শনিবার

৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

২৩শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ সংবাদ
বিশ্বে প্রথম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি হল ভ্যাকসিন, মানবদেহে সফল পরীক্ষা বাগমারার তাহেরপুর হাটে অতিরিক্ত খাজনা আদায়ের অভিযোগ পাবনায় নতুন বিসিক শিল্পনগরী গড়ে তোলা হবে : শিল্পমন্ত্রী নওগাঁ সীমান্তে বিএসএফ’র পুশইনের অপচেষ্টা ব্যর্থ করে দিলো বিজিবি তানোরে যেভাবে প্রাণ গেলো ৭টি গরুর তানোরে খাল পুনঃখনন পরিদর্শনে জেলা প্রশাসক গোমস্তাপুরের বাঙ্গাবাড়ি সীমানে ২৮ জনকে পুশইনের আপচেষ্টা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় গবেষণা-প্রশিক্ষণে অগ্রাধিকার : প্রধানমন্ত্রী প্রযুক্তির সাহায্যে ভুল-অপতথ্যের প্রচার মোকাবিলা এখন বড় চ্যালেঞ্জ : তথ্যমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জাপানের মিতসুই কোম্পানির প্রতিনিধিদলের সাক্ষাৎ

বিদ্যুৎ-বনায়ন সমন্বয়হীনতায় মরছে গাছ

Paris
Update : রবিবার, ২১ ডিসেম্বর, ২০২৫

সনি আজাদ, চারঘাট : বজ্রপাতের ঝুঁকি কমানো ও পরিবেশ সুরক্ষার লক্ষ্যে রাজশাহীর চারঘাটে রাস্তার পাশে সারি সারি তালগাছ রোপণ করেছিল বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ। পাশাপাশি বন বিভাগের সামাজিক বনায়নের আওতায় রাস্তার দুই পাশে রোপণ করা হয়েছে বনজ ও ফলদ প্রজাতির হাজারো গাছ। কিন্তু গাছগুলো একটু বড় হতেই নতুন সংকট দেখা দিয়েছে। পল্লী বিদ্যুতের লাইন এসব রাস্তার পাশ দিয়ে থাকায় বছরে অন্তত তিন-চার বার নির্বিচারে গাছের ডালপালা কেটে ছাঁটাই করা হচ্ছে। গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে, অনেক গাছ শুকিয়ে মারা যাচ্ছে। এতে সরকারের কোটি টাকার প্রকল্প যেমন মুখ থুবড়ে পড়েছে তেমনি পরিবেশের ভারসাম্য হুমকিতে পড়েছে।
উপজেলা বন বিভাগ ও বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কতৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ৫৩ কিলোমিটার রাস্তার পাশে সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে ৫৩ হাজার বনজ ও ফলদ প্রজাতির বৃক্ষ রোপণ করেছে বন বিভাগ। বজ্রপাতে পানহানি কমাতে সরকারি নির্দেশনায় চারঘাটের জয়পুর বাজার থেকে শলুয়া বালাদিয়াড় পর্যন্ত ১০ কিলোমিটারে ২০ হাজার তালগাছ রোপণ করেছে বিএমডিএ। কাবিখা ও টিআর প্রকল্পের আওতায় ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে বিভিন্ন রাস্তার পাশে রোপণ করা হয়েছে আরো ২ হাজার ৫৫০টি তালগাছ। এছাড়াও উপজেলা কৃষি বিভাগের মাধ্যমে কয়েক হাজার গাছ রোপণ করা হয়েছে।
উপজেলা বন বিভাগ বলছে, রোপণ করা গাছগুলো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী বড় হচ্ছিল। কিন্তু কোনো পূর্ব সমন্বয় ছাড়াই গাছপালার ভেতর দিয়ে বিদ্যুতের লাইন টানা হয়েছে। ডাল কাটার নামে গাছের মূল কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে, যা প্রকৃতপক্ষে গাছ হত্যার শামিল। গত চার বছরে শুধু পল্লী বিদ্যুৎ লাইনের কারণে ২০ হাজারের অধিক গাছ মারা গেছে। এসব গাছের মধ্যে রয়েছে তাল, মেহগনি, আকাশমনি, অর্জুন, নিম, কড়ইসহ বিভিন্ন মূল্যবান প্রজাতি। এতে সরকারের বজ্রপাত প্রতিরোধ ও সামাজিক বনায়ন প্রকল্প ক্ষতির মুখে পড়েছে।
অন্যদিকে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ বলছে, সরকারি বিধিমালা অনুসরণ করেই রাস্তার পাশ দিয়ে বৈদ্যুতিক তার স্থাপন করা হয়েছে। বিদ্যুতের তারের খুব কাছাকাছি গাছ থাকলে শর্ট সার্কিট, অগ্নিকাণ্ড ও প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। সেই ঝুঁকি কমাতেই নিয়ম অনুযায়ী লাইনের চারপাশের দশ ফিট পর্যন্ত ডালপালা কেটে পরিস্কার রাখা হচ্ছে। গাছের বিষয়ে বন বিভাগ তাঁদের সাথে কখনও যোগাযোগ করেনি।
সরেজমিন চারঘাট উপজেলার চারঘাট-নন্দনগাছী সড়ক, কাঁকড়ামারী-পরানপুর সড়ক, চারঘাট-কালুহাটি সড়ক ও জয়পুর-ইউসুফপুর সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ সড়কের পাশে সারি সারি গাছপালার মধ্যে বিদ্যুতিক লাইন রয়েছে। এসব সড়কের অধিকাংশ গাছের মাথা কেটে ফেলা হয়েছে। উপজেলার বাবুপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আকরাম হোসেন বলেন, যেখানে দু একটা ডাল কাটলে হবে সেখানেও নির্বিচারে গাছের মূল ডাল পর্যন্ত কেটে ফেলা হচ্ছে। আমি এ বিষয়ে প্রতিবাদ করায় আমার বাড়ির বিদ্যুতের লাইন কেটে দেওয়া হয়েছিল। পরে মাফ চাওয়ার পর আবার সংযোগ দিয়েছে। গাছ বাঁচানোর কথা বলে আমিই অপরাধী।
সরদহ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মতিউর রহমান তপন বলেন, বরেন্দ্র উঁচু অঞ্চল হওয়ায় এই এলাকায় ব্রজপাতে প্রতিবছরই মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ব্রজপাত প্রতিরোধে ও সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য ২০১০ সালে চারঘাট-সরদহ ইউনিয়ন পরিষদ সড়কের দুই পাশে তালগাছ রোপণ করেছিলাম। এক পাশের তালগুলো সুন্দর দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু অন্য পাশের গুলো কয়েকদিন পর পর ছাঁটাই করে নাড়া করে দেওয়া হচ্ছে। কিছু গাছ মারাও গেছে। বার বার বলেও বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বিদ্যুৎ কতৃপক্ষ।
গ্রীণ ভয়েস চারঘাট উপজেলার আহবায়ক শাহাদাতুজ্জামান রিমন বলেন, বজ্রপাত নিরোধ ও পরিবেশ রক্ষার জন্য যে গাছ লাগানো হলো, সেগুলো যদি সমন্বয়হীনতায় নষ্ট হয়ে যায়, তবে এই উদ্যোগের সুফল মিলবে কীভাবে? আমরা দুই দপ্তরকেই বিষয়টি অবগত করেছি। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) চারঘাট উপজেলার সভাপতি মোঃ কামরুজ্জামান বলেন, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বনায়নের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে এমন ক্ষতি চলতেই থাকবে। দু দপ্তরের যৌথ পরিকল্পনা, নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে তার স্থাপন এবং গাছের প্রজাতি নির্বাচন করার ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিতে হবে। নয়তো দু দপ্তরের সমন্বয়ের অভাবে গাছগুলোও মারা যাবে আবার সরকারের কোটি কোটি টাকাও নষ্ট হবে।
চারঘাট উপজেলা বন কর্মকর্তা মোঃ মাহবুবুর রহমান বলেন, নির্বিচারে ডাল-পালা কাটায় উপজেলায় প্রতি বছর গড়ে পাঁচ হাজার গাছ মারা যাচ্ছে, এজন্য দায়ী বিদ্যুৎ কতৃপক্ষ। তারা নানা রকম আইন দেখিয়ে সড়কের পাশে গাছের মধ্যে দিয়ে লাইন টানা বন্ধ করেনি। নির্বিচারে গাছ কাটায় বিদ্যুৎ বিভাগের নামে একটি মামলাও করেছি তারপরও প্রতিকার নেই। তাদের অত্যাচারে গাছ লাগানো বন্ধ রেখেছি। নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর চারঘাট জোনাল অফিসের ডিজিএম মোঃ আসাদুজ্জামান বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং মানুষের জীবন রক্ষা করাই আমাদের মূল দায়িত্ব। গাছ সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকলে সেখানে ব্যবস্থা নিতেই হয়। কিন্তু গাছ বাঁচাতে বন বিভাগ আমাদের সাথে যোগাযোগ কখনও করেনি। তবে তাদের সাথে যোগাযোগ করে বিষয়টি সমাধানে উদ্যেগ নেওয়া হবে।


আরোও অন্যান্য খবর
Paris