রওশন আলম, মান্দা : নওগাঁর মান্দায় প্রায় ৫ শত বছরের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে অপূর্ব কারুকার্যে ভরা দৃষ্টিনন্দন ঐতিহাসিক কুসুম্বা শাহী মসজিদ। জানা যায়, ধর্মের প্রতি বিশ্বাস আর ভালোবাসা থেকেই ৯৬৬ হিজরিতে সুলতান গিয়াস উদ্দিন বাহাদুর শাহের শাসনামলে সোলায়মান নামে এক ব্যক্তি দৃষ্টিনন্দন মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। পাঁচ টাকার নোটে মুদ্রিত মসজিদটি জেলা শহর থেকে ৩৩ কিলোমিটার দূরে নওগাঁ- রাজশাহী মহাসড়কের পাশে প্রাচীনতম কুসুম্বা গ্রামে অব¯ি’ত।
মসজিদের প্রবেশদ্বারে বসানো ফলকে মসজিদের নির্মাণকাল লেখা রয়েছে হিজরি ৯৬৬ সাল (১৫৫৮-১৫৬৯ খ্রিষ্টাব্দ) আফগানি শাসনামলের শুর বংশের শেষদিকের শাসক গিয়াসউদ্দিন বাহাদুর শাহের আমলে সুলায়মান নামে একজন এই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে মসজিদের তিনটি গুম্বজ নষ্ট হয়েছিল। পরে সেগুলো প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সংস্কার করেন। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে মসজিদের চতুর্দিকে এবং পূর্বপার্শ্বে অব¯ি’ত দিঘির পাড়ে ফুলের বাগান নির্মাণ, আলোকসজ্জার কাজ করা হয়।
মসজিদটি দৈর্ঘ্যে ৫৮ ফুট, প্রস্থে ৪২ ফুট। দুই সারিতে ৬টি গোলাকার গম্বুজ রয়েছে। মসজিদের গায়ে রয়েছে লতাপাতার নকশা। প্রাচীর ঘেরা মসজিদটির প্রধান ফটকে প্রহরী চৌকি ছিল। মসজিদটিতে ইটের গাঁথুনি, সামান্য বাঁকানো কার্ণিশ এবং সংলগ্ন আটকোণা বুরুজ। এগুলো থেকে মসজিদের স্থাপত্যে বাংলা স্থাপত্যরীতির প্রভাব পাওয়া যায়। মসজিদের মূল গাঁথুনি ইটের হলেও এর সম্পূর্ণ দেয়াল এবং ভেতরের খিলানগুলো পাথরের আস্তরণে ঢাকা। মসজিদের স্তম্ভ, ভিত্তি মঞ্চ, মেঝে ও দেয়ালের জালি নকশা পর্যন্ত পাথরের। মসজিদটি আয়তাকার এবং এতে রয়েছে তিনটি বে এবং দুটি আইল। এর পূর্বপ্রান্তে তিনটি প্রবেশ পথ এবং উত্তর ও দক্ষিণে দুটি করে খিলানযুক্ত জানালা রয়েছে। মসজিদের কেন্দ্রীয় মিহরাবটি পশ্চিম দিকের দেয়ালের থেকে আলাদা। পশ্চিম দেয়ালের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে এবং মাঝামাঝি প্রবেশপথ বরাবর দুটো মিহরাব রয়েছে যা মেঝের সমান্তরাল। উত্তর-পশ্চিম কোণের বে- তে মিহরাবটি একটি উঁচু বেদীর উপর বসানো। মোট মিহরাব আছে ৩ টি, যার সবগুলো কালো পাথরের তৈরি। মসজিদটির সম্মুখে ২৫.৮৩ একর আয়তন বা ৭৭ বিঘা’র একটি বিশাল জলাশয় রয়েছে যা কুসুম্বা দিঘি নামে পরিচিত। মিহরাবটি আঙ্গুরগুচ্ছ ও লতাপাতার নকশায় খোদিত রয়েছে। মসজিদের ভিতরে উত্তর-পশ্চিম কোনের স্তম্ভের উপর একটি উঁচু আসন রয়েছে। ধারণা করা হয়, এই আসনে বসেই তৎকালীন কাজী-বিচারকরা এলাকার বিভিন্ন সমস্যার বিচার কার্য পরিচালনা করতেন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন পত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মসজিদের ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনায় কুসুম্বা মসজিদটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষণা করে এবং অর্থ মন্ত্রণালয় ১৯৭২ সালে ৫ টাকার নোটে কুসুম্বা মসজিদের ছবি মুদ্রিত করে।
দৃষ্টিনন্দন এই মসজিদটি এক নজর দেখা ও দুরাকাত নফল ইবাদত করে মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ সন্তষ্টি লাভের আশায় নওগাঁ, রাজশাহী, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা ছুটে আসেন এই ঐতিহাসিক কুসুম্বা মসজিদ দেখার জন্য। এমন কি দেশের বাহির থেকে ও পর্যটকরা ছুটে আসেন।