কৃষিবিদ মনিরুজ্জামান বাবুল : ৯৪তম প্রয়ানদিবস অতিক্রান্ত এক ক্ষনজন্মা নান্দনিক বহুমুখী প্রতিভা অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়! ১০ ফেব্রুয়ারী’ ১৯৩০ রাজশাহীতে তিরোধান হন তিনি। উনিশ শতকের শেষ দশক এবং বিংশ শতকের প্রথম তিন দশক তিনি ছিলেন রাজশাহীর অসাধারণ মেধাবী গুনীজন। একাধারে আইনজীবী, নাট্যকার, ইতিহাসবিদ, প্রত্নতত্ববিদ ইত্যাদি বহুমুখী প্রতিভার মানুষ ছিলেন তিনি। বৃহৎ বাংলার ত্রিশ কোটি মানুষের কাছে তিনি বাংলা বিহার উড়িষ্যার শেষ নবাব ইতিহাসের ‘নবাব সিরাজুদ্দৌলা’ নাটকের রচয়িতা! বাংলার সকল স্তরে এক সত্যনির্ভর লেখক কবি ও নাট্যকার হিসেবে খ্যাত হন। অন্তরে স্থান করে নেন জনমহলে। শান্তিনিকেতন থেকে ১৬ ভাদ্র ১৩০৯ তারিখে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই প্রবাদপুরুষ ইতিহাসবিদ অক্ষয়কুমার এর অনুরক্ত হয়ে চিঠি লিখেছিলেন “আপনি ওকালতিটা ছাড়ুন! চুপচাপ বসিয়া পড়ুন। মাঠের কোণে আসিয়া কুঠির বাধুন। তারপর হরিষান্ন খাইয়া খাগড়ার কলম ধরিয়া তালপাতে ভারতবর্ষের ইতিহাসকথা লিপিবদ্ধ করুন। ত্রিশকোটি নরনারীর আশীর্বাদ ভাজন হইবেন”। প্রাসঙ্গিকতায় আজকের স্মার্ট অভিযাত্রায় ইতিহাস চর্চার হেতু কি এবং প্রজন্মের কাছে এর অত্যাবশ্যকীয়তা নিয়ে আলোচনা মুলত এ পাদটীকা! প্রাথমিকভাবে ‘কী’ এবং ‘কিভাবে’ এটি বিজ্ঞান ; অন্যদিকে ‘কে’, ‘কোথায়’, ‘কবে’ এটিই ইতিহাস এর গুঢ়তত্ব! কে’ র যদি অস্তিত্ব অথেনটিক্যালি না থাকে, তবে কী ‘ এবং ‘কিভাবে’ র প্রসঙ্গ ঘোলাটে হয়, আর যদি কে’ কোথায়’ বিষয়ক সম্যক ধারনা স্পষ্ট না করা হয় বা এড়ায়ে উহ্যে রাখা হয় তাহলে তা বিজ্ঞান সম্মতভাবে গ্রহনীয় হয় না! সুতরাং ঘটনার আদি অন্ত আলোকপাত তথা ইতিহাসভুক্ত না করা হলে সেখানে বিজ্ঞানও অস্তিত্ব হীনতার মুখোমুখি হয়! এতদ্বঅর্থে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধনে ইতিহাস চর্চা এবং শিক্ষালয়ে এর চাষ আজ অতীব জরুরি বটে !
বরেন্দ্র তটের গৌড়জন খ্যাত অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় আইনজীবী, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক প্রভুত প্রতিভায় কালের এক বিষ্ময়কর উদাহরণ। প্রতিবছর এই ‘সমাজ সংস্কারক’র প্রয়ান দিবসে মুখবন্ধ ও আলোচনা বর্তমান বরেন্দ্রভূমির মানুষের জন্য গৌরবের, একথা বলাই বাহুল্য। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ রেজিস্ট্রার জনাব শফিকুল ইসলাম অক্ষয় ভক্ত এক নির্মোহ গবেষক। যিনি এই প্রবাদপুরুষের উত্তরসূরী ও তাদের বর্তমান অবস্থান এবং তদকালীন সময় থেকে এযাবৎ তার কীর্তির ঘটনা প্রবাহ জানার আকুলতা দেখিয়ে অজানা তথ্য উদ্ধার করেছেন। দুয়ারে দুয়ারে তথ্য উপাত্ত চিলচেরা বিশ্লেষণ করে বিশাল সংগ্রহ শালায় লিপিবদ্ধ করেছেন। এ সংগ্রহ থেকে পাওয়া যায়। ইংরেজি ও সংস্কৃতি ভাষায় অসাধারণ পান্ডিত্যপ্রতিভা উঠে এসেছে এ লেখনিতে। অক্ষয়কুমার ভক্ত ও তার সান্নিধ্য জগৎজুড়া সব ব্যাক্তিত্বের নাম। সে সময়ের রাজা রানী রাজনৈতিক ব্যাক্তিবর্গ ও তাদের বংশীয় ব্যাক্তিবর্গ ছিলেন এ দলে। তম্মেধ্য মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, ডিডি স্মিথ, স্যার জন মার্শাল, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, রজনীকান্ত সেন, নাটোরের মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ প্রমদ নাথ, প্রমদা নাথ, শরৎ বাবু মহারানী হেমন্ত কুমারী ইত্যাদি সহচর্য ছাড়াও কাঙাল হরিনাথ, মরমী সাধক লালন সাঈজীর সান্নিধ্যের ঘটনা সংগৃহীত লেখনিতে খোজ মিলেছে, মিলেছে নানা অজানা তথ্যসম্ভার। গত ৯৩তম প্রয়ান দিবসে অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় এর প্রোদৌহিত্র ড. অভিজিৎ গোস্বামীকে স্বশরীরে আমাদের মাঝে পরিচয় করায়ে জনাব শফিকুল ইসলাম আমাদেরকেও করেছিলেন দারুন পুলকিত আন্দোলিত। বাসবদত্তা, আবাসন, আশা ইত্যাদি বাংলা নাটক, একইসাথে ফিকির চাঁদ বাউল দল, ভিক্টোরিয়া থিয়েটার পার্টি এরুপ বহুকীর্তিময় কর্মযজ্ঞের কথা প্রাবন্ধিক গুছিয়ে বলেছেন পংক্তির ধারা উপধারায়। জনাব শফিকুল ইসলাম এর “অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় : রাজশাহীর নাট্য আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক জাগরণের পথিকৃৎ”
