মাহবুবুজ্জামান সেতু নওগাঁ : রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) সামগ্রিক ব্যবসায়িক ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে এক অভূতপূর্ব রেকর্ড গড়েছে নওগাঁ জোন। সদ্য সমাপ্ত (৩০ জুন ২০২৬ ভিত্তিক) বার্ষিক হিসাব সমাপনীতে এই জোনটি মোট ১৭ কোটি ২৪ লক্ষ টাকা অপারেশনাল মুনাফা অর্জন করেছে। এই বিশাল অর্জনের মধ্য দিয়ে রাকাব-এর রাজশাহী বিভাগের মোট ৯টি জোনের মধ্যে শীর্ষস্থান (প্রথম) অধিকার করার গৌরব লাভ করলো নওগাঁ। এর আগে অর্ধবার্ষিক হিসাব সমাপনীতেও ব্যাংকের ১৮টি জোনের মধ্যে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করে শীর্ষে ছিল এই জোনটি। ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন— মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তাদের নিরলস পরিশ্রম, কৌশলগত ঋণ আদায় ক্যাস্ম্প, প্রকাশ্যে কৃষি ঋণ বিতরণ এবং গ্রাহকদের অবিচল আস্থার ফলেই এই সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং সুপরিকল্পিত মাঠপর্যায়ের তদারকির এক সমন্বিত ফল।
ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, বিপণন, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং সিএমএসএমই খাতের বিকাশে রাকাব সবসময় কাজ করে আসছে। সরকারি সব এজেন্ডা সফলভাবে বাস্তবায়ন করে দিনশেষে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নওগাঁ জোনের এই বিশাল মুনাফা অর্জন ব্যাংকটির ইতিহাসে একটি বড় মাইলফলক। এর আগে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত ‘বৈশাখী মেলা ও শুভ হালখাতা’ কর্মসূচির সময়ই জোনটি ৪৫০ কোটি টাকার আমানত স্পর্শ করার রেকর্ড গড়েছিল।
সাফল্যের এই ধারাবাহিকতায় জোনাল অফিসের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে জোনাল ব্যবস্থাপককে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নওগাঁ জোনাল অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাফল্যের এই খবর নিশ্চিত করে রাকাব নওগাঁ জোনের জোনাল ব্যবস্থাপক ও উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মো. রুহুল আমিন বলেন, “এই সাফল্য কোনো ব্যক্তির একক অর্জন নয়। নওগাঁ জোনের আওতাধীন ৩০টি শাখার প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারীর দিনরাত এক করা অক্লান্ত পরিশ্রম, নিষ্ঠা এবং আমাদের সম্মানিত গ্রাহকদের ভালোবাসাই আজ আমাদের শীর্ষে নিয়ে গেছে। এই জয় আগামী দিনে আমাদের দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দিল।” ফুলেল শুভেচ্ছা গ্রহণ করে তিনি আরও বলেন, “ভবিষ্যতেও গ্রাহকসেবা, ঋণ আদায় ও ব্যাংকের স্বার্থ রক্ষায় সবাই দায়িত্বশীল থাকলে আরও ভালো ফলাফল আসবে।”
নওগাঁ শাখার ব্যবস্থাপক মো. শাহীন আলম বলেন, “জোনাল ব্যবস্থাপকের সঠিক নেতৃত্ব ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই এই সাফল্য এসেছে। আমরা যে আশা করেছিলাম, জুন ২০২৬-এর বার্ষিক হিসাব সমাপনীতে সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আমরা শীর্ষে পৌঁছেছি।”
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নওগাঁ জোনের মুনাফা বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে তাদের মাঠপর্যায়ের বিশেষ ও সময়োপযোগী ঋণ আদায় কর্মসূচি।
ডিসেম্বরের বিশেষ ক্যাম্প : গত বছরের ২১ থেকে ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত জোনজুড়ে পরিচালিত ৩ দিনব্যাপী বিশেষ ঋণ আদায় ক্যাম্পে প্রায় ১৯ কোটি টাকা আদায় হয়, যার মধ্যে খেলাপি ঋণই ছিল ৪ কোটি টাকা। এছাড়া ১ থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত আরেকটি ক্যাম্পে রেকর্ড ২০ কোটি টাকা ঋণ আদায় করা হয়।
বৈশাখী হালখাতা-১৪৩৩: চলতি বছরের এপ্রিল মাসে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী ‘বৈশাখী মেলা ও শুভ হালখাতা’ উৎসবে উৎসবমুখর পরিবেশে ১১ কোটি ২০ লক্ষ টাকা আদায় করা হয়। যার মধ্যে দীর্ঘদিনের বকেয়া ও শ্রেণীকৃত ঋণই ছিল ২ কোটি ৬৫ লক্ষ টাকা।
