শাহানুর রহমান রানা : নিয়মমাফিক সার্বিক কাজের অগ্রসরের ভিত্তিতে পাঁচ বছর আগেই শিশুরোগী চিকিৎসার সর্বোচ্চ সেবাকেন্দ্র রাজশাহী শিশু হাসপাতালের দ্বার উন্মেচিত হবার কথা থাকলেও; আজও সেই সেবা চালুই করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। শিশু হাসপাতালের যাত্রা তো দূরের কথা; নির্মিত ভবনটি দেড়বছর আগে উদ্বোধন হলেও সেটি আজও হস্তান্তর হয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে। কোন প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার কাছে ভবনটি হস্তান্তর করা হবে সেটিও সিদ্ধান্তের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে আছে দীর্ঘ সময় ধরে। বিষয়টি নিয়ে কেউ কোন সদুত্তর দিতে পারছেনা। বাতাসে ভাসমান মেঘের মতো উত্তর আসছে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে। প্রথম মেয়াদে কাজের ব্যয় ১৩ কোটি ধরা হলেও কয়েক দফায় মেয়াদ বৃদ্ধি পাওয়াতে অবশেষে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৪ কোটি টাকা বলে জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র।
ভবন নির্মাণ সংশ্লিষ্ট প্রকল্প মেয়াদের বিষয়টি পরিবর্তন হয়েছে তিন থেকে চারবার। ২০১৮ সালে ভবন নির্মাণ কাজ শেষ হবার কথা থাকলেও; ২০২৩ সালে এসে সম্পন্ন হয় ভবন নির্মাণের কাজ। ঐবছরের ২৯ জানুয়ারি নির্মিত ভবনটি আনুষ্ঠানিক ভাবে উদ্বোধন হয়। দেড়বছর আগে ভবন উদ্বোধন হলেও, রুদ্ধবস্থায় পড়ে আছে হস্তান্তর ও চিকিৎসাসেবার বিষয়টি। ২৭ হাজার স্কয়ার ফিটের আধুনিক এই হাসপাতাল ভবনটি এখন শুধুই দর্শনধারি স্থাপনা হয়ে দাড়িয়ে আছে। স্থানীয়দের দেয়া তথ্য মতে, হাসপাতালের উন্মুক্তস্থানগুলোতে চলে মাদকসেবিদের মাদকসেবন। সরেজমিনে গিয়ে সেটির সত্যতাও পাওয়া যায়। মাঠের ঘাসগুলোর ভেতরে যত্রতত্র পরে আছে ফেনসিডিল ও মদের বোতল। প্রধান ফটকের পাশের পকেট গেটটি প্রায় সার্বক্ষণিকই খোলা থাকে। কোন প্রকার বাঁধাবিঘ্ন ও কৌফিয়ত ছাড়াই যে কেউ প্রবেশ করতে পারে হাসপাতালের বাউন্ডারির ভেতর।
জানতে চাইলে রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. আবু সাইদ মোহাম্মদ ফারুক জানান, কয়েকদিন আগে এই বিষয়টি নিয়ে আমরা একটি মিটিং করেছি। চালু না হওয়া পর্যন্ত নতুন নির্মিত ভবনটির দেখভাল ও রক্ষনাবেক্ষনের বিষয়টিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং। এছাড়াও দেড় মাস পূর্বে জনবল সংশ্লিষ্ট একটি চাহিদাপত্র ও পূর্ণাঙ্গ একটি অর্গানোগ্রাম সংশ্লিষ্ট চিঠি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে আমরা প্রেরণ করেছি। দেশের উদ্ভুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে প্রেরিত চিঠিটির কতখানি অগ্রগতি হলো সেই বিষয়ে আমরা খোঁজখবর নেবো।
নবনির্মিত ২০০ শয্যার এই শিশু হাসপাতালটিতে চিকিৎসা সেবা শুরু না হবার কারণে শিশু রোগী সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে, কষ্ট আর ভোগান্তি সহ্য করতে হচ্ছে শিশু ও অভিভাবকদের। কোন প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার কাছে নবনির্মিত এই শিশু হাসপাতালটি হস্তান্তর করবে গণপূর্ত বিভাগ, সেটি নিয়ে দেড় বছর যাবদ চলছে দাপ্তরিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। চিঠি চালাচালি আর সিদ্ধান্তহীনতার ভেতরে ডুব মেরে বসে আছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলে মন্তব্য সচেতন মহলের। কেনো এই দাপ্তরিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা; কেনোইবা শিশুর চিকিৎসেবার মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর এমন বিষয়টি নিয়ে এতো দীরগতি, এতো অবহেলা? এমন প্রশ্ন এখন নগরবাসির।
সূত্র মতে, পূর্ণাঙ্গ শিশু হাসপাতাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। সে অনুযায়ী হাসপাতাল নির্মাণ শুরু করে গণপূর্ত বিভাগ। ২০১৫ সালের মে মাসে ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু শুরুতেই নকশা নিয়ে দেখা দেয় জটিলতা। প্রথমে ১০ তলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও পরে তা নেমে আসে চার তলায়। ১০ তলা ভবনটি করার পরিকল্পনা ছিল ১৬ হাজার বর্গফুটের। এটি পরিবর্তন করে ২৭ হাজার বর্গফুট করা হয়। এ নকশা সংশোধনের পর কাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৮ সালের জুনে। পরে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। তাতেও কাজ শেষ না হওয়ায় ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। এরপর আবার ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ে। ওই মেয়াদ পার হওয়ার পর বছরখানেক আগে ২০২৩ সালে কাজ শেষ হয়েছে।
ভবনটি হস্তান্তর ও হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা শুরু হবার বিষয় সম্পর্কে জানতে চাইলে রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. আনোয়ারুল কবীর বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার হাজারো স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, হাসপাতাল নিয়ে কাজ করে। তাই তাদের ব্যস্ততার পরিধিও অনেক। কিন্তু এরপরেও, বিভাগীয় শহরে নবনির্মিত এই হাসপাতালটি গুরুত্বের বিবেচনায় ‘প্রায়োরিটি (অগ্রাধিকার)’ পাবার বিষয়টিও বেশ জরুরী। বিষয়টি নিয়ে আমরা মিটিং করেছি। আশাকরি মন্ত্রণালয় বিষয়টি যথাসম্ভব সমাধান করবেন। শিশু হাসপাতালটি কোন প্রতিষ্ঠান কিংবা সংস্থার কাছে হস্তান্তর করতে পারে কিংবা করা উচিত বলে আপনি মনে করেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয় যেটি ভাল মনে করবেন সেটিই করবেন। তবে, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কাছেই হস্তান্তর করা বেশি শ্রেয় হবে বলেই আমি মনে করি। কারণ, স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট সকল সেক্টরে তাদের পরিপূর্ণতা আছে। আর অন্যভাবে বলতে গেলে, মন্ত্রণালয় যদি মনে করেন যে, এটিকে বিশেষায়িত ও সতন্ত্র হিসেবে পরিচালনা করবেন তাহলে টিবি হাসপাতালের মতোও আলাদা একটি স্বতন্ত্রতা দিতে পারে। সেক্ষেত্রে এটির পরিচালনার দায়িত্ব স্বতন্ত্রই থাকবে, অন্যকোন প্রতিষ্ঠানের সাথে অন্তর্ভূক্তি হিসেবে থাকতে হবেনা। তবে, আমার ব্যক্তিগত অভিলাষ হলো, অতিদ্রুত বিভাগীয় শহর রাজশাহীতে শিশু হাসপাতালটি চালু করা হোক। নগরীর সচেতন ব্যক্তিরা এবিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়া হাসপাতাল ভবনটি হস্তান্তর সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক বিষয়টি একধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মধ্যেই পড়ে। এই ধরনের জটিলতা যতদ্রুত সম্ভব ওভারকাম করতে না পারলে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির ক্ষতিসহ রাষ্ট্রযন্ত্রের উপর মানুষের আস্থা ক্রমশই হ্রাস পাবে।