স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহীতে কঠোর ‘লকডাউনের’ পরও কিছুতেই করোনা সংক্রমণের লাগাম টানা যাচ্ছে না। একই সঙ্গে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের করোনা ইউনিটে মৃত্যুর মিছিলও থামছে না। গত ২৪ ঘন্টায় রাজশাহী বিভাগে করোনায় ১৮ জনের প্রাণহানীর মধ্যদিয়ে বিভাগটিতে মৃত্যুর সর্বোচ্চ রেকর্ড হয়েছে। যে মৃত তালিকায় রামেক হাসপাতালের করোনা ইউনিটেই চিকিৎসাধীন ছিলেন ১৬ জন। গত মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় এদের মৃত্যু হয়েছে।
এটি এখন পর্যন্ত রামেক হাসপাতালসহ এই বিভাগে এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড। আর করোনা ভাইরাসের ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ ঠেকাতে উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা রাজশাহীতে তৃতীয় দফায় ‘বিশেষ লকডাউনের’ মেয়াদ এক সপ্তাহ বাড়িয়ে ৩০ জুন মধ্যরাত পর্যন্ত ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল বুধবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে রাজশাহী জেলা প্রশাসক আবদুল জলিল এ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। এর আগে গত ১১ জুন থেকে রাজশাহীতে চলমান কঠোর লকডাউন শুরু হয়।
এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় রাজশাহী বিভাগে ৪৬৮৫ নমুনা পরীক্ষায় করোনা শনাক্ত হয়েছে ৮৪৭ জনের। সে হিসেবে গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগটিতে শনাক্তের হার ১৮.০৮ শতাংশ। গতকাল বুধবার দুপুরে রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক নাজমা আক্তার স্বাক্ষরিত প্রেরিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজশাহী বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ১৮ জনের মধ্যে রাজশাহী জেলার রয়েছেন ৮ জন। এটি এ জেলায় এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড। অন্য আটজনের মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিনজন, নাটোরের দুইজন, নওগাঁর চারজন ও ঝিনাইদহের একজন। এদের মধ্যে রাজশাহীর পাঁচজন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোরের একজন করে রোগী করোনা পজিটিভ ছিলেন। আর করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়াদের মধ্যে রাজশাহীর তিনজন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের দুইজন, নাটোরের ও ঝিনাইদহের ছিলেন একজন করে।
এ ছাড়া নওগাঁর একজনের করোনা নেগেটিভ এলেও তিনি উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন। এ নিয়ে চলতি মাসে রামেক হাসপাতালের করোনা ইউনিটে মোট ২৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর রাজশাহী বিভাগে করোনায় মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৭৬৮। এরমধ্যে বগুড়া জেলায় সর্বো”চ ৩৫৫ জন মারা গেছেন। এ ছাড়া রাজশাহী জেলায় ১৩১, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৯৬, নওগাঁয় ৭০, নাটোরে ৪৫, জয়পুরহাটে ২৩, সিরাজগঞ্জে ২৮ ও পাবনায় ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এর মধ্যে জুন মাসের ২৩ দিনেই রাজশাহী বিভাগে করোনায় মারা গেছেন ২১০ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২৪ ঘণ্টায় নতুন শনাক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে রাজশাহী জেলার রয়েছে সর্বোচ্চ ৩৫২ জন। এছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১১১, নওগাঁয় ৫৩, নাটোরে ১০২, জয়পুরহাটে ৪৮, বগুড়ায় ৬২, সিরাজগঞ্জে ৩১ ও পাবনায় ৮৮ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। নতুন শনাক্ত রোগী নিয়ে এ বিভাগে মোট করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৪৯ হাজার ৬৬৬ জন।
আর গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে করোনা থেকে সুস্থ হয়েছেন ২৫৫ জন। আগের দিন সুস্থ হয়েছিলেন ২৫৯ জন। এ নিয়ে বিভাগে সুস্থ হলেন ৩৬ হাজার ৯০ জন। বর্তমানে বিভাগের ৮ জেলায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন ৪৯৯২ জন। এরমধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১৭০ জন। আগের দিন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৬০ জন। বিভাগে হাসপাতালের বাইরে বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন ৮ হাজার ৫৮৪ জন।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক নাজমা আক্তার বলেন, এবার করোনায় দিনমজুর, খেটে খাওয়া মানুষ বেশি মারা যা”েছন। এর কারণ হিসেবে বলেন, এসব শ্রেনি-পেশার মানুষের মধ্যে স্বা¯’্যসচেতনতা কম, এমনকি অনেকে টিকার জন্য নিবন্ধন করতেও আগ্রহী হননি। এ ছাড়াও সীমান্তবর্তী এলাকার গ্রামের মানুষ ভারতে বেশি যাতায়াত করায় তারাসহ তাদের সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিরাই আক্রান্ত হওয়া মৃত্যুর হারও বাড়িয়েছে।
এদিকে রামেক হাসপাতালে একের পর এক ওয়ার্ডকে করোনা ওয়ার্ডে রূপান্তর করার পরও শয্যার তুলনায় সবসময়ই রোগটিতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা থাকছে অনেক বেশি। বাড়তি এ চাপ সামলাতে রীতিমত হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এমন পরি¯ি’তিতে নতুন করে আরও একটি ওয়ার্ডকে করোনা ইউনিটে যুক্ত করা হয়েছে। এর বাইরে আরও দুটি ওয়ার্ডকে করোনা ওয়ার্ডে রূপান্তরিত করার কাজ চলছে। কিন্ত এতকিছুর পরও পরিস্থিতি সামলানো যাচ্ছে না।
অন্যদিকে ১ হাজার ২০০ শয্যার এই রামেক হাসপাতালে বর্তমানে চিকিৎসাধীন সাড়ে চারশ’রও বেশি করোনা রোগী রয়েছে। যাদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে সাধারণ রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন সাধারণ রোগীদের মাঝেও করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ভয়ংকর হিসেবেই দেখছেন চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, ‘লকডাউনে’ কোনো সুফল মিলছে না, কারণ ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে করোনা।
তাই এখন সব থেকে জরুরি হচ্ছে সকলকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। এ বিষয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. নওশাদ আলী বলেন, পরি¯ি’তি এখন আমাদের আর নিয়ন্ত্রণে নেই। এখন ঘরে ঘরে করোনা ছড়িয়ে পড়েছে। লকডাউন দিয়েও ফল মিলছে না। এ অবস্থায় খুব জরুরি হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। বাড়িতে থাকলেও একজন আরেকজনের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে এবং মাস্ক পরতে হবে। কারণ বাড়ির বাইরে বের না হয়েও বাইরে যাওয়া অন্যের মাধ্যমে অনেকেই করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে।
এ অবস্থায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কোন বিকল্প নেই। প্রায় একই ধরনের তথ্য জানিয়ে রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী বলেন, আমাদের এখানে ভারতীয় বা ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট দেখা দিয়েছে। সঠিক সময়ে আমরা সঠিক কাজটি করতে না পারায় করোনা রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেছে। তবে এখনো সময় ফুরিয়ে যায়নি। আমরা যদি সম্মিলিতভাবে কাজ করি তবে এটি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।