মুল প্রবন্ধ উপস্থাপনাকে সাধুবাদ জানাই। রাজশাহী থিয়েটার এর নিতাই বাবু ও তদসংশ্লিষ্ট আয়োজকগনের গুনীমান্যি করার পরিমার্জিত এরুপ ধারাবাহিক রেওয়াজ ইতিহাস প্রিয় প্রজন্মকে নতুন নতুন তথ্য দিবে এটা আশা করা যায়। ফলশ্রুতিতে গবেষণা ধর্মী সৃজনশীলতার উম্মেষ ঘটবে ঘরে বাইরে এর ধারাবাহিকতায় হয়ত বিশ্বজুড়ে! যে দেশে গুণের সমাদর নেই, সেখানে গুনী জন্মাতে পারে না ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্র যুগান্তকারী কথা আজকের জন্য দারুণভাবে প্রযোজ্য। আর এই গুণের সমাদরে নিয়োজিত ঐতিহাসিকবিদগনের গুরুত্ব মুলত এখানেই। সময়ের সাহসী পংক্তির ধারক ও বাহকগনই আক্ষরিক অর্থে : চিরায়ত বন্ধন’ সৃষ্টিতে যুগের দিকপাল। সমাজ সংস্কারক ও সভ্যতার ধারক বাহকদের কথা নব প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেবার দায় সভ্য অংশী সকলের একথা সর্বজন স্বীকার্য। অন্যথা সমাজ বিনির্মানে নানা উপখ্যান অজানাই থেকে যাবে। পুরানো আলোর দিশা নতুন আঁধার কাটাতে সম্যক ভুমিকার গ্রহনীয় বার্তা হবে।
শিশু কিশোর রা আজ তাদের পূর্বসূরি দের নানা কীর্তি ও ইতিহাস নিয়ে আগ্রহ কম দেখায়! আসলে এ দায় পুরাপুরি তাদের নয়, ইতিহাসের রসবোধ জ্ঞান বোধ প্রজ্ঞা দর্শনযাপিত জীবনে এর অনস্বীকার্যতা জানাতে যারা উদ্যোগী হতে পারে, এ দায় মুলত সেখানে !
এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সাব-সেক্টর, শিক্ষা গবেষনায় জড়িত ব্যাক্তিবর্গ এ দায় এড়িয়ে কার্যত সম্মানের অংশী হতে পারে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের উপর গড়ে ওঠা স্বাধীনতার ৫২ বছর অতিক্রান্ত আজ। সময় এসেছে আমাদের প্রজন্মকে স্মার্ট আলোর বিপরীতে ইতিহাসের তীক্ষ্ণ রশ্মির সাথে পরিচিত করা। ধর্মান্ধতা দূরীকরণ, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ভারত স্বাধীনতার ইতিহাস, ইলা মিত্রের ইতিহাস, বাশের কেল্লার ইতিহাস মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ইতিহাস এসবই হতে পারে আগামীকে গড়ার এক প্রেরণা নানা অনুষঙ্গ। দৃশ্যমান উন্নয়নের মহাসড়কে আজকের অবস্থানকে ইতিহাসে ঠাই দিতে হলেও মর্যাদার সারিতে ঠাই দিতে হবে নিবেদিত পূর্বাপর বিদগ্ধ ঐতিহাসিকবিদগনের।
নবপ্রজন্মকে তথ্য উপাত্ত সাহিত্য সংস্কৃতি ইত্যাদি তে স্মার্ট করনের দায়িত্ব নিতে হবে এই সমাজকে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত স্মার্ট জাতী তখনই অর্থবহ হবে যখন আমরা স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের লড়াই সংগ্রাম এর ইতিহাস কে গর্বের সঙ্গে যোগ করতে পারবো জ্ঞান বিজ্ঞান ও অধুনা উন্নয়নে। বঙ্গবন্ধুসহ রাজশাহীর এএইচএম কামারুজ্জামানসহ জাতীয় শহীদ চার নেতার ভুমিকা, মওলানা ভাসানী, শেরেবাংলা ফজলুল হক মাহাত্মা গান্ধীকে স্মরণ করবো নজরুল, রবিন্দ্রনাথ ইত্যাদি কাঙাল হরিনাথকে উপমা হিসেবে ব্যবহার করবো।
লালন সাঈজীর আমৃত্যু দর্শনের ছিটেফোঁটাও যদি হৃদয়ে স্থান পায় তাহলে এই ভোগবাদী স্বার্থবাদী জঞ্জাল থেকে মুক্ত হবে মনুষ্য সমাজ। জাতীগঠনে ইতিহাসের প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরা এখন সময়ের বড় দায়। শিক্ষাক্রমে শিশু কিশোর স্তরে সংস্কