাবশালীদের আত্মীয়স্বজন। তাদের কারো স্বামী বা কারো স্ত্রী পবা উপজেলা অথবা রাজশাহী সদরে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। তবে বর্তমানে অফলাইনে যারা বদলী আদেশ নিয়ে এসেছেন তাদের কারো স্বামী বা স্ত্রী এই উপজেলায় কর্মরতও নাই। তারপরও এভাবেই বহিরাগত শিক্ষক বদলী হয়ে এসে শূন্য পদ পূরণ হয়ে যাওয়ায় পবা উপজেলার শিক্ষিত ছেলে-মেয়েরা চাকুরীর সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলছেন স্থানীয় শিক্ষকসহ সচেতনমহল।
উপজেলা শিক্ষা অফিসের তথ্য মতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৮৩টি যা তিনটি ক্লাস্টারে বিভক্ত। এছাড়া কিন্টার গার্ডেন ও এনজিও স্কুল এবং ইফতাদায়ী মাদ্রাসার সংখ্যা রয়েছে ১২৫টি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিপরীতে অনুমোদিত শিক্ষক পদ সংখ্যা ৬১৯ জন। বর্তমানে কর্মরত শিক্ষক আছে ৫৮৪ জন, এর মধ্যে পুরুষ শিক্ষক ১৪৯ জন, মহিলা শিক্ষক ৪৩৫ জন। এর মধ্যে বহিরাগত শিক্ষক রয়েছে ২২৮ জন। শিক্ষক ঘাটতি রয়েছে ৩৫ জন। নীতিমালা অনুসারে উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পদ শূন্য সাপেক্ষে ১০ ভাগ বহিরাগত শিক্ষক বদলী হয়ে এসে চাকুরী করার সুযোগ রয়েছে। তবে যাদের নিজের কিংবা স্বামী বা স্ত্রীর বাড়ী অথবা বাবা-মায়ের বাড়ী এই উপজেলায় তারাই শুধু জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত অনলাইনে বদলীর আবেদনের মাধ্যমে বদলী হয়ে আসার সুযোগ পাবেন। সে হিসেবে অনলাইনে বদলীর আবেদন প্রক্রিয়া এখন বন্ধ। অথচ অফলাইনে নিয়মবহির্ভূতভাবে বহিরাগত শিক্ষক বদলী হয়ে আসছেন অহরহ। নীতিমালা অনুসারে ১০ ভাগ যেখানে ৬২ জন বহিরাগত শিক্ষক থাকার কথা কিন্তু সেখানে রয়েছে ২২৮ জন যা অনুমোদিত শিক্ষক পদের ৪০ ভাগ এরও বেশী।
রাজশাহী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পূর্ববর্তী নিয়মানুযায়ী এখনো প্রতিবছরের জানুয়ারী থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত অনলাইনের মাধ্যমে বদলীর আবেদনের নিয়ম আছে। তবে, ডিজি স্যারের নিজস্ব দাপ্তরিক ক্ষমতাবলে বছরের যে কোন সময়ে যে কেউ অন্যত্র বদলীর জন্য আবেদন করতে পারবেন। সেটা অফলাইন কিংবা অনলাইন যে পন্থাতেই হোক আবেদন সাপেক্ষে ডিজি মহোদয় প্রয়োজন মনে করলে সেই আবেদন ফলপ্রশূ করতে পারেন। ডিজি মহোদয় কিংবা শিক্ষা সচিব ব্যতীত অনলাইনে আবেদনের সময় অতিক্রান্ত হলে সেটি আর কারো পক্ষেই সম্ভব না।
হড়গ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, প্রতিটি উপজেলায় ১০ ভাগ বহিরাগত শিক্ষক থাকার কথা। কিন্তু এখানে ৪৫ ভাগ এর উপরে বহিরাগত শিক্ষক আছে। যখনি পদ শুন্য হচ্ছে তখনি উপজেলা শিক্ষা অফিসারের যোগসাজশে তাঁরা বহিরাগত শিক্ষক নিয়ে আসার চাহিদা পাঠিয়ে দিচ্ছেন। জুলাই মাসেই ১১ জন বহিরাগত শিক্ষক যোগদান করেছেন। আবার যে সকল বহিরাগত শিক্ষক বদলী হয়ে আসছেন তাদের অধিকাংশই নারী শিক্ষক। তাদের ভাল ভাল জায়গায় পোস্টিং দিচ্ছেন আর পবার স্থানীয় শিক্ষকদের চরে ডেপুটেশনে পাঠাচ্ছেন। উপজেলায় বহিরাগত শিক্ষক বদলী হয়ে আসার কারণে স্থানীয় পদ পূরণ হয়ে যাচ্ছে। এতে করে ছেলে-মেয়েদের চাকুরী হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাচ্ছে ফলে স্থানীয় শিক্ষিতদের মধ্যে হতাশা কাজ করছে। এর ফলে স্থানীয় শিক্ষিতরা এলাকার উন্নয়নে অবদান রাখার সুযোগ এবং সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকুরীর সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। কাজেই পবা উপজেলায় অফলাইন সহ বহিরাগত শিক্ষক বদলী বন্ধে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবী জানান তিনি