মান্দার মহাক্যাম্প : মান্দা উপজেলার প্রসাদপুর শাখায় অনুষ্ঠিত ঋণ আদায় মহাক্যাম্পে বিগত ১০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ঋণ আদায়ের রেকর্ড গড়ে রাকাব। উক্ত ক্যাম্পে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাকাব-এর চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম। নওগাঁ শাখার ব্যবস্থাপক মো. শাহীন আলম জানান, “সহজ প্রক্রিয়া ও প্রণোদনার কারণে কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের সকাল কিংবা উৎসবের দিনগুলোতেও গ্রাহকদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে।”
গ্রাহকসেবা দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এবং ঋণ বিতরণে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে গত ২১ জুন পত্নীতলা শাখা প্রাঙ্গণে আয়োজিত হয় ‘প্রকাশ্যে কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণ অনুষ্ঠান’। বাংলাদেশ ব্যাংক বগুড়া শাখার নির্বাহী পরিচালক মো: সাখাওয়াত হোসেনের উপস্থিতিতে মেছের বাজার, কৃষ্ণপুর ও পত্নীতলা শাখার ২৮ জন নির্বাচিত প্রান্তিক কৃষকের মাঝে সরাসরি ৩৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার ঋণের চেক হস্তান্তর করা হয়। এছাড়া, গ্রাহকদের আধুনিক ও সুপরিসর ব্যাংকিং সুবিধা দিতে গত ১০ মে নিয়ামতপুর উপজেলার ‘হাজীনগর শাখা’টিকে শিবপুর বাজারের একটি পুরনো ভবন থেকে সম্পূর্ণ আধুনিক ও সুসজ্জিত নতুন ভবনে স্থানান্তর করা হয়েছে। নওগাঁ জোনে কর্মদক্ষতা, সেবার মানদণ্ড ও সফল নেতৃত্বের কারণে ইতিমধ্যেই রাকাব-এর রাজশাহী বিভাগের ‘শ্রেষ্ঠ জোনাল ব্যবস্থাপক’ হিসেবে পুরস্কৃত ও সম্মানিত হয়েছেন উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মো. রুহুল আমিন রুবেল। রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত বিভাগীয় সম্মেলনে ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়াহিদা বেগম তাঁর হাতে এই সম্মাননা ক্রেস্ট ও সনদপত্র তুলে দেন।
পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে এবং সিএমএসএমই খাতের নতুন নীতিমালা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে বিশেষ কর্মশালায় অংশ নিয়েছেন জোনের কর্মকর্তারা। সরকারের ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পল্লী উন্নয়ন একাডেমি বগুড়ার সাথেও যৌথ তদারকির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে রাকাব নওগাঁ জোন। ফুলেল শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে রাকাব জোনাল কার্যালয়,নওগাঁ’র এজিএম চিত্তরঞ্জন বসাক, নওগাঁ শাখার ব্যবস্থাপক মো. শাহীন আলমসহ জোনাল অফিসের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন এবং আগামী দিনের লক্ষ্য অর্জনে আরও আন্তরিকতা, স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
১৭ কোটি ২৪ লাখ টাকার অপারেশনাল মুনাফা শুধু একটি সংখ্যা মাত্র নয় এটি একটি সফল প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যবস্থাপনা মডেলের প্রতিফলন। শাখাভিত্তিক সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ, খেলাপি ঋণ কঠোর হস্তে নিয়ন্ত্রণ, আমানত বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করার মাধ্যমে নওগাঁ জোন আজ রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের অভ্যন্তরে একটি “পারফরম্যান্স বেঞ্চমার্ক জোন” হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও স্থানীয় সুধীজন মনে করছেন, আমানত বৃদ্ধি, প্রকাশ্যে স্বচ্ছ ঋণ বিতরণ এবং বকেয়া ঋণ আদায়ের এই গতিশীলতা নওগাঁ তথা সমগ্র উত্তরবঙ্গের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক যুগান্তকারী ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসছে।