পবা প্রতিনিধি : আলু একটি শীতকালীন ফসল। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের আলুক্ষেতের গাছের পাতা দিনদিন বেড়ে উঠে মাঠজুড়ে সবুজ রঙ ধারণ করছে। মাঠজুড়ে সবুজের সমারোহে কৃষকদের পদভারে মুখরিত হয়ে উঠেছে ফসলের মাঠগুলো। উপজেলা জুড়ে ডায়মন্ড, কার্ডিনাল, এ্যালুয়েট, ষাটে এই চার থেকে পাঁচ জাতের আলু চাষ হয়েছে। বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে রোপণকৃত আলুক্ষেতের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষক ও শ্রমিকরা। এর মধ্যে কেউ জমিতে থাকা আগাছা পরিষ্কার, সার প্রয়োগ, সেচ, ছত্রাক ও রোগ-বালাইয়ের হাত থেকে ফসল বাঁচাতে বালাইনাশক স্প্রে করছেন। এভাবে প্রতিদিন ভালো ফলনের আশায় উপজেলার মাঠে মাঠে চলছে আলু ক্ষেতের পরিচর্যার কাজ। বাজারে আলুর চড়া দামের কারণে এবার আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা বেড়েছে। তবে আলু আবাদে খরচ বেশি হওয়ার কারণে উৎপাদিত আলুর সঠিক বাজার মূল্য না পেলে লোকশানের মুখে পড়বে তাঁরা। তারপরেও আবহাওয়া ও বাজারদর ভালো থাকলে লাভের আশা করছেন কৃষকরা।
উপজেলার আলু চাষিরা জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং রোগ বালাইয়ের তেমন কোনো প্রাদুর্ভাব না হলে আলু চাষে লাভবান হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তাঁরা। স্বল্প মেয়াদী ৫৫ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে এ আলু উত্তোলন করা যায়। আগাম জাতের আলুর আবাদ করেছেন। গাছ ভালো হওয়ার ফলে আলুর ফলন বেশি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তবে আলুচাষের জন্য জমি টেন্ডার, শ্রমিক মুজুুরী, সেচ, সার ও বালাইনাশকের খরচ বেশি হওয়ার কারণে উৎপাদিত আলুর বাজার নিয়েও চিন্তিত তাঁরা। কোনো ধরনের দুর্যোগ ও রোগবালাই যদি না থাকে তাহলে আশানুরূপ ফলনও পাবেন আশা করছেন কৃষকরা।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, আলু গাছের সারিতে মাটি তুলে দেওয়া ও সরিয়ে দেওয়া, জমিতে সেচ (পানি) দেওয়া, আগাছা পরিষ্কার এবং বালাইনাশক প্রয়োগ সব মিলিয়ে আলু গাছের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। এ অঞ্চলের অর্থকারি অন্যতম ফসলের মধ্যে একটি আলুর আবাদ। আলুর উৎপাদন ও মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে মাঠ পর্যায়ে গিয়ে আলু চাষীদের সাথে আলোচনাসহ অন্যান্য ফসলের নানান ধরনের রোগবালাই দমনে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন উপসহকারি কৃষি কর্মকর্তারা। তথ্য প্রযুক্তির সহায়তা ও কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ ও প্রশাসনের তদারকিতে আলু আবাদ নিয়ে প্রান্তিক কৃষকরাও দেখছেন রঙ্গীণ স্বপ্ন। সে স্বপ্ন বাস্তবায়নে মাঠে অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন কৃষাণ-কৃষাণীরা। মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের সার্বিক সহযোগিতা ও পরামর্শে কৃষকরাও খুশি বলে জানান তাঁরা।
উল্লেখ্য মৌসুমের শুরুতে উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কৃষকদের মাঝে আলুর বীজ ও সার সরবরাহ স্বাভাবিকসহ সিন্ডিকেট ভাঙতে আলু বীজ ব্যবসায়ী, হিমাগার কর্তৃপক্ষ, সার ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সাথে মিটিং ও তৃণমূলের প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে বীজ ও সার সুষম বন্টন এবং নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে দেখা গেছে। সরাসরি মনিটরিং ও তদারকি করতে পবা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. সোহরাব হোসেন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জাহিদ হাসান, উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ ফারজানা তাসনিম, অতিরিক্ত কৃষি অফিসার তন্ময় কৃমার সরকার সহ উপজেলার সকল উপসহকারি কৃষি কর্মকর্তাগন কাজ করেছেন।
বড়গাছী ইউনিয়নের মতিয়াবিল এলাকার কৃষক শুকুর শেখ জানান। টেন্ডার নিয়ে ১২ বিঘা জমিতে ডায়মন্ড (সাদা) জাতের আলুর চাষ করেছি। এখন পর্যন্ত আলুর গাছ খুব ভালো। আশা করি ফলনও ভালো হবে। আলু গাছের সারিতে মাটি তুলে দেওয়া ও সরিয়ে দেওয়া এবং ক্ষেতের আগাছা পরিষ্কার করছেন। আলুতে এখন পর্যন্ত কোন রোগবালাই নেই। শেষ পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আলুর বাম্পার ফলনের আশা করছেন তিনি। সবকিছুর দাম বাড়তি হয়েছে। প্রতি বিঘা জমির টেন্ডার বাবদ ৩০ হাজার টাকা। প্রতি বিঘা জমিতে আলু রোপন করতে চাষ, বীজ, সার, বালাইনাশক, সেচ ও শ্রমিক মুজুরী সহ ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা খরচ হবে। পাশের বারনই নদীর শাখা নদী (খাল) পরিষ্কার করা হয়েছে সেখানে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। সেই শাখা নদীতে জমে থাকা পানি থেকে আশেপাশের কৃষকরা আলু, বেগুন, টমেটো, পেঁয়াজ, গম সহ বিভিন্ন আবাদে সেচ দিয়ে চাষাবাদ করছেন। এটা খনন করলে সারা বছর পানি পাওয়া যাবে এবং কৃষকরা উপকৃত হবে বলেও জানান তিনি।
একই ইউনিয়নের পানিশাইল এলাকার কৃষক শরিফুল ইসলাম জানান, ১২ বিঘা জমি টেন্ডার নিয়ে কার্ডিনাল ও ডায়মন্ড (সাদা) জাতের আলুচাষ করেছেন। এক বিঘা জমির টেন্ডার ২০ হাজার টাকা তবে অনেক জায়গাতে জমির টেন্ডার বেশি আছে। প্রতি বিঘা জমি চাষ করতে খরচ চার হাজার টাকা, আলু লাগানো খরচ তিন হাজার চার’শ টাকা আবার কোথাও বেশিও লাগে। এক বিঘা জমিতে আলু রোপন থেকে উঠানো পর্যন্ত প্রায় ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা খরচ হবে। গতবার ৬০ থেকে ৬৫ হাজার খরচ হয়েছিল। এবার সব কিছুর দাম বেশি হওয়ায় আলুর চাষের খরচ বেশি হচ্ছে। এক বিঘা আলু আবাদে দুই বস্ত পটাশ, এক বস্তা টিএসপি (ট্রিপল সুপার ফসফেট) ও এক বস্তা ডিএপি দানাদার সারের প্রয়োজন। এতে আলুর ভালো ফলনের আশা থাকে। ভালো ফলনের আশায় আলুর গাছ পরিচর্যার কাজ করছেন।
উপজেলার ডাঙ্গীপাড়া এলাকায় আলুর জমিতে পরিচর্যার কাজ করতে দেখা গেছে দর্শনপাড়া ইউনিয়নের মড়মড়িয়া এলাকার দিনমুজুর শ্রমিক লুৎফর রহমান, হান্নান আলী, শাহজাহান আলী, সাইফুল ইসলাম, লুৎফুল বারী, জিন্নাহতুল্লাহ, উমির আলী, জাক্কার হোসেন, সিহাব আলী, শামীম হোসেন এর সাথে। সকাল থেকে দুপুর অবদি তাঁরা প্রতি বিঘায় চুক্তিভিত্তিক ও দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে আলুর জমিতে আগাছা পরিষ্কার ও গাছের সারিতে মাটি তুলে দেওয়ার কাজ করছেন। তাঁরা সকাল ৭টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত কাজ করবেন। প্রতি বিঘা জমিতে দুই হাজার পাঁচ’শ টাকা থেকে তিন হাজার টাকা মজুরী তাদের। তাঁরা জানান এবার মাঠে আলুর আবাদ ভাল হয়েছে। প্রতিদিন বিভিন্ন মাঠে আলু গাছের পরিচর্যায় কৃষকদের সাথে ব্যস্ত সময় পার করছেন বলে জানান তাঁরা।
বড়গাছী ইউনিয়নের মতিয়াবিলে আলুর গাছ পরিচর্যায় কাজ করছিলেন, পানিশাইল এলাকার শ্রমিক সিরাজুল ইসলাম, নজরুল ইসলাম, আনারুল ইসলাম, নুর ইসলাম তাঁরা জানান, দিন চুক্তিতে আলু গাছের সারিতে মাটি তুলে দেওয়া ও ক্ষেতের আগাছা পরিষ্কারের কাজ করছেন। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কাজের মুজুরী ৬০০ টাকা। এবার বিলে আলুর গাছ ভাল আছে। কৃষকই দেশের সব থেকে বড় সম্পদ। কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশ তাই কৃষকদের মুখে হাসি ফুটাতে তাদের সাথে জমিতে অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন। সবকিছুতেই এখন ভেজাল। সার ও বালাইনাশক প্রয়োগে আগের মতো কাজ হচ্ছে না। এসব মানহীন ভেজাল বালাইনাশক প্রয়োগে অনেক সময় কৃষকের আবাদের ক্ষতি হয়। ভেজাল রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তদারকি করার আহ্বান জানান তাঁরা।
উপজেলা কৃষি অফিস সুত্রে জানা যায়, উপজেলায় বিসিআইসি অনুমোদিত সার ডিলার সংখ্যা ১০ জন এবং বিএডিসি অনুমোদিত ডিলারের সংখ্যা ১২ জন। এ বছর উপজেলায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। চলতি মৌসুমে উপজেলায় ৩ হাজার ৬৩৫ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষমাত্রা ধরা হলেও আলুর আবাদ হয়েছে ৪ হাজার ৪১০ হেক্টর জমিতে। কৃষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে প্রতি হেক্টর জমিতে ২৭ মেট্রিক টন করে উপজেলায় আলু উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৯ হাজার ৭০ মেট্রিক টন। উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ ফারজানা তাসনিম বলেন, আলু অত্র অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থকারি ফসল। এ অঞ্চলের মাটি আলু চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় প্রান্তিক চাষিরা আলুর চাষাবাদ করছেন। কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে মাঠপর্যায়ে আলু চাষিদের যথাযথ পরামর্শ, পরিচর্যার বিষয়ে প্রত্যক্ষ কারিগরি সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনা অব্যাহত আছে। আলুচাষ ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বালাইনাশক প্রয়োগ ও সুষম সার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তাঁরা কৃষকদের সার্বক্ষণিক পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। চলতি মৌসুমে আবহাওয়া ভালো থাকায় এখন পর্যন্ত আলুক্ষেতে রোগ-বালাইয়ের প্রকোপ অনেকটা কম। প্রাকৃতিক দুর্যোগে কোনো ক্ষতি না হলে, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে উপজেলায় আলুর বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। আলু উৎপাদনের হার বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করছেন। বাজারে ভালো দাম পেলে কৃষকরা লাভবান হতে পারবে। আলুর উৎপাদন বৃদ্ধি হলে স্থানীয় চাষীদের ভাগ্য পরিবর্তনে সহায়ক হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।