মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তার জেরে হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি অবরোধের মধ্যেই, তেহরান এই কৌশলগত জলপথ দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর জন্য নতুন নিয়ম চালু করেছে। পাশাপাশি চলাচলকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে টোল বা মাশুল আদায়ের প্রক্রিয়াও শুরু করেছে। একটি শিপিং জার্নালের বরাতে এই তথ্য জানা গেছে। খবর এনডিটিভির। তেহরানের পক্ষ থেকে এই জলপথের ওপর আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ এমন এক সময়ে নেওয়া হলো যখন ওয়াশিংটন বিশ্বের মোট তেলের এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহকারী এই সংকীর্ণ পথটি পুনরায় খুলে দেওয়ার জন্য একটি চুক্তির চেষ্টা চালাচ্ছে। ইরানের পদক্ষেপের নেপথ্যে শিপিংসহ সামুদ্রিক বাণিজ্যের খবর ও গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহকারী শিল্প জার্নাল লয়েড’স লিস্ট জানিয়েছে, পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি (পিজিএসএ) ইতিমধ্যেই একটি নতুন কাঠামো প্রবর্তন করেছে, যেখানে জাহাজগুলোকে যাত্রা করার আগে ট্রানজিট অনুমতি নেওয়া এবং টোল প্রদান করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পিজিএসএ কর্তৃপক্ষের পাঠানো ‘ভেসেল ইনফরমেশন ডিক্লারেশন’ নামক একটি ফরমের কথা উল্লেখ করে জার্নালটি আরও জানায়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ যাতায়াতে আগ্রহী সব জাহাজকে মালিকানা, বিমা, নাবিকদের বিবরণ এবং সম্ভাব্য ট্রানজিট রুটের বিস্তারিত রেকর্ড জমা দিতে হবে। খবর অনুযায়ী, এই ফরমে ৪০টিরও বেশি প্রশ্ন রয়েছে যেখানে জাহাজগুলোকে তাদের নাম, শনাক্তকরণ নম্বর, কোনো পূর্ববর্তী নাম থাকলে তা, সাম্প্রতিক ছেড়ে আসা দেশ ও সামনের গন্তব্য, নিবন্ধিত মালিক, অপারেটর ও নাবিকদের জাতীয়তা এবং জাহাজে থাকা পণ্যসম্ভারের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করতে হবে। মঙ্গলবার ইরানের ইংরেজি ভাষার সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভিও জানিয়েছে, তেহরান হরমুজ প্রণালির ওপর সার্বভৌমত্ব চর্চার জন্য একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছে এবং প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোতে ইমেইল থেকে ‘নিয়মাবলী’ পাঠানো হচ্ছে। পিজিএসএ-র মতে, ফরমটি ‘সম্পূর্ণ এবং নির্ভুল তথ্য’ দিয়ে পূরণ করে ট্রানজিটের আগেই ইমেইল করতে হবে। তারা জানিয়েছে যে, ট্রানজিট অনুরোধ যাচাইয়ের পর জাহাজগুলোকে ইমেইলের মাধ্যমে পরবর্তী নির্দেশনা প্রদান করা হবে। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, কোনো ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্যের জন্য আবেদনকারী একাই দায়ী থাকবেন এবং এর ফলে উদ্ভূত যেকোনো পরিণতির দায়ভার তাকেই বহন করতে হবে। কারা যাতায়াতের অনুমতি পাবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান কোনো নির্দিষ্ট দেশকে হরমুজ দিয়ে যাতায়াতের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি। তবে ইরানের সেনাবাহিনী সতর্ক করেছে যে, তেহরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা দেশগুলো এই প্রণালি পার হওয়ার সময় সমস্যার সম্মুখীন হবে। গত রোববার ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা-কে সেনাসদস্য মোহাম্মদ আকরামিনিয়া বলেন, ‘যেসব দেশ ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথা মেনে চলে, তারা অবশ্যই এই প্রণালি পার হওয়ার সময় অসুবিধায় পড়বে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা হরমুজ প্রণালিতে একটি নতুন আইনি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছি। এখন থেকে যেকোনো জাহাজ এটি পার হতে চাইলে আমাদের সাথে সমন্বয় করতে হবে।’ গত শনিবার ইরানের সংসদীয় জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি এক্সে একই ধরনের সতর্কতা জারি করে লেখেন, ‘আমরা বাহরাইনের মতো ক্ষুদ্র রাষ্ট্রসহ সব সরকারকে সতর্ক করছি যে, মার্কিন সমর্থিত প্রস্তাবের পক্ষ নেওয়া গুরুতর পরিণতি ডেকে আনবে। হরমুজ প্রণালি একটি অত্যাবশ্যকীয় জীবনরেখা; এটি চিরতরে নিজেদের জন্য বন্ধ করে দেওয়ার ঝুঁকি নেবেন না।’ ইরান এর আগে সতর্ক করেছিল যে তারা যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সাথে যুক্ত জাহাজগুলোকে হরমুজ দিয়ে যাতায়াত করতে দেবে না, আর অন্যরা কেবল ইরানের সম্মতিতে যাতায়াত করতে পারবে। ভারত ও পাকিস্তানসহ বেশ কিছু দেশ তাদের পতাকাবাহী জাহাজগুলোর নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে তেহরানের সাথে আলোচনা করেছে।
ইরানের নিয়ন্ত্রণ : ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই তেহরান এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি কার্যত অবরুদ্ধ করে রেখেছে এবং খুব সামান্য সংখ্যক জাহাজকে চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে। এর ফলে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে এবং জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। ইরান বারবার ইঙ্গিত দিয়েছে যে, তারা এই প্রণালিতে একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে চায়, যেখানে যাতায়াতকারী জাহাজ থেকে টোল আদায় করা হবে এবং সেই আয়ের অংশ ওমানের সাথে ভাগ করে নেওয়া হবে। গত মাসে ইরানের পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার হামিদেজা হাজিবাবাই জানান, তেহরান প্রণালিতে আরোপিত টোল থেকে তাদের প্রথম আয় সংগ্রহ করেছে।
গত সপ্তাহে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্টে পারস্য উপসাগর নিয়ে তাঁর দূরদর্শিতার একটি বার্তা পোস্ট করা হয়। বার্তায় মোজতবা খামেনি শক্তিশালী ইরানের কৌশলের অধীনে একটি নতুন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ব্যবস্থা গড়ার আহ্বান জানান, যেখানে বিদেশি এবং তাদের অনিষ্টের কোনো স্থান থাকবে না। এই লক্ষ্য অর্জনের একটি উপায় হিসেবে তিনি প্রণালী বন্ধ করার ‘সুবিধা ব্যবহারের’ কথা উল্লেখ করেন।-এফএনএস