উপজেলা শিক্ষা অফিসার জোবায়দা রওশন জাহান বলেন, অধিদপ্তর থেকে বদলীর আদেশে বহিরাগত শিক্ষক যদি এই উপজেলার স্কুলে আসে তাহলে তাকে যোগদান নিতেই হবে। জুলাই মাসেই অধিদপ্তর হতে বদলীর আদেশ নিয়ে যোগদান করেছেন ১১ জন শিক্ষক। স্থানীয় শিক্ষকদের বারবার চরের স্কুলে ডেপুটেশনে দেওয়া হয় এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কাউকে বারে বারে ডেপুটেশনে দেওয়া হয় না, উপজেলা শিক্ষা কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক ১৫ কার্যদিবস সকল শিক্ষককে পর্যায়ক্রমে চরের স্কুলে দায়িত্ব পালন করছে। বহিরাগত শিক্ষক চাহিদাপত্র দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন সবকিছু অনলাইন, কয়টা স্কুল আছে, শিক্ষকের তথ্য, অফিসের তথ্য, কোথায় শিক্ষক পদ শূন্য আছে, কয়টা বিল্ডিং আছে অধিদপ্তর থেকে অনলাইনের মাধ্যমেই জানতে পারেন। পবা উপজেলা প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও রাজশাহী জেলা সহকারি শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোঃ হারুন অর রশিদ বলেন, উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অফলাইনে নিয়মবহির্ভূতভাবে বহিরাগত শিক্ষক বদলী হয়ে এসে ভরে গেছে। পদ শুন্য না থাকায় সামনে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগের সার্কুলারে এই উপজেলার নাম থাকবে না। সার্কুলারে নাম না থাকায় উপজেলার ছেলে-মেয়েরা আবেদনও করতে পারবে না। নিয়মবহির্ভূত বদলীর কারনে চাকুরীর সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন পবা উপজেলার স্থানীয় শিক্ষিত ছেলে মেয়েরা। এসব বদলী আদেশ বন্ধে উপজেলা শিক্ষা অফিসার ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর লিখিত আবেদন এবং মহামান্য হাইকোর্টে মামলাও করা হয়েছে। অবৈধ্যভাবে যে সকল শিক্ষক বদলী হয়ে এসেছেন তাদের কারো ঠিকানা এই পবা উপজেলাতে নাই। সে কারণে এই সমস্ত বদলী স্থগিত সহ কর্তৃপক্ষের কাছে দাবী নতুনভাবে অফলাইনে বদলী বন্ধ করা হোক। ২০১০ সালে পদ না থাকায় আমিও প্রধান শিক্ষক পদে এই উপজেলায় আবেদন করতে পারিনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন ভুক্তভোগী শিক্ষক জানান, বহিরাগত শিক্ষক বদলী হয়ে আসছে অথচ স্থানীয়রা যথাযথ কর্তৃপক্ষের বরাবর আবেদন করার পরও উপজেলার এক স্কুল থেকে অন্য স্কুলে বদলী হয়ে যেতে পারছে না। অনলাইনে প্রতিস্থাপন সাপেক্ষে বদলী অর্ডার থাকার পরও গোপনে অফলাইনে বাইরে থেকে বদলী হযে চলে আসছে। ফলে অনলাইনে বদলী শুধুমাত্র লোক দেখানোর মতো হচ্ছে। তাছাড়া একটা স্কুলে একটা পোস্ট ফাঁকা থাকলেও অর্ডার হচ্ছে ৩টা-৪টা করে। যা প্রাথমিক শিক্ষায় ‘হ-য-ব-র-ল’ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহলের বিভিন্ন প্রতিনিধিরা বলছেন, স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় গুলো থেকে প্রতিবছর যে হারে শিক্ষার্থীরা বের হয়ে আসছে, সে হারে কর্মসংস্থান হচ্ছে না। তার উপর আবার চাকুরীর আবেদন করার সুযোগ যদি না পায়। তাহলে স্থানীয় শিক্ষিত ছেলে মেয়েরা বেকার হয়ে যাবে। এটা অনতিবিলম্বে বন্ধ করতে হবে তা না হলে সকলকে সাথে নিয়ে কঠোর আন্দোলনে যাবো বলেও জানান তাঁরা।