আলিফ হোসেন : প্রচন্ড খরাপ্রবণ বৃহত্তর বরেন্দ্র অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত রাজশাহী অঞ্চলের তিন জেলা রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৪ হাজার ৯১১টি মৌজার পেট প্রায় পানি শূণ্য। এসব এলাকায় খাবার পানি ছাড়া অন্য কোনো কারণে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা যাবে না। সরকার এ-সংক্রান্ত একটি গেজেট প্রকাশ করেছে। সম্প্রতি এ গেজেট হাতে পেয়েছে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)। তারা চাষাবাদের জন্য গভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে।এখন কী করণীয়, সে বিষয়ে বিএমডিএ সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না।
এদিকে এসব এলাকায় নতুন করে কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠানও করা যাবে না। এ নিয়ে হতাশ পিছিয়ে পড়া রাজশাহী অঞ্চলের ব্যবসায়ীরাও। চাষাবাদ নিয়ে কৃষকেরাও পড়েছেন উদ্বেগে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বরেন্দ্র অঞ্চলকে মরু করণের হাত থেকে বাঁচাতে হলে নিষেধাজ্ঞা মানতে হবে। পাশাপাশি ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও জোর দিচ্ছেন তারা।
এদিকে গত ৬ নভেম্বর প্রকাশিত গেজেটে বলা হয়েছে, জাতীয় পানি সম্পদ পরিষদের নির্বাহী কমিটির ১৮তম সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক ৪ হাজার ৯১১টি মৌজাকে আগামী ১০ বছরের জন্য পানি সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। এসব মৌজা পড়েছে ২৫টি উপজেলার ২১৫টি ইউনিয়নের মধ্যে । এরমধ্যে ৪৭টি ইউনিয়নের এক হাজার ৪৬৯টি মৌজাকে অতি উচ্চ পানি সংকটাপন্ন, ৪০টি ইউনিয়নের ৮৮৪টি মৌজাকে উচ্চ পানি সংকটাপন্ন এবং ৬৬টি ইউনিয়নের এক হাজার ২৪০টি মৌজাকে মধ্যম মাত্রার পানি সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সংকটে যেসব এলাকা: বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৮৫ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির গড় স্তর ছিল ২৬ ফুট নিচে। ক্রমাগত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করায় ২০১০ সালে পানির স্তর নেমে যায় ৫০ ফুট নিচে। ২০২১ সালে এ স্তর আরও নিচে নেমে দাঁড়ায় ৬০ ফুটে। এখন বরেন্দ্র অঞ্চলের কোনো কোনো এলাকায় পানি নেমে গেছে ১১৩ ফুটেরও নিচে।
এদিক অতি উচ্চ পানি সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার দেওপাড়া, পাকড়ি ও রিশিকুল ইউনিয়ন;পবার দর্শনপাড়া, দামকুড়া ও হুজরিপাড়া; তানোরের কামারগাঁ, বাঁধাইড়, কলমা, পাঁচন্দর, সরনজাই, তালন্দ ও চান্দুড়িয়া ইউনিয়ন। এছাড়াও রয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের ঝিলিম, গোমস্তাপুরের আলিনগর, চৌডালা, পার্বতীপুর, রহনপুর ও রাধানগর, নাচোলের ফতেপুর, কসবা, নাচোল ও নেজামপুর, নওগাঁর ভাবিচা, হাজিনগর ও নিয়ামতপুর ইউনিয়ন; নিয়ামতপুর উপজেলার পাড়ইল, রসুলপুর ও শ্রীমন্তপুর; পত্নীতলার আকবরপুর, দিবর, কৃষ্ণপুর, মাটিন্দর, নির্মইল, শিহাড়া ও পত্নীতলা; পোরশার ছাওড়, গাঙ্গুরিয়া, ঘাটনগর, মশিদপুর, নিতপুর ও তেঁতুলিয়া; সাপাহারের আইহাই, গোয়ালা, সাপাহার, শিরন্টী ও তিলনা।
উচ্চ পানি সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার গড়গড়ি ও পাকুড়িয়া ইউনিয়ন; বাগমারার গণিপুর, চারঘাট সদর ইউনিয়ন, দুর্গাপুরের ঝালুকা, জয়নগর ও কিসমতগণকৈড়; গোদাগাড়ী সদর ইউনিয়ন, মোহনপুর ও গোগ্রাম; মোহনপুর উপজেলার বাকশিমইল, ধুরইল, রায়ঘাটি ও মৌগাছি; পবার হড়গ্রাম এবং নওগাঁর আত্রাইয়ের হাটকালুপাড়া, মহাদেবপুরের হাতুর, মান্দার গণেশপুর, মৈনম ও তেঁতুলিয়া; নওগাঁ সদরের বোয়ালিয়া ও শেখেরপুর; নিয়ামতপুরের বাহাদুরপুর, পত্নীতলার আমাইড় ও পাটিচরা; রানীনগরের গোণা, কাশিমপুর ও রাণীনগর ও সাপাহারের পাতাড়ী এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের গোবরাতলা, মহারাজপুর ও রানীহাটি; গোমস্তাপুরের আলিনগর, বাঙ্গাবাড়ী, বোয়ালিয়া ও গোমস্তাপুর; শিবগঞ্জের নয়ালাভাঙ্গা, সত্রাজিতপুর, শ্যামপুর ও উজিরপুর।
মধ্যম পানি সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে এসেছে রাজশাহীর বাঘার আড়ানী, বাজুবাঘা, বাউসা ও মনিগ্রাম; বাগমারার আউচপাড়া, বাসুপাড়া, গোয়ালকান্দি, গোবিন্দপাড়া, মাড়িয়া, সোনাডাঙ্গা, শ্রীপুর ও শুভডাঙ্গা, চারঘাটের ভায়ালক্ষমীপুর, নিমপাড়া, সরদহ ও ইউসুফপুর, দুর্গাপুরের দেলুয়াবাড়ি ও নওপাড়া; গোদাগাড়ীর বাসুদেবপুর, চরআষাড়িয়াদহ ও মাটিকাটা; মোহনপুরের জাহানাবাদ, পবার পারিলা, বড়গাছি, হরিপুর ও হরিয়ান; পুঠিয়ার বানেশ্বর, ভালুকগাছি ও শিলমাড়িয়া। রয়েছে নওগাঁর আত্রাইয়ের কলিকাপুর ও সাহাগোলা; ধামইরহাটের খেলনা, মান্দার বিষ্ণুপুর, কাঁশোপাড়া, কশব, পরানপুর ও প্রসাদপুর; নওগাঁ সদরের বক্তারপুর, চন্ডিপুর, দুবলহাটি, হাঁপানিয়া, হাঁসাইগাড়ি, শৈলগাছি ও তিলকপুর; নিয়ামতপুরের চন্দননগর, পত্নীতলার ঘোষনগর, নজিপুর, রানীনগরের বড়গাছা, কালীগ্রাম, মিরাট ও পারইল; চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের বালিয়াডাঙ্গা ও বারঘরিয়া; ভোলাহাটের সদর, দলদলী, গোহালবাড়ী ও জামবাড়িয়া; শিবগঞ্জের চককীর্তি, দাইপুকুরিয়া, ধাইনগর, দুর্লভপুর, ঘোড়াপাখিয়া, কানসাট, মোবারকপুর ও পাঁকা ইউনিয়ন।
নির্দেশনায় যা আছে: পানি সংকটাপন্ন এলাকায় বাংলাদেশ পানি আইন, ২০১৩ এর ধারা ৩ ও ১৮ অনুযায়ী পানি সম্পদের অগ্রাধিকার ভিত্তিক ব্যবহার যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে বলে গেজেটে বলা হয়েছে। এরমধ্যে প্রথমেই বলা হয়েছে, খাবার পানি ব্যতীত অন্য কোনো কারণে নতুন করে নলকূপ স্থাপন ও ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন বন্ধ থাকবে এবং খাবার পানি সরবরাহ ছাড়া অন্য কোনো কারণে বিদ্যমান নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন বন্ধ থাকবে।এছাড়া ভূগর্ভস্থ পানি নির্ভর শিল্প বা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা যাবে না; খাল, বিল, পুকুর, নদী তথা কোনো জলাধারের শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না এবং জলাশয়গুলো জনগণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে; জনগণের ব্যবহারযোগ্য খাস জলাশয় ও জলমহালসমূহ ইজারা প্রদান নিরুৎসাহিত করতে হবে; জলস্রােতের স্বাভাবিক প্রবাহ বিঘ্নিত করা যাবে না; কোনো জলাধারের সমগ্র পানি আহরণ করে নিঃশেষ করা যাবে না; ভূমি এবং পানির প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট বা পরিবর্তন করতে পারে এমন কাজ করা যাবে না; অধিক পানি নির্ভর ফসল উৎপাদন নিরুৎসাহিত বা সীমিত করতে হবে এবং পর্যায়ক্রমে পানি সাশ্রয়ী ফসলের আবাদ বৃদ্ধি করতে হবে; এবং সুপেয় পানি ও গৃহস্থালি কাজে পানি ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করা যাবে। এসব বিধি-নিষেধ প্রতিপালন করা বাধ্যতামূলক; বিধি-নিষেধের লঙ্ঘন দন্ডনীয় অপরাধ বলে গণ্য হবে। এই গেজেটে সংকট মোকাবিলায় বেশকিছু সরকারি সংস্থার কিছু কার্যক্রমও ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। এতে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোর প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে।দুশ্চিন্তায় সবাই: বিএমডিএ রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে প্রায় ১৮ হাজার গভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূ-গর্ভস্থ পানি তুলে কৃষকদের সরবরাহ করে। সংকটাপন্ন হিসেবে চিহ্নিত এলাকায় তাদের কয়েক হাজার গভীর নলকূপ আছে। একইভাবে ব্যক্তিগত মালিকানায় থাকা আরও কয়েকহাজার সেমি-ডিপ পানি উত্তোলন করে। এগুলো কৃষিকাজের জন্য বন্ধ করতে হবে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা দেখা দিয়েছে।এ নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন অঞ্চলের কৃষক, ব্যবসায়ী এবং সেচসংশ্লিষ্টরা। কৃষকরা বলছেন, খাবার পানি ছাড়া অন্য কোনো পানি উত্তোলন না হলে তারা ফসল ফলাতে পারবেন না। তবে বিশেষজ্ঞরা সেচ লাগে না বা ভূ-উপরিস্থ কিংবা বৃষ্টির পানিনির্ভর ফসল চাষাবাদ শুরুর ব্যাপারে মত দিচ্ছেন। বিএমডিএর সেচ শাখার নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ জিল্লুল বারী বলেন, ‘আমরা দুদিন আগেই গেজেটটি পেয়েছি। আসলে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এভাবে কৃষিকাজ বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব না। এখন এটা সরকারের উচ্চপর্যায়ের বিষয়। তারা বসে এ ব্যাপারে সিদ্ধাস্ত নেবে।’বিএমডিএর নির্বাহী পরিচালক তরিকুল আলম বলেন, ‘আমরা গেজেটটা দেখেছি। এর অর্থ মনে হচ্ছে যে, গভীর নলকূপ দিয়ে এখন থেকে শুধু খাবার পানি তোলা যাবে, কৃষিতে এ পানি যাবে না। আমরা মাঠপর্যায় থেকে তথ্য নিচ্ছি এসব এলাকায় গভীর নলকূপের সংখ্যা কত, কি পরিমাণ জমি আছে এবং ফসলের উৎপাদন কেমন হয়। এগুলো নিয়ে উচ্চপর্যায়ে বৈঠক হবে। তারপরই বিষয়গুলো নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে।’রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার চৈতন্যপুর মৌজাকে অতি উচ্চ সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এ এলাকায় ২০০৬ সাল থেকে জমি চাষাবাদ করছেন কৃষক মনিরুজ্জামান মনির। একাধিকবার পেয়েছেন জাতীয় পুরস্কারও। মনিরুজ্জামান বলেন, ‘কৃষিকাজ বন্ধ করে বসে থাকা কোনো সমাধান নয়। এটি সম্ভবও নয়। সমস্যা সমাধানের বিকল্প উপায় খুঁজতে হবে। বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতির যে গঠন, তাতে খুব সহজেই ভূ-উপরিস্থ পানির আঁধার তৈরি করা যাবে। নীতি-নির্ধারকদের সে পথেই হাঁটতে হবে।’নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ব্যাপারে রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাসুদুর রহমান রিংকু বলেন, ‘রাজশাহী অঞ্চল এমনিতেই ব্যবসা-বাণিজ্যে পিছিয়ে পড়া জনপদ। এখানকার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হুমকিতে আছে, এটা আরও হুমকিতে পড়ল পানিসংকটের কারণে। এখান থেকে উত্তরণে সরকারকেই পথ বের করতে হবে।’বরেন্দ্র অঞ্চলের পানিসংকট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান। তিনি বলেন, ‘শুধু খাবার পানি তোলা যাবে। এতে দেখা যাবে বাড়িতে সাবমারসিবল পাম্প বসিয়েই পাইপের মাধ্যমে সেচের পানি দেওয়া হবে। এ অবস্থায় সংকট মোকাবিলায় ভূ-উপরিস্থ পানি নিশ্চিত করতেই কাজ করতে হবে। এ জন্য পদ্মা নদীর পানি বরেন্দ্র অঞ্চলে ঢোকাতে হবে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করতে হবে। এ জন্য কোনো সরকারি পুকুর, খাল-বিল ইজারা দেওয়া যাবে না। এগুলোর পানি কৃষিকাজের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। পাশাপাশি পানি কম লাগে বা বৃষ্টির পানিতেই চাষাবাদ সম্ভব, এমন ফসলের চাষাবাদের দিকেই যেতে হবে।