শাহানুর রহমান রানা : রাজশাহী নগরীর কল্পনা মোড় থেকে প্রায় ২৪৫০ মিটার গ্যাস পাইপলাইন নেটওয়ার্ক স্থাপন কাজ শুরু হয়েছে গেল মাসের মধ্যভাগে। কাজে ধীরগতি আর মানহীন নিয়ে প্রশ্ন উঠার পাশাপাশি জনভোগান্তি এখন চরমে। সিডিউল অনুযায়ী কাজও হচ্ছে না বলেও জানান সংশ্লিষ্ট কাজে জড়িতদের অনেকেই। সাড়ে তিনফিট গর্ত করে ছয় ইঞ্চির ইস্পাতের পাইপ ও সেই পাইপের নিচে নিয়মানুযায়ী ছয় ইঞ্চি বালি দেবার কথা থাকলেও সেই নিয়মের তোয়াক্কা করছে না সিরাজগঞ্জ থেকে আগত ঠিকাদার মনসুর আলী মন্ডল। অন্যদিকে, পাইপলাইন স্থাপনের জন্য মাটি খোড়াখুড়ির বিষয়টিতেও দক্ষতা আর কর্মপরিকল্পনার অভাবে চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন ২২, ২৩ ও ২৪ নং ওয়ার্ড সহ আশে পাশের স্থানীয় ব্যক্তি, ব্যবসায়ি ও চলাচলকারিরা বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় ও ভুক্তভোগীদের দেয়া তথ্যমতে, রামচন্দ্রপুর কেদুরমোড় এলাকায় পাইপস্থাপনে ঠিকাদারের অদক্ষতার কারনে চরমে উঠেছে জনভোগান্তি। অপরিকল্পিতভাবে রাস্তা খুড়াখুড়ির কারনে বাইলেন রাস্তাগুলোতে চলাচলকারিরা পড়েছেন চরম বিপাকে। ২৪৫০ মিটার চলমান কাজের স্থানটিতে সর্বমোট ২২ থেকে ২৩টি বাইলেন বা সংযোগ সড়ক রয়েছে বলে জানান ঠিকাদার মনসুর আলী। এদিকে, ব্যক্তিমালিকানাধীন জায়গা দখল করে বসানো পাইপগুলোকে কেন্দ্র করেও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সাথে ক্ষতিগ্রস্ত ও ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের বাকবিতণ্ডা আর উত্তেজনা সৃষ্টির মতোও ঘটনা ঘটেছে একাধিকবার। ২৪ নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগ কার্যালয়ের বিপরীত পাশে তাজুল ফার্মেসীর সামনে স্থাপন করা পাইপটি তেমন কোন কারন ব্যতিরেকেই অন্যের জমি কয়েক ফিট দখলপূর্বক ইউটার্ন পদ্ধতিতে স্থাপন করা হয়েছিল। স্থানীয়দের একাধিকবার আপত্তির প্রেক্ষিতে অবশেষে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান বাধ্য হন পাইপগুলো প্রতিস্থাপন করতে। এবিষয়ে, নিউ ডিগ্রী সরকারি কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহোযোগি অধ্যাপক ফামিদ হাসিব বলেন, স্থানটি আমার এক চাচার। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান পাইপলাইনগুলো নিয়মবহির্ভুত ভাবে সোজাভাবে স্থাপন না করে অন্যের ব্যক্তিগত জমি দখল করে স্থাপন করেছিল। বিষয়টি তাদের কাজের অদক্ষতার ইঙ্গিত বহন করে বলে মন্তব্য স্থানীয়দের।
সেখানে কর্মরত ওয়েল্ডার লিডার নজরুল কথা প্রসঙ্গে জানান, গ্যাস সরবরাহে স্থাপনকৃত ছয় ইঞ্চি ব্যাসের ইস্পাতের পাইপ, র্যাপিংটেপসহ কিছু প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। আমরা সেগুলোকে ওয়েল্ডিং করে মাটির নিচে স্থাপন করছি মাত্র। নতুন এর পরিবর্তে সেখানে বসানো হচ্ছে জং ধরা পাইপ। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো বলেন, চলমান কাজটি শুরু হবার পূর্বে পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের একটি কার্যালয়ে পাইপ লাইনের নিচে ছয় ইঞ্চি বালি দেবার কথা একাধিক মিটিংয়ে উপস্থাপিত হলেও অবশেষে নাকি সেটি সিডিউলে উল্লেখ্য করা হয়নি! এদিকে সূত্র বলছে, ২৪৫০ মিটার গ্যাস পাইপলাইনের সুরক্ষা নিশ্চিত করা ও অনাকাঙ্খিত ভয়াবহ দূর্ঘটনা এড়ানোর লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পরিমাণ বালি পাইপের নিচে দেওয়ার নিয়ম আছে। ছয় থেকে চৌদ্দ ইঞ্চি ব্যাসের বিভিন্ন চাঁপের গ্যাস পাইপলাইনের নিচে বালি দেয়ার অর্থ হলো সেটি যেনো কোন প্রকার নিয়মিত চাঁপে ভেঙ্গে না যায় কিংবা দুটি পাইপের সংযুক্ত স্থানটি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। কারণ, পাইপলাইন লিকেজ হলে সেখানে ভয়াবহ দূর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে সর্বোচ্চ। সরেজমিনে গিয়ে দেখাগেছে, মাটির নিচে স্থাপনের পূর্বে পাইপ ঝালাই করা হয়েছে অনেকটা মানহীন ভাবে।
এছাড়াও দুটো পাইপ ঝালাইয়ের ক্ষেত্রে পাইপদুটোর ঝালাইস্থানটি কিছুটা বেঁকে গেছে। সূত্র মতে, সাড়ে তিনফিট মাটি গর্ত করে গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনের কথা থাকলেও সরেজমিনে গিয়ে দেখাগেছে, দুই থেকে সর্বোচ্চ আড়াই ফিট মাটি খোড়া হয়েছে। কোন কোন স্থানে সর্বোচ্চ দেড় ফিট পর্যন্তও চোঁখে পড়ে। অন্যদিকে, স্পাতের পাইপগুলোর নিচে বালি দেবার নিয়ম থাকলেও বালির কোন অস্থিত্ব খুজে পাওয়া যায়নি। ২৪৫০ মিটার দীর্ঘ পাইপলাইন স্থানটিতে ভাল্বপিট আছে মোট ছয়টি। এরমধ্যেই প্রতিস্থাপন করতে হবে পাঁচটি বলে জানান, ঠিকাদার মনসুর আলী মন্ডল। পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিঃ রাজশাহীস্থ কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক আলমগীর হোসেন পাইপ লাইনের নিচে বালি ব্যবহারের বিষয়ে তিনি সরাসরি কোন উত্তর না দিয়ে প্রতিবেদককে বলেন, কাজের সার্বিক বিষয় সম্পর্কে বলতে পারবে সিরাজগঞ্জ বিভাগীয় কার্যালয়। তিনি প্রতিবেদককে আর একটি প্রশ্নের জবাবে জানান, উক্ত ছয় ইঞ্চি পাইপলাইন দিয়ে “৬০ পিএসআই” চাঁপের গ্যাস সরবরাহিত হবে। নগরীতে গ্যাস সরবরাহের সংখ্যা প্রায় দশ হাজার। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির চলমান কাজ নিয়ে স্থানীয়দের মন্তব্য “খুব জুলুমের মধ্যে রেখেছে তারা”।
রামচন্দ্রপুর, কেদুরমোড়, বাদুরতলা ও শহীদ মিনার রোড এলাকার বাসিন্দা সাগর, শামিম, সজিব সহ অন্যরা বলেন, এলাকার পানি নিষ্কাসনের ড্রেনগুলোও ভাঙ্গা হচ্ছে পাইপলাইন স্থাপন কাজে। এছাড়াও অসংখ্য দোকান, ফ্ল্যাট, বাসাবাড়ি ও শোরুমের সামনের সিড়ি, টাইলস করা অংশ ছাড়া পানি সরবরাহের ওয়াসার পাইপগুলোও ভেঙ্গে চরম ভোগান্তিতে ফেলেছেন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের লোকজন। প্রায় ১৯ লাখ টাকা সমমূল্যের টেন্ডারে পাওয়া কাজটি করছে সিরাজগঞ্জের ‘এস.সালাম এসোসিয়েশন’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। পাইপলাইন স্থাপন কাজের সাইড ইঞ্জিনিয়ার কামরুল ও ঠিকাদার মনসুর আলী এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, পাইপের নিচে বালি দেবার কথা সিডিউলে নেই। তাদরে কাছে সিডিউল দেখতে চাইলে তারা নানারকম টালবাহানা করেন। এছাড়াও তারা আরো বলেন, দুই বছর পূর্বে টেন্ডার হলেও রাসিকের জমি অধিগ্রহণ, ড্রেন ও রাস্তা নির্মাণ করার কারণে কাজ শুরু করতে দেরি হয়েছে অনেকে। যার কারনে লাভের চাইতে লোকসান গোনার সম্ভাবনা আছে বলেও মন্তব্য তাদের।
এছাড়াও, রাস্তা খোড়াখুড়ির কাজেও বিঘ্ন ঘটছে স্থানীয়দের নানামুখি চাঁপে বলেও জানান তারা। পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের প্রকৌশলী সুমনকে বালির বিষয়টি সম্পর্কে জানতে গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় ফোন করা হলে তিনি বলেন, আমি সিরাজগঞ্জ থেকে রাজশাহী যাচ্ছি। এখন বাসে আছি। আপনার কথা শুনতে পারছিনা। সরেজমিনে গিয়ে না দেখে আমি কিছু বলতে পারবোনা। নগরীতে গ্যাসপাইপ লাইনের ভাল্বপিট স্থানান্তর কাজে নিয়োজিত একজন বালি সম্পর্কে বলেন। পাইপের নিচে বালি দিলে পাইপগুলো ভারের কারণে বেকে যায়না। পাইপের নিচে বালিগুলো স্পঞ্জ এর মতো কাজ করে। ভারি কোন গাড়ি গেলে যেনো পাইপ ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে কারনেই এই ধরনের কাজে পাইপের নিচে বালি দেবার নিয়ম আছে।