শহিদুল ইসলাম, গোদাগাড়ী : রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে সরকারি পুকুর ইজারায় ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া অভিযোগে বলা হয়েছে, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে গোপনে পানির দরে পুকুর ইজারা দেওয়া হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ইজারায় জালিয়াতির আশ্রয়ও নেওয়া হয়েছে। ফলে গোদাগাড়ীর প্রায় তিন হাজার খাসপুকুর ইজারায় এক বছরে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে ছয় কোটি টাকার বেশি। এ ঘটনায় উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার ও এসি ল্যান্ড জড়িত বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। গোদাগাড়ীর নারায়ণপুর এলাকার মৎস্য চাষি ইসমাইল হোসেন অভিযোগটি দিয়েছেন।
জানা গেছে, গোদাগাড়ীতে ইজারাযোগ্য খাসপুকুর রয়েছে তিন হাজারের কিছু বেশি। নীতিমালা অনুযায়ী শুধু নিবন্ধিত মৎস্যজীবী সমিতিগুলোকেই খাসপুকুর ইজারা দেওয়ার নিয়ম। বাংলা ১৪৩১ সনের জন্য ১৮ এপ্রিল উপজেলা জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটি দুই হাজার ৭৪৯টি খাসপুকুর ইজারার নোটিশ জারি করে। নির্ধারিত সময় পর্যন্ত মাত্র ৩১৪টি শিডিউল বিক্রি হয়।
উপজেলা ভূমি অফিস থেকে ২০ জুন যোগ্য দরদাতাদের তালিকা প্রকাশ করা হয়। তবে তা ৩০ মে স্বাক্ষরিত। অভিযোগ মতে, মাত্র ৩১৪টি শিডিউল বিক্রি হলেও জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটি দুই হাজার ৭৪৯টি পুকুর ইজারা গ্রহীতার নামের তালিকা প্রকাশ করে। অভিযোগকারী ইসমাইল হোসেন জানান,শিডিউল বিক্রি হয় মাত্র ৩১৪টি,বাকি৭১৫টি শিডিউল টাকার বিনিময়ে গোপনে জমা দেখান ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার মোক্তারুজ্জামান। বড় বড় পুকুরগুলোতে যাতে একাধিক দরদাতা না থাকে সেজন্যই সার্ভেয়ার এই জালিয়াতির আশ্রয় নেন।
ইজারা নোটিশে প্রতিটি পুকুরের সম্ভাব্য সরকারি বার্ষিক ইজারা মূল্য উল্লেখ করা হয়। কিন্তু অধিকাংশ পুকুরই ইজারা দেওয়া হয়েছে সরকারি দরের অনেক কম দামে। সাগুয়ান মৌজার ১২ দশমিক ১৪ একরের তিনটি খাসপুকুরের ভ্যাট ও আয়করসহ এক বছরের সম্ভাব্য সরকারি ইজারা মূল্য ছিল ৬৬ লাখ ১৩ হাজার ৩১২ টাকা। তিন বছরের ইজারা মূল্য দাঁড়ায় এক কোটি ৯৮ লাখ ৩৯ হাজার ৯৩৬ টাকা। কিন্তু ইজারা কমিটি এই তিনটি পুকুর গোপনে ইজারা দিয়েছে মাত্র দেড় লাখ টাকায়। অথচ মামলা আছে জানিয়ে পুকুরগুলো ইজারা তালিকায় তোলাই হয়নি।
সাগুয়ান মৌজার ৪৩১নং দাগে শূন্য দশমিক ৯৯ একর পুকুরে মামলা জটিলতা রয়েছে বলে তথ্য প্রকাশ করা হলেও সেটি বার্ষিক মাত্র পাঁচ হাজার টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। এই পুকুরটির বার্ষিক সম্ভাব্য ইজারা মূল্য ৯৪ হাজার ৫০০ টাকা। তিরিন্দা মৌজার ৫১ দাগের ২ দশমিক ৫৪ একর আয়তনের পুকুরটির সম্ভাব্য বার্ষিক ইজারা মূল্য ৭২ হাজার ৪৫০ টাকা। পুকুরটি সার্ভেয়ার মোক্তারুজ্জামান এক ব্যক্তিকে দিয়ে ভোগ করাচ্ছেন ইজারা ছাড়াই। মামলা রয়েছে অজুহাতে এই পুকুরটি এবার কাউকে ইজারা দেওয়া হয়নি। যদিও পুকুরটি নিয়ে কোনো মামলা নেই।
জানা গেছে, সেখপুর মৌজার ৪৫নং দাগের ৩ দশমিক ৯১ একর আয়তনের পুকুরটির সম্ভাব্য সরকারি মূল্য সাত লাখ ১০ হাজার টাকা হলেও এবার ইজারা দেওয়া হয়েছে মাত্র ১৫ হাজার টাকায়। একই মৌজার ৯নং দাগের ২ দশমিক ৩০ একরের পুকুরের সরকারি মূল্য চার লাখ ১১ হাজার টাকা। এই পুকুর ইজারা দেওয়া হয়েছে মাত্র সাড়ে সাত হাজার টাকায়। দৌগাছি মৌজার ৩ দশমিক ৬২ একর আয়তনের পুকুরটির সম্ভাব্য সরকারি মূল্য ২১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ টাকা। এটি মাত্র পাঁচ হাজার টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। এমন ৪৯টি পুকুরের তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সম্ভাব্য সরকারি মূল্যের চেয়ে শতগুণ কম দামে ইজারা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ মতে, সার্ভেয়ার মোক্তারুজ্জামান ও এসি ল্যান্ড জাহিদ হাসান মিলে নারায়ণপুর, দোগাছি, দিগরাম, গোপালপুর, পাকড়ি, জামালপুর, কৃষ্ণবাটি, জয়রামপুর, মঠবাড়ি, তেরপাড়া কোচারপাড়া ও কিসমত মালদেবপুর মৌজার ২৪ দশমিক ৪৫ একর আয়তনের ১৪টি পুকুর অত্যন্ত গোপনে অস্বাভাবিক কম দরে ইজারা দিয়েছেন। এই ১৪ পুকুর প্রতিযোগিতামূলক দরে ইজারা না দেওয়ায় রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ কোটি টাকার বেশি। এছাড়া কিসমত গোবিন্দপুর, দুধাই, গোমা, আইহাই, আব্দুলপুর, নারায়ণপুর, রাজারামপুর, মাধবপুর, মধ্য শায়লা, বারুইপাড়া, বিলভেলা মোহনপুর ও বাংধারা মৌজার ৩৪ একর আয়তনের ১৫টি পুকুর ইজারায় ব্যাপক অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। এসব পুকুর অধিকাংশই ভুয়া মৎস্যজীবী সমিতির নামে ইজারা দেওয়া হয়েছে নামমাত্র মূল্যে। এতে সরকারের ক্ষতি হয়েছে কোটি টাকা। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী ভূমি কমিশনার এসি ল্যান্ড জাহিদ হাসান যুগান্তরকে বলেন, সব বিধি-বিধান মেনেই পুকুর ইজারা দেওয়া হয়েছে। কম মূল্যে ইজারার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোন পুকুর কত টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে সেটা কাগজপত্র দেখে বলতে হবে। এখন মনে নেই। গোদাগাড়ী উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার মোক্তারুজ্জামান বলেন, আমি ইজারা দেওয়ার কেউ নই। ইজারার বিষয়ে সব দায়িত্ব এসি ল্যান্ড ও ইউএনওর। আমি শুধু কাগজপত্র দেখি। এ বিষয়ে রাজশাহীর জেলা প্রশাসক শামীম আহমেদ বলেন, পুকুর ইজারাসংক্রান্ত অভিযোগ এসেছে। তা সবিস্তারে তদন্ত করা হবে। অভিযোগ প্রমাণ হলে সংশ্লিষ্টদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।