আরা ডেস্ক : বিএনপিতে নতুন করে আন্দোলন শুরু করার লগ্নে দেখা যাচ্ছে ভাঙ্গনের সুর। বিভিন্ন কারণে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে তারেক জিয়ার স্বেচ্ছাচারিতা, দল পরিচালনায় তার একক কর্তৃত্ব এবং সিনিয়র নেতাদের সাথে অসম্মানসূচক আচরণের অভিযোগে দলের একাধিক সিনিয়র নেতার এখন নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। আর এটি বিএনপিকে শেষ পর্যন্ত ভাঙনের দিকে নিয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিএনপি’র শীর্ষস্থানীয় কিছু নেতা বলেছেন যে, নির্বাচনের আগে সরকার বিএনপিকে ভাঙার চেষ্টা করছে। আর এ কারণেই বিএনপি’র একটি বিভ্রান্ত অংশ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সমালোচনা করছে। দল ঠিকঠাকই আছে। তবে সিনিয়র নেতারা যাই বলুক না কেন, বিএনপিতে এখন কান পাতলেই ভাঙ্গনের শব্দ শোনা যায়। বিএনপি’র বিভিন্ন নেতাদের মধ্যে হতাশা ক্রমশ দানা বেঁধে উঠেছে। বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেছেন যে, এখন আন্দোলনের একটা বড় সুযোগ ছিল কিন্তু আমাদের বিভক্তির কারণে আমরা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি। মূলত তিনটি বিষয় নিয়ে বিএনপিতে সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
প্রথমত, তারেক জিয়ার কর্তৃত্ব। তারেক জিয়া একাই দল পরিচালনা করছেন। এখানে তিনি কারও কোনো মতামতকে তোয়াক্কা করছেন না। কারো কোন বক্তব্য শুনছেন না। তিনি লন্ডন থেকে একটি করে বাণী হাজির করছেন এবং সেটি সবাইকে পালনে বাধ্য করছেন। দলের একাধিক সিনিয়র নেতা বলেছেন যে, এভাবে দল পরিচালিত হতে পারেনা। দলের স্থায়ী কমিটির কোনো কার্যক্রম নেই বললেই চলে। স্থায়ী কমিটির বৈঠকে শুধুমাত্র বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বক্তব্যই প্রচার করা হয় এবং তার সিদ্ধান্তগুলো জানিয়ে দেয়া হয়। স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেছেন যে, এইভাবেই বিএনপিতে যদি সব সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয় তাহলে স্থায়ী কমিটির দরকারটা কি। বিএনপি’র নেতারা মনে করছেন পরিচালনায় সকলের ভূমিকা থাকা উচিত। এটি নিয়ে দলের মধ্যে এক ধরনের বিভক্তি সৃষ্টি করেছে। এই বিভক্তির হিসেবে ঈদের আগে সর্বশেষ স্থায়ী কমিটির বৈঠক শুক্রবার ছুটি হওয়ার কথা ছিল কিন্তু সেটি অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। কারণ স্থায়ী কমিটি অধিকাংশই নেতারা তারেকের সঙ্গে এ ধরনের বিষয় নিয়ে কথাবার্তা বলতে আগ্রহী নয় বলেই তারা আর বৈঠকে যোগদান করেননি। এখন বিএনপিতে তারেকের ব্যাপারে একটি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হচ্ছে।
দ্বিতীয়, কারণ হলো নির্বাচনে যাওয়া না যাওয়া। নির্বাচনে যাওয়া না যাওয়া নিয়ে বিএনপিতে এখন এক ধরনের অস্বস্তি এবং প্রকাশ্য বিভক্তি তৈরি হচ্ছে। বিএনপি নেতাদের কেউ কেউ মনে করছেন যে, নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া তারা নির্বাচনে যাবে না, এই অবস্থা থেকে নেতাদের সরে আসা উচিত। বরং নির্বাচন যেন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয় সেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া উচিত। নির্বাচনী কর্মকাণ্ডের মধ্যে তাদেরকে সম্পৃক্ত থাকা উচিত। বিশেষ করে বিএনপি’র পক্ষ থেকে বিভিন্ন কূটনীতিক অঙ্গনে যে যোগাযোগ করা হয়েছিল সেই যোগাযোগগুলোতেও বিএনপিকে বলা হয়েছিল যে, নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয়, বিএনপি যেন অবাধ-সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে কথা বেশি বলে। যেমনটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলো বলছে। কিন্তু সেই পথে না গিয়ে শুধুমাত্র তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি নিয়েই কথা বলছে। কূটনৈতিক মহল এবং অন্যান্যরা বলছেন যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়াও অবাধ-সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পারে এবং সেই নির্বাচন যদি আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয় তাহলে সেটি বিএনপি’র জন্য ইতিবাচক হবে। কিন্তু তারেক জিয়ার কারণে বা বিএনপির কিছু নেতা নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে যাবার পক্ষপাতী নয়।
তৃতীয়ত, বিএনপির মধ্যে আন্দোলনের কৌশল নিয়েও বিরোধ দেখা দিয়েছে। বিএনপির অনেক নেতা মনে করছেন যে ছোট ছোট ইস্যুগুলো যেমন, বিদ্যুতের সংকট, গণপরিবহনে ভোগান্তি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ইত্যাদি নিয়ে ধাপে ধাপে আন্দোলন করা উচিত। এই আন্দোলনগুলোর সঙ্গে জাতীয় রাজনীতির ইস্যুর আন্দোলনে যুক্ত করা দরকার। কিন্তু বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা এবং তারেক জিয়া মনে করছেন যে, আন্দোলন করতে হবে শুধুমাত্র নির্বাচন কেন্দ্রিক। অন্যান্য বিষয় নিয়ে বক্তৃতা বিবৃতি দিলে হবে না। আর এটির কারণে বিএনপি’র মধ্যে আরেক ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। এখন এই সংকটগুলো কাটিয়ে উঠে বিএনপি কি এগুতে পারবে? নাকি এই সঙ্কটের ধাক্কায় বিভক্ত হবে বিএনপির সেটাই দেখার বিষয়। তবে ঈদের আগেই বিএনপিতে ভাঙ্গনের সুর সুস্পষ্ট হয়ে গেছে।