শুক্রবার

১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ সংবাদ
হাজার কোটি টাকার টার্গেট নিয়ে রাজশাহীতে আম পাড়া শুরু রাজশাহীতে অটোরিক্সা চালক হত্যায় চার জন গ্রেপ্তার, অটোরিক্সা উদ্ধার রাজশাহীতে হোটেলের ক্ষতিপূরণ চাওয়ায় ‘চাঁদাবাজ’ হিসাবে অপপ্রচারের অভিযোগ নওগাঁয় অনলাইন জুয়ার মূল হোতাসহ ১৫ জন গ্রেফতার প্রধানমন্ত্রী শুধু স্বপ্ন দেখাচ্ছেন না, স্বপ্নগুলো বাস্তবায়ন করেও দেখাচ্ছেন : রাসিক প্রশাসক বন্ধ চিনিকলগুলোতে আশার আলো মোস্তফার ভরসা বুকে বাঁধা বেয়ারিং গাড়ি রাজশাহীকে পরিকল্পিত মহানগর হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে: ভূমিমন্ত্রী রাজশাহীর লিচুতে ৬০ কোটি টাকা বাণিজ্য হওয়ার সম্ভাবনা অবশেষে জেল ফটকে অপেক্ষারত তিন শিশু ফিরে পেল মায়ের কোল

নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন নওহাটা পৌরসভার বাসিন্দারা

Paris
Update : বুধবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৫

ইউসুফ আলী চৌধুরি  : নওহাটা পৌরসভার বাসিন্দারা বর্তমানে বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন- এমন অভিযোগ হরহামেশায় পাওয়া যাচ্ছে। নাগরিক পরিষেবা প্রদানে পৌরসভার কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে কাউন্সিলরদের বরখাস্ত করার পর থেকে সেবার ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
নওহাটা পৌরসভা একটি প্রথম শ্রেণির পৌরসভা। যা পবা উপজেলার একটি অংশ। রাজশাহী মহানগরীর উপকন্ঠে নওহাটা পৌরসভায় ৪৬.১০ বর্গমাইল এলাকায় ১ লক্ষ্য ১৫ হাজার নাগরিকের বসবাস। আগে ০৯ টি ওয়ার্ড থেকে পৌরসভা কার্যালয়ে প্রতিদিন গড়ে ২০০-২৫০ জন মানুষ সেবা নিতে আসতেন। এখন আসছেন মাত্র ৫০-৬০ জন। তবুও তারা কাঙ্খিত সেবা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ তুলেছে। সেখানে বসবাসরত মানুষেরা বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। জরুরী সেবা- নাগরিত্ব সনদ, জন্ম সনদ, চারিত্রিক সনদ ও ওয়ারিশন সনদ সময়মত না পাওয়ার অভিযোগ এখানে ভরি ভরি। এছাড়াও রাস্তাঘাট, পানি সরবরাহ, সড়ক আলোকায়ন এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিষেবা ঠিকমত পাচ্ছেন না। আর সেবা না থাকায় পৌরসভার আয় এখন শূন্যের কোটায় অবস্থান করছে।
নওহাটা পৌরসভার বাসিন্দারা অভিযোগ করছেন যে তারা প্রয়োজনীয় নাগরিক সেবা পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, মশক নিধন এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বঞ্চিত হলেও নিয়মিত কর ও বিল পরিশোধ করে যাচ্ছেন। নাগরিকদের এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে, নওহাটা পৌরসভার কার্যক্রম এবং নাগরিক সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়রা বলছেন, পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডে নাগরিক সুবিধা অপ্রতুল এবং তারা কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।
রাজশাহী মহানগরী থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত নওহাটা পৌরসভা। সিটি করপোরেশনের মতো সকল সুযোগ-সুবিধা ছিল এই পৌরসভায়। নিয়মিত সেবাও পেতেন পৌরবাসী। বর্তমানে বিভিন্ন জটিলতায় এই চিত্র পাল্টে যায়। দায়িত্বরত প্রশাসক সময় মতো না আসায় সেবায় বিঘ্ন ঘটছে বলে জানিয়েছে পৌরসভার বাসিন্দারা। তারা বলেন, ট্রেড লাইসেন্স, জাতীয়তা সনদ, জন্ম নিবন্ধন, মৃত্যু নিবন্ধন, ওয়ারিশ সনদ, প্রত্যয়ন, নাগরিকত্ব সনদসহ বিভিন্ন সনদ প্রশাসকের স্বাক্ষর ছাড়া পৌরবাসীদের দেয়া হচ্ছে না। পৌরসভার কোনো কর্মকর্তার স্বাক্ষরেও এইসব সনদ দেয়া হচ্ছে না। এতে এসব সেবা পেতে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পৌরভবনের নিচে বসে আছেন সেবা গ্রহিতারা। বিভিন্নজন এসেছেন বিভিন্ন কাজে। এদের মধ্যে অমিত নামের একজন এসেছেন নাগরিকত্ব সনদ নিতে। তিনি বলেন, ‘আমি পৌরসভার তিন নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। আমার জরুরিভাবে নাগরিকত্ব সনদ লাগবে। কিন্তু এসে দেখি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নাই। তার জন্য অপেক্ষা করছি। এর আগেও দুইদিন এসে ঘুরে গেছি’। নাজমা নামের আরেকজন এসেছিলেন প্রত্যায়নপত্র নিতে। তিনি বলেন, ‘মেয়ের জন্মনিবন্ধন করা হয়েছে। তবে নামে ভুল আছে। এ কারণে প্রত্যায়নপত্র লাগবে। কিন্তু পরিচিত কাউন্সিলররা না থাকায় বুঝে উঠতে পারছি না। এসে এসে ঘুরেও যেতে হচ্ছে’।
পৌরসভায় গিয়ে দেখা যায়, পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা শাহীন আলম জানান তার স্ত্রী রিসিতা আক্তার মারা যাওয়ার পরে মৃত্যু সনদ প্রয়োজন হয়। পৌরসভায় দুই মাস আগে মৃত্যু সনদের জন্য আবেদন করা হলেও তিনি সনদ পাননি। এ বিষয়ে শাহীন আলম বলেন,“আমার স্ত্রীর মৃত্যু সনদ নেওয়ার জন্য নওহাটা পৌরসভায় আবেদন করি। আবেদন করার পরে আমাকে জানানো হয় এক সপ্তাহ পরে দেখা করতে। এক সপ্তাহ পরে গিয়ে দেখি এখনো হয়নি। এরপর থেকে একদিন দুইদিন করতে করতে এখন প্রায় দুই মাস হয়ে গেলো এখন পর্যন্ত মৃত্যু সনদ পায়নি। এভাবে আমাকে আর কতদিন ঘুরতে হবে। আমার উপজেলায় একটি লোন নেওয়া ছিলো। সেখানে আমার স্ত্রী’র মৃত্যু সনদ প্রয়োজন।”
নওহাটা পৌরসভার প্রশাসকের দায়িত্বে আছেন পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরাফাত আমান আজিজ। তিনি নওহাটা পৌরসভায় নতুন নতুন শর্ত জুড়িয়ে দিয়ে জনগণকে নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তিনি নাগরিকত্বের সনদ নিতে বিয়ের কাবিন নামার কপি চান। ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বরে (টিআইএন) জটিলতার শর্ত দেন। কোন জনগণ পাঁচ ধরণের ব্যবসা করতে চাইলে পাঁচটি টিআইএন খুলতে বলেন। অথচ একজন ব্যক্তির একটি টিআইএন থাকবে। কারণ টিআইএন খুলতে হয় জাতীয় পরিচয় পত্রের নম্বার দিয়ে। অনেকের টিআইএন না থাকায় ট্রেড লাইসেন্স দেয়া হচ্ছে না। আমাদের দেশে বেকারত্ব থেকে মুক্তি পেতে জনগণ ব্যবসা করেন। অনেকে একটি আইটেমের ব্যবসায় লোকসান হলে অন্য ব্যবসা করে থাকেন। আর একটি পৌরসভার বড় আয় হচ্ছে ট্রেড লাইসেন্স থেকে। এক ব্যক্তি পাঁচ ধরণের ব্যবসা করলে প্রত্যেকটির জন্য ট্রেড লাইসেন্স করবে। ফি দিবে, পৌরসভার আয় বাড়বে।
ভুক্তভোগি ইব্রাহিম আলী মুন্না জানান, তিনি ট্রেড লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেও পাননি। ট্রেড লাইসেন্সের আগেই তাকে আয়করের ফাইল খুলতে বলেছেন। তার কথা হলো-তিনি ব্যবসা শুরুই করতে পারলেন না, কি জন্য আয়করের ফাইল খুলবেন? জানা গেছে নানা শর্ত দিয়ে রহমান জুট মিল, নওহাটা জুট মিল, হাসান জুট মিলের ট্যাক্স নিচ্ছেন না। এ সমস্ত নানান জটিলতায় নওহাটা পৌরসভা আয়শূন্য হয়ে পড়ছে। একটি নাগরিক সার্টিফিকেট নিতে অনলাইনে আবেদন করতে হচেছ। এতে করে সার্টিফিকেট পেতে ১০-১৫ দিনও লেগে যাচ্ছে। যার অনেক সময় এই সার্টিফিকেট কাঙ্খিত কাজে আসছে না। আর ওয়ারিশন সার্টিফিকেট তো তিন মাসেও পায়নি এমন অভিযোগও রয়েছে। অথচ চিকিৎসার জন্য অনেকে জমি-জমা বিক্রি করেন। সেখানে অনেক সময় ওয়ারিশন সার্টিফিকেটর জরুরী প্রয়োজন হয়।
পৌরসভার ৭ নং ওয়ার্ড বালিয়াডাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা মোসা: শিরিনা বেগম ও মোসা: সানুয়ারা বেগম বলেন, আগে পৌরসভায় নাগরিক সনদপত্র নিতে গেলে যাওয়ার ১০/২০ মিনিটের মধ্যেই পাওয়া গেছে। আইডি কার্ডের ফটোকপি সাথে বড়জোর বাড়ীর ট্যাক্স পরিশোধ না থাকলে ট্যাক্সের টাকা পৌরসভায় জমা দিয়ে সেই পরিশোধের কাগজের ফটোকপি নিয়ে গেলে পাওয়া যেত। কোন প্রকার হয়রানির শিকার হতে হয়নি। এখন অনলাইনে আবেদন করতে হয়। অনেক কাগজের সাথে অতিরিক্ত বিবাহের কাবিন নামার ফটোকপি দিতে হয়। ট্যাক্সের টাকা পরিশোধ না থাকলে ব্যাংকে জমা দিতে হয় যা আগে পৌরসভায় দেওয়া হতো। এখন অতিরিক্ত ঝামেলা, আবার নাগরিক সনদপত্র পেতেও সাতদিনের উপর সময় লাগছে। জরুরি প্রয়োজনে নাগরিক সনদপত্র পাওয়া যাচ্ছে না। নাগরিক সনদপত্রসহ অন্যান্য সেবা যেন সহজভাবে পাওয়া যায় সেজন্য প্রশাসনের নিকট জোর দাবী জানাচ্ছি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পৌর এক কর্মকর্তা বলেন, বেশী কথা বলবো না-আগে এই পৌরসভায় শর্তমুক্ত সেবা ছিল, এখন শর্তযুক্ত চলছে। বিভিন্ন কারণে সেবা গ্রহিতার সংখ্যায় কমেছে। প্রেক্ষিতে পৌরসভার আয়ও কমেছে। তবে পৌরসভার পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এই পরিস্থিতিতে নওহাটা পৌরসভার নাগরিক সেবার মান এবং কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে সমালোচনার সৃষ্টি হচ্ছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে নওহাটা পৌরসভার প্রশাসক ও পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরাফাত আমান আজিজের মোবাইল ফোনে সরকারি নম্বারে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।


আরোও অন্যান্য খবর
Paris