২৮ অক্টোবর ২০২৬
বিজ্ঞাপন
Amader Rajshahi

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়করা বললেন, ‘আমরা সবাই এক কাতারে’

প্রকাশিত: ১৯ আগস্ট ২০২৪, ৯:২৮ অপরাহ্ণ | বিভাগ: স্পেশাল নিউজ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়করা বললেন, ‘আমরা সবাই এক কাতারে’
বিজ্ঞাপন

শাহানুর রহমান রানা : বাংলাদেশে কোটা সংস্কারের লক্ষ্যে ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে চার দফা দাবিতে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা লাগাতার কর্মসূচি দেয়। একেরপর এক কর্মসূচির কারণে কোণঠাসা হয়ে পড়ে তৎকালিন আওয়ামী সরকার। অবশেষে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির মধ্যদিয়ে চুড়ান্ত বিজয় অর্জন করে আন্দোলনকারিরা। দিনটি ছিল ৫ আগস্ট সোমবার। আন্দোলনকারিদের অদম্য সাহস আর অধিকার আদায়ে সোচ্চার ভূমিকার জন্য শেখ হাসিনাসহ অধিকাংশ মন্ত্রী-এমপি পলায়ন করে। ছাত্রদের এই আন্দোলন দেশেরগন্ডি পেরিয়ে স্থান করে নেয় বিশ^ ইতিহাসের পাতায়। গত ২৮ জুলাই কেন্দ্রের সিদ্ধান্তনুযায়ী ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ এর ব্যানারে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের ১৭ সদস্যের একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়। উক্ত কমিটির সমন্বয়করা হলেন গোলাম কিবরিয়া চৌধুরী মিশু, মাসুদ রানা, মেহেদী হাসান মুন্না, নওসাজ জামান, তানভীর আহমেদ রিদম, মেহেদী সজীব, আকিল বিন তালেব, ফুয়াদ রাতুল, ফাহিম রেজা, তাসিন খান, মেহেদী হাসান মারুফ, ফৌজিয়া নৌরিন, সালাউদ্দিন আম্মার, মৃত্তিকা, মাহাদী হাসান মাহির, নুরুল ইসলাম শহীদ ও আতাউল্লাহ। উল্লেখ্য, এর আগে রাবি’র পূর্ববর্তী কমিটির নেতারা সুবিধাভোগীদের মদদপুষ্ট হয়ে আন্দোলন থেকে সরে দাড়ানোর ঘোষনায় সেই কমিটি বিলুপ্তি ঘোষণা করেছিল কেন্দ্র। দেশের বিভিন্নস্থানের সমন্বয়ক ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হবার কারণে অনেকেই পদত্যাগ করেছেন। আবার কোথাওবা সাধারণ শিক্ষার্থী কর্তৃক অবাঞ্চিত হয়েছেন সমন্বয়করা। গত ১৬ আগস্ট বিকেলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) সাংবাদিক সমিতির কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিং করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে সমন্বয়ক ও সহ-সমন্বয়ক সহ মোট ৫ জন পদত্যাগ করেন। এরা হলেন, সমন্বয়ক সুমাইয়া সিকদার, সহ-সমন্বয়ক আল-মাশনূন, ধ্রুব বড়ুয়া, সাইদ্যুজামান রেদুয়ান ও ঈশা দে। প্রসঙ্গত, গত ৩০ জুলাই ২২ জন সদস্য করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক কমিটি ঘোষণার করে পরবর্তীতে নিরাপত্তাজনিত কারণে কমিটি বাতিল ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক মোহাম্মদ রাসেল আহমেদ। এরপর ৫ আগস্ট মোট ৩০ জনকে সদস্য করে পুনরায় সমন্বয়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়।
এদিকে, গত ১৫ আগস্ট নেতৃবৃন্দের মধ্যে বৈষম্য তৈরির অভিযোগকে ঢাল করে যশোরে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক পদ নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। সাধারণ শিক্ষার্থী ও সমন্বয়কদের একাংশ থেকে হুশিয়ারি আসে বয়কটের। ঐদিন দুপুরে যশোর প্রেসক্লাব মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন এই দাবি জানান বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন একাংশের নেতৃবৃন্দ। একইদিন ১৫ আগস্ট বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারন শিক্ষার্থীরা অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের। বৃহস্পতিবার (১৫ আগস্ট) রাতে এক বিজ্ঞপ্তিতে তারা এমনই ঘোষনা দিয়েছেন। এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কোটা আন্দোলনের সমন্বয় কমিটি চায় না বলে জানিয়ে দেন শিক্ষার্থীরা। এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষার্থীরা এই দাবি করেছেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বয় কমিটিকেও অবাঞ্চিত ঘোষণা করে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তবে, যেসকল স্থানে সমন্বয়ক অবাঞ্চিতের ঘোষণা ও দ্বন্দ্ব ছড়িয়ে পড়েছে ঐসকল স্থানে সুবিধাবাদি কোন তৃতীয়পক্ষ নিজেদের স্বার্থে পরিবেশ ঘোলাটে করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছেন বলে মন্তব্য আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী ও সমন্বয়কদের।
৬ আগস্ট মঙ্গলবার দিনক্ষণ পূর্বনির্ধারিত থাকলেও অবশেষে একদিন আগেই ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির পালনের সিদ্ধান্ত আসে কেন্দ্রের সমন্বয়কদের পক্ষ থেকে। তৎকালিন সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর কারফিউ এর ঘোষণা আশার পরেও ছাত্ররা সকল ভয়ভীতিকে উপেক্ষা করে আন্দোলন চলমান রাখার ঘোষণা দেন ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির মাধ্যমে। ৫ আগস্টের সেই কর্মসূচীকে আরোবেশি বেগবান করতে শিক্ষানগরী রাজশাহীর সমন্বয়করা আওয়ামী লীগের অস্ত্রধারি সন্ত্রাসী ও অস্ত্রেসজ্জিত যৌথবাহীনির ঝুঁকিপূর্ণবাঁধা উপেক্ষা করে নিজেদের কর্মসূচি পালন করেছেন। ঐদিন রাজশাহীতে একাধিক শিক্ষার্থীর প্রাণহানির ঘটনা সহ অসংখ্য শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকারি আহত হয়েছে। এর আগে ছাত্র হত্যা, নির্বিচারে গ্রেফতার ও শিক্ষক লাঞ্চিতের ঘটনায় ১ আগস্ট ছাত্র সমাজের ৯ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা আসে কেন্দ্র থেকে। তারই ধারবাহিকতায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’ কর্মসূচি হিসেবে দেয়াল লিখন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ বুদ্ধিজীবী চত্বরে গ্রাফিতি অঙ্কন করে শিক্ষার্থীরা। সমন্বয়কদের আচরণ ও অধিকার আদায়ে স্বার্থহীন কর্মকান্ড দেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক তাদের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে। একেরপর এক দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠনামে খ্যাত বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয়ে সমন্বয়কদের পদত্যাগ ও অবাঞ্চিতের ঘটনা ঘটছে; তারই ধারাবাহিকতায় রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের সমন্বয়ক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোন দ্বন্দ্ব বা বিপরীতমূখী প্রতিক্রিয়া ঘটার কোন সঙ্কা অনুভব করছেন কি প্রশ্নের জবাবে রাবি’র সমন্বয়ক মাসুদ রানা বলেন, বিশ^বিদ্যালয়ে যারা সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছেন তারা যেনো কোন ক্রমেই নিজ নিজ হলগুলোতে কোন প্রকার প্রভাব না খাঁটায়। কেউ যেনো নিজের রুমের দড়জাতে সমন্বয়ক ব্যানার বা স্টিকার না লাগায়। কারণ, আমরা সকলে মিলে সকলের জন্য এককাতারে কাজ করেছি। এখনো আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়নি। তবে, যেসকল বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে সমন্বয়ক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে, কিংবা যারা এপর্যন্ত পদত্যাগ করেছে তারা নিদিষ্ট কোন একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে সুবিধা নেবার অপচেষ্টায় লিপ্ত ছিল। এছাড়াও তৃতীয় কোন পক্ষ কৌশলে আমাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি একটি অপপ্রয়াস চালাচ্ছে বলেও আমার মনে হয়। রাজশাহীতে এমন কোন সমস্যা আগেও ছিলনা, এখনো নেই। আমরা সকল শিক্ষার্থীর কাছেই গ্রহণযোগ্যতা অর্জনে সক্ষম হয়েছি। আমরা এখনো অনগোয়িং প্রসেস এ আছি।
আরেক সমন্বয়ক মেহেদী হাসান মুন্না বলেন, আমরা প্রথম থেকেই সকলের অধিকার নিয়ে কাজ করছি। দায়িত্ব নিতে চায়না। দায়িত্ব নিয়ে কাজ করাটা বেশ চ্যালেঞ্জিং। রাজশাহীতে তেমন কোন সমস্যা নেই। ক্যাম্পাসে পুলিশ প্রবেশ করতে পারছিলনা পরে আমরা গিয়ে তাদেরকে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করাতে সহোযোগিতা করি। ক্যাম্পাসের সকল শিক্ষার্থীর সাথে আমাদের সম্পর্ক বেশ ভাল। আন্দোলনের যাত্রাকাল থেকে শুরু করে এখন অবদি রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের সমন্বয়ক ও শিক্ষর্থীদের ভূমিকা ছিল অপ্রতিরোধ্য। সকলেই যেনো অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছিলেন এককাতারে অবস্থান নিয়ে। কে সমন্বয়ক আর কে সাধারণ শিক্ষার্থী? সেটির প্রতি কোন দৃষ্টি ও ভ্রুক্ষেপ ছিল না এই আন্দোলনে। রাবি’র সকল শিক্ষার্থীই এই আন্দোলনে সমান অধিকার ও দায়িত্ব নিয়ে মাঠে ছিলেন। এখনো সেই ধারবাহিকতাই রয়েছে রাবি ক্যাম্পাসে বলে মন্তব্য সাধারণ শিক্ষার্থীদের।

পাঠকদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন