ইউসুফ চৌধুরী : তাল গাছের বৈজ্ঞানিক নাম-ইড়ৎধংংঁং ঋষধনবষষরভবৎ এবং ইংরেজি নাম-চধষসুৎধ চধষস. প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবেলায় ‘বজ্র প্রতিরোধক’ (বৈদ্যুতিক আর্থিং) নামে খ্যাত গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য তালগাছ সচেতনতার অভাবে এখন বিলুপ্তির দিকে। পরিবেশ বান্ধব তাল গাছ প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা ও বজ্রপাত প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গাছ উঁচু হওয়ায় বজ্রপাত সরাসরি এ গাছের মাধ্যমে মাটিতে চলে যায়। প্রতি বছর অত্যাধিক বজ্রপাতের ফলে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। বজ্রপাত শোষনকারী গাছ হিসেবে গুরুত্বপূর্ন তাই প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় তালগাছের বিকল্প নেই। গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য রক্ষা ও শোভাবর্ধনেও জুড়ি মেলা ভার। তাল গাছ প্রকৃতি সাজাই জীবন বাঁচাই। এমন পুষ্টি ও ঔষধি গুণাগুণের গাছ খুব কমই আছে।
তাল গাছ লম্বায় ৩০ থেকে ১০০ ফুট পর্যন্ত উঁচু হয়। প্রায় ১৪০ থেকে ১৫০ বছর বয়স পর্যন্ত দীর্ঘজীবী হয়। তালগাছের বৃদ্ধি ধীর গতি সম্পন্ন। বীজ রোপনের ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সে গাছে ফল ধরে। তাল গাছ দুই প্রকার হয় পুরুষ ও মেয়ে। মেয়ে তালগাছের চাইতে পুরুষ তালগাছের চাহিদা বেশি। তাল একটি গ্রীষ্মকালীন ফল, বিভিন্নভাবে খাওয়া যায়। তালের ফল, রস, বীজ ও শাঁস সবই সুস্বাধু খাদ্য। তাল গাছের মোচা থেকে রস সংগ্রহ করে গুড়, পাটালি, মিছরি, ভিনেগার, খির, পায়েস তৈরি করা হয়। কচি অবস্থায় বীজের ভিতরের অংশ হলো তাল শাঁস যা পুষ্টিতে ভরপুর ও খেতেও ভারি মজার। তাল শাঁসের মধ্যে থাকা পানি শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। পাকা তাল খেতে খুবই সুস্বাদু যা বাঙ্গালির ঐতিহ্যের সাথে জড়িত। তালের ঘন নির্যাস থেকে তাল ফুলোরি, তালের তৈরি রুটি, লুচি, বড়া, তালসত্বসহ বিভিন্ন পিঠাপুলি তৈরি করা হয়। পাকা তাল খাওয়ার পর আঁটি কিছুদিন রেখে দিলে তার ভেতর সাদা শাঁস হয়, তা কাঁচা ও তরকারি হিসেবে রান্না করে খাওয়া যায়।
তালের কাঠ খুবই মজবুত হওয়ার কারণে ঘরের খুঁটি কিংবা আড়া দিয়ে তৈরি ঘরও শক্ত হয়। তালগাছের গোড়ালি দ্বারা বাড়িঘর, দোকানপাট, দোচালা খাড়া টিনের ঘর, ডিঙ্গি নৌকা, গরুর গাড়ির ধুরি তৈরিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও ব্রাশ, পাপোষ, ছোট বাষ্কেট, মাছ ধরার খলশান, তালের লম্বা জট পুড়িয়ে দাঁতের মাজন হয়, পাতা দিয়ে ঘরের ছাউনি, তাল পাতার পাটি, হাতপাখা, চাটাই, মাদুর, টুপি, ঝুড়ি, বাচ্চাদের বিভিন্ন প্রকারের খেলার পুতুল, হরেক রকমের সৌখিন সামগ্রী তৈরিসহ লাকরী (জালানি খড়ি) হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর কোন অংশই ফেলতে হয় না। তালের ছোবড়া থেকে নেট জাল তৈরি করেছে নতুন এক সম্ভাবনা।
পবা উপজেলার তেতুলিয়া গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, তাল গাছ রোপনে জমি নষ্ট হয় না। শিকড় মাটির নিচ পর্যন্ত প্রবেশ করায় গাছ মজবুত হয় ফলে ঝড়ে, বন্যায় ভাঙ্গে না। তাল গাছের শীতল ছায়ায় কৃষক, শ্রমিক ও পথচারীরা বিশ্রাম করে। রাখাল বালকদের বাঁশের বাঁশিতে ফুটে উঠে চিরচেনা গ্রাম বাংলার গানের সুর। তাল গাছের সব অংশই মানুষের উপকারে আসে।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মোছাঃ উম্মে সালমা বলেন, রাজশাহী জেলায় ২২১ হেক্টর জমিতে তাল গাছ রয়েছে। তাল গাছ খরা ও বন্যা সহনশীল এবং পরিবেশ বান্ধব গাছ। গ্রামীণ সড়ক, মহাসড়ক, বাঁধ-বেড়িবাঁধ, রেল লাইন, পুকুর পাড়, খাল-বিল ও নদীর ধার, জমির আঁইল, পতিত জমি ও বসতবাড়ীর আঙ্গিনায় তালগাছ রোপন করা হয়। প্রায় সব ধরনের মাটিতে তাল গাছ জন্মে। রোপন পদ্ধতি সহজ, কষ্ট সহিষ্ণু, কম যত্নে উৎপাদন ও বৃদ্ধি হয় এবং পরিচর্যা কম করতে হয়। তাল গাছ কৃষক, শ্রমিক ও পথচারীদের ছায়া দেয়। তালগাছ কাটা হলেও রোপণ করা হচ্ছে কম। তাল গাছ রোপনের জন্য কৃষি বিভাগ কৃষকদের উৎসাহিত করছে। মাঠপর্যায়ে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের যথাযথ পরামর্শ, প্রত্যক্ষ কারিগরি সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন।
সামাজিক বন বিভাগ রাজশাহীর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোঃ রফিকুজ্জামান শাহ্ বলেন, বাড়ির পাশে, রাস্তার ধারে, পুকুর পাড়ে, জমির আইলে, মাঠ-ঘাট, পথে-প্রান্তরে অপরূপ সৌন্দর্যের অঞ্চল এই বরেন্দ্র ভূমিতে দূর-দূরান্ত থেকে লাইন ধরে সারি সারি তালের গাছ দেখা যেত। কালের বিবর্তনে, আবহাওয়ার বিরুপ প্রভাবে ও জনসচেতনতার অভাবে আবহমান গ্রাম বাংলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে তালের গাছ। তাল গাছের গুচ্ছমূল মাটির গভীরে যায় ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর উপরে উঠে আসে। বায়ুপ্রবাহের গতিনিয়ন্ত্রণ করে মেঘ ও বৃষ্টিপাত ঘটাতে সাহায্য করে, মাটির উর্বরতা শক্তি বাড়ায় এবং ভূমি ক্ষয় ও ভূমিধস রোধ করে। ইতিপূর্বে বৃহত্তর রাজশাহীর চারটি জেলার ৩২টি উপজেলায় তিন লক্ষ তালের চারা লাগানো হয়েছে। আগামীতে আরো লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বজ্রপাত থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রাকৃতিক ব্যবস্থা হিসেবে তালগাছ গুরুত্বপূর্ন ভুমিকা পালন করে। গাছ উঁচু হওয়ায় বজ্রপাত শোষন করে তা সরাসরি গাছের মাধ্যমে মাটিতে চলে যায়। বজ্রপাত এখন আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দুর্যোগ থেকে পরিত্রাণের জন্য তালগাছ লাগানোর উদ্যোগকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে।
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ফোরামের সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী জুনায়েদ আহমেদ বলেন, তালগাছ বাবুই, অঞ্জন ও বাদুরসহ বিভিন্ন কীটপতঙ্গের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। তালগাছে কার্বনের স্তর বেশি থাকায় তা বজ্রপাত নিরোধে সহায়তা করে। তালগাছের উচ্চতা ও গঠনগত দিক থেকেও বজ্রপাত নিরোধে সহায়ক। প্রতিনিয়ত যে হারে তালগাছ কাটা হচ্ছে সে অনুযায়ী তালগাছের চারা কেউ রোপন করছে না। নির্বিচারে নিধনের ফলে প্রকৃতি পরিবেশ হারাচ্ছে অপরূপ সৌন্দর্য, ঝুঁকিতে রয়েছে মানুষ, পশুপাখিসহ জীববৈচিত্র্য। তালগাছ কাটা বন্ধের পাশাপশি অধিক পরিমাণে তালবীজ রোপণ করা গেলে প্রকৃতি ফিরে পাবে তার হারানো ঐতিহ্য, সাথে নিশ্চিত হবে আগামীর খাদ্য পুষ্টি, অর্থ ও সমৃদ্ধি। কৃষি বিভাগ, বন বিভাগ ও জেলা প্রশাসনসহ সর্বস্তরের জনগণ তালগাছ রক্ষায় সচেষ্ট হলেই আগের রূপে ফিরে আসবে পরিবেশ, গড়ে উঠবে পাখিদের অভয়াশ্রম।
পবা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ মোহাঃ আসাদুজ্জামান বলেন, তালের রস বলকারক পুষ্টি ও ঔষধিগুন সমৃদ্ধ এবং সুস্বাদু। তালের রস শ্লেষ্মানাশক এবং রস থেকে তৈরি তালমিছরি সর্দি কাশির মহৌষধ। কোষ্ঠকাঠিন্য, যকৃতের দোষ নিবারক ও পিত্তনাশক হিসেবে কাজ করে এবং পেটের জ্বালাপোড়াসহ কয়েক প্রকারের রোগ দূর করে। তালের শাঁস শিশু ও প্রাপ্ত বয়স্কদের পুষ্টির অভাব এবং মুখের অরুচি ও বমি ভাব দূর করে। শরীরে শক্তি জোগায় ও ঠান্ডা রাখে এবং রক্তশূন্যতা দূর ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। প্রচুর ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস আছে যা দাঁত ও হাড়ের গঠন মজবুত করে। অতিরিক্ত গরমে এসিডিটি, কোষ্ঠকাঠিন্য, লিভার ও ঘামাচিসহ বিভিন্ন সমস্যা দূর করে। পাকা তালে ভিটামিন এ, বি, সি, জিংক, পটাশিয়াম, আয়রন, ক্যালসিয়ামসহ অ্যান্টি-অক্সিজেন ও অ্যান্টি-ইনফ্লামেটরির মতো প্রয়োজনীয় উপাদান রয়েছে। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে, হজম শক্তি বাড়ায়, ত্বক ভালো থাকে, চোখের দৃষ্টি শক্তি বৃদ্ধি করে। স্মৃতিশক্তি ও স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ও ক্যানসার প্রতিরোধে কার্যকরী ভূমিকা রাখে। তিনি আরোও বলেন, রস সংগ্রহ ও নামানোর সময় গাছিদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। রস আহরণের সময় বাদুড় যেন পাত্রে বসতে না পারে কারণ তাঁর লালা ও মল থেকে প্রাণী ও মানুষের মধ্যে নিপাহ ভাইরাস ছড়ায়। সেজন্য সচেতনতার সহিত গাছের কান্ড ও রস সংগ্রহের হাঁড়ি বা পাত্রের মুখে বাঁশের খাঁচা, মশারি বা কাপড় বেঁধে দিয়ে ঢেকে নিতে হবে। রসের অপব্যবহার করে খাওয়াও নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। তাই রস কাঁচা অবস্থায় না খেয়ে ফুটিয়ে খাওয়া ভাল।
পবা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসার প্রকৌশলী মোঃ আবু বাশির বলেন, বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রকৃতি হয়ে উঠছে বিরাগভাজন। তাল গাছ কমে যাওয়ায় মানুষ অত্যাধিক ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। সময় মতো বৃষ্টি না হওয়া, আবার অতিবৃষ্টি ও বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। বজ্রপাতের সম্ভাবনা থাকলে সতর্ক হতে হবে। কোনো অবস্থাতে খোলা বা উঁচু জায়গায় যাওয়া যাবে না। উঁচু গাছপালা ও বিদ্যুৎ এর লাইন থেকে দূরে থাকতে হবে। বজ্রপাতের সময় খোলা জায়গায় বা ফসলের মাঠে কাজ করা অবস্থায় আশ্রয়ের জায়গা না থাকলে যতটা সম্ভব নিচু হয়ে কানে আঙুল দিয়ে বসে পড়তে হবে। রাস্তায় থাকলে বাড়ি বা পাঁকা ছাউনির নিচে আশ্রয় নিরাপদ। জানালা বন্ধ রাখতে হবে। ধাতববস্তু এড়িয়ে চলতে হবে। বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করতে হবে। জলাশয় থেকে দূরে থাকতে হবে। ঝড় বৃষ্টির পূর্বাভাসের জন্য প্রতিদিন আবহাওয়া বার্তা জানতে হবে। এছাড়া ১০৯০ তে কল দিলে আবহাওয়া বার্তা জানা যায়।
সমাজকর্মী ও ইউসেপ বাংলাদেশ রাজশাহীর আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক মোঃ শাহিনুল ইসলাম বলেন, তালগাছ প্রকৃতির বন্ধু ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যরক্ষাকারী বৃক্ষ। বাঙালির ঐতিহ্যে জড়িয়ে রয়েছে তালগাছ। সবুজের সমারোহ খ্যাত তাল গাছে পাখিরা কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত থাকে। প্রকৃতির শিল্পী ও সুনিপুণ কারিগর বাবুই পাখি তৈরী করে অসংখ্য দৃষ্টিনন্দন বাসা। আগের মতো তালগাছে এসব দেখা যায় না। সচেতনতার অভাবে তালগাছ হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমান্বয়ে। সরকারিভাবে তালগাছ রোপনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণসহ নানা কারণে গাছগুলো আর বেড়ে উঠতে পারে না। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ে তুলতে তাল গাছ রোপণ এবং সংরক্ষণে সকলকে দায়িত্বশীল হতে হবে।
বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজিনাস নলেজ (বারসিক) এর পরিবেশ আইন গবেষক ও আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মোঃ শহিদুল ইসলাম বলেন- তালগাছ শুধু একটা গাছই নয়, এর সাথে আমাদের সকলের সম্পর্ক মিথস্ক্রিয়া হয়, গাছ বৃক্ষ আমাদের পরিবারের মতো, এখানে পাখিরা যেমন বাসা বাধে খাবার সংগ্রহ করে তেমনি মানুষও এর থেকে উপকৃত হয়, সবই আমাদের জীবন ও সাংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। খরা প্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলে ভৌগোলিক কারনেই এখানে তাল খেজুরের গাছ বেশি হয়। কিন্তু খুবই দুঃখজনক যে আমাদের এসব গাছ কমে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ এর লাইনের অজুহাতে রাস্তায় অনেক গাছ কাটা পড়ে, অন্য দিকে সরকার এ সকল গাছ সংরক্ষণে কোন বিশেষ উদ্যোগ নেয়নি। তিনি আরো বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলের তাল, খেজুর এবং বড় বড় বৃক্ষ গুলো রক্ষায় আইন বিধি নীতিমালা তৈরি ও প্রয়োগ জরুরি হয়ে পড়েছে। এগুলো সুরক্ষা না করলে আগামীতে এই অঞ্চল আরো পরিবেশ ভারসাম্যহীন হয়ে পড়বে। একই সাথে বজ্রপাত বাড়বে, খরা বাড়বে, বৃষ্টিপাত আরো কমবে।