শাহানুর রহমান রানা : ২০১৯ সালে করা প্রাণী কল্যাণ আইন বলছে, মালিকানাবিহীন কোন প্রাণী নিধন বা স্থানান্তর দন্ডনীয় অপরাধ। এছাড়া ২০১৪ সালে একটি প্রাণীপ্রেমী সংগঠণের রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে কুকুর নিধনে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে আদালতেরও। আর তখন থেকেই দেশে কুকুর নিধন বন্ধ রয়েছে আজ অবদি। গেল বছর ২০২০ সালের ২ সেপ্টেম্বর ঢাকা শহরজুড়ে বেওয়ারিশ কুকুরের উৎপাত, কামড় ও যন্ত্রণায় অতিষ্ট হয়ে ভুক্তভোগীরা বেওয়ারিশ কুকুর নিধন বা স্থানান্তর করবার দাবিতুলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সামনে মানববন্ধন করার পাশাপাশি মেয়রের নিকট স্মারকলিপি প্রদান করেন। যেটা, ঐসময় জাতীয় একাধিক দৈনিক পত্রিকায় প্রতিবেদন আকারে প্রকাশিত হয়।
রাজশাহী নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ড ও মহল্লায় বেশকয়েকদিন সরেজমিনে ঘুরে দেখাগেছে প্রতিটি পাড়ামহল্লা, অলিগোলি ও প্রধান সড়কগুলোর পাশে দলবদ্ধভাবে ঘুরাফেরা করছে কার্তিক মাসের আগে জন্ম নেওয়া কুকুর ছানাগুলো। ছোট ছোট কুকুর ছানাগুলোকে ছোট্ট কোন শিশু বাচ্চা আদর করতে গেলে মানুষের হাত থেকে সেগুলোকে রক্ষা করতে অদূরে বসে থাকা মা কুকুরের হিংস্র আওয়াজে গর্জে উঠায় আক্রমনের ভীতি কাজ করছে অভিভাবকদের মাঝে। পাড়ামহল্লার অলিগলি দিয়ে চলাচলকারী কোন ব্যক্তির পায়ের নিচে কুকুর ছানাগুলো অনাকাঙ্খিতভাবে পড়ে গেলে তাৎক্ষণিক মা কুকুরের তেড়ে আসার ভীতিতে অনেকেই বাধ্য হয়ে ঐসকল রাস্তা পরিহার করে চলেন বলেও জানান ভুক্তভোগীরা।
এছাড়াও দোকানে কোন কিছু কিনতে গেলে মা কুকুরসহ ছানাগুলোও এসে হাজির হয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে বলে জানান মাইনুল ও বাবু নামের দুজন ক্রেতা। নগরীর শালবাগান, মালদাকলোনী, শেখেরচক, সাগরপাড়া, নওদাপাড়া, বহরমপুর, সপুরা, ছোটবনগ্রাম, আসামকলোনী, শিরোইল কলোনী, বেলদারপাড়া, লক্ষিপুর কাঁচাবাজার সহ আরো বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখাগেছে, প্রায় প্রতিটি পাড়া মহল্লায় এবার গড়ে চারটি করে কুকুর সাবক জন্ম দিয়েছে মা কুকুর। সেহিসেবে, ত্রিশটি ওয়ার্ডে গড়ে ত্রিশটি করে কুকুর ছানা জন্ম নিলে নগরীজুড়ে নতুন জন্ম নেওয়া কুকুরের সংখ্যা প্রায় হাজার খানেক। এর সাথে যোগ হয়েছে পূর্বের বছরগুলোতে জন্ম নেওয়া কুকুরসহ মা ও বাবা কুকুরগুলো। সে হিসেবে সর্বমোট সংখ্যা প্রায় হাজার তিনেক ছাড়িয়ে যাবার কথা।
কুকুরের উৎপাত থেকে নগরীবাসিকে রক্ষা করেত কুকুর নিধন বা হত্যা না করে আদালতের নির্দেশনাকে সম্মান জানিয়ে কুকুরের সংখ্যা বৃদ্ধির পন্থাকে রোধ করার পরামর্শ দেন অনেকেই। শহরাঞ্চলে মানুষের নিরাপদ বসবাস ও নির্বিঘ্নে চলাফেরা ও জলাতঙ্ক আতঙ্ক দূরীকরনের জন্য কুকুর নিধন বা স্থানান্তর করা এখন সময়ের দাবি বলেও মন্তব্য অনেকের। আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকায়, ‘হত্যা নয়, বন্ধ্যাকরণ, ভ্যাকসিনেশন ও স্থানান্তর এর মাধ্যমে কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব বলে অভিমত ব্যক্ত করেন নগরীর সচেতন ব্যক্তিরা। উল্লেখ্য, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ১৯৬৩ সাল থেকে কুকুর নিধন বা হত্যা বন্ধ করে বন্ধ্যাকরণ ও ভেকসিনেশনের ব্যবস্থা চালু রয়েছে।
অন্যদিকে, সার্কভুক্ত দেশ নেপালেও ছয় বছর ধরে এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা শেখ মো. মামুন এর কাছে কুকুর বন্ধ্যাকরণ ও ভেকসিনেশন কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, ২০১৭ সালে সিটি কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগ ও পরিচ্ছন্ন বিভাগ কর্তৃক নগরীতে এই ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল। মহামান্য আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকায় কুকুর হত্যা বা নিধন বন্ধ রয়েছে। এই ধরনের কোন কার্যক্রম অদূর ভবিষত্যে আবারো নেয়া হবে কিনা জানতে চাইলে সেটি সংশ্লিষ্ট কর্তাদের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করছে বলেও তিনি জানান। বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা গেছে, নানারকম জীবাশ্ম ও জিনগত সূত্র থেকে এটুকু পরিষ্কার যে, কুকুরদের পূর্বপুরুষ নেকড়ে জাতীয় কোনো শ্বদন্তক প্রাণী।
সময়ের বিবর্তনে স্বাভাবিক নেকড়েসুলভ হিংস্রভাব তাদের আচরণে কমে যেতে থাকে, তারা হয়ে ওঠে সহজগম্য, পোষ মানে ক্রমশ। জড়নবৎঃ শ. ডধুহব এবং তার সহকর্মীদের কুকুরের বিবর্তন নিয়ে দীর্ঘদিনের কাজের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয় ১৯৯৭ সালে ঝপরবহপব নামক একটি পত্রিকায়। পরবর্তীতে ২০০২ সালে সুইডেন ও চীনের বৈজ্ঞানিকরা ৬৫৪টি কুকুরের জিনের বিশ্লেষণ করে জানালেন যে পৃথীবির সব কুকুরের উৎস একটিই মবহব ঢ়ড়ড়ষ এবং এদের জন্মস্থান এশিয়ায়, উড়াল পর্বতের দিকে। এই গবেষণাটিও ঝপরবহপব নামক একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
হিংস্রতার দিক দিয়ে বিশ্বের বিপজ্জনক কুকুরের মধ্যে অন্যতম হলো, পিটবুল, হাস্কি, গ্রেটডেন, জার্মান শেফার্ড, ম্যালামুট, ডোবারম্যান, বক্সার ও বুলমাস্টিক। যদিওবা আমাদের দেশে রাস্তার বেওয়ারিশ কিংবা বাসাবাড়িতে পোষা কুকুরগুলো উপরোক্ত জাতের কুকুরের ন্যায় এতোটা হিংস্র নয়; কিন্তু, দিনদিন তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি আর খাদ্যসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধির ফলে ইতিমধ্যেই বেওয়ারিশ কুকুরের খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে নগরীজুড়ে। যার কারণে, নিজেদের খাদ্য আহরণে কোন কোন স্থানে মুরগী, হাস, মুরগীর বাচ্চা কিংবা ছোট্ট ছাগল ছানা পেলে তারা সেগুলোকে কামড়ে আহত করে এবং মুখের চোয়ালে কামড়ে ধরে অন্যত্র দৌড়ে চলে যায় বলে দাবি অনেকের।
এছাড়াও, গেল বছরের প্রথমদিকে, নগরীর ১৭নং ওয়ার্ড অন্তর্গত ছায়ানীড় আবাসিক এলাকা, মহলদারপাড়া ও রোড নওদাপাড়ায় একমাসের ব্যবধানে বেওয়ারিশ কুকুর দ্বারা দশ জনের বেশি শিশু কিশোর আক্রান্ত হয়েছিল। এছাড়াও দাশপুকুর বৌ-বাজার ও মহলদার পাড়া এলাকার যথাক্রমে শারমিন ও মাইনুল জানান, বেশ কিছু কুকুর আছে যারা মুরগীর বাচ্চা দেখলে কামড়ে ক্ষতবিক্ষত করে।
নগরীর প্রধান প্রধান সড়কের পাশে দলবদ্ধভাবে বসে থাকা কুকুরদ্বারা আকস্মিকভাবে আক্রমনের স্বীকার হয়েছেন অনেক পথচারি ও ছোট যানবাহন চালকেরা। বিশেষ করে, সাইকেল, রিক্সা, বাইক দেখলে কোন কারণ ছাড়াই হিংস্রতা ধাঁচের গর্জন করে সেগুলোর পেছনে পেছনে দলবদ্ধভাবে দৌড়ানোর ফলে রাস্তায় চলাচলরত অনেকের মাঝেই ভীতি সঞ্চার করে কুকুরগুলো বলে মন্তব্য ভুক্তভোগী চালক ও আহোরীদের। কুকুরের এমন আক্রমণাত্মক ও হিংস্র আচোরণ পূর্ববর্তী সময়গুলোতে খুব একটা লক্ষ্য করা না গেলেও বিগত কয়েক বছর ধরে এমন ভীতিকর আচরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে পাড়া মহল্লাসহ প্রধান প্রধান সড়কে অবস্থানরত দলবদ্ধ কুকুরের মধ্যে বলে মন্তব্য করেন স্থানীয়রা। এর অন্যতম কারণ হতে পারে ক্রমান্বয়ে সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে খাদ্য সংকট বলেও মন্তব্য অনেকের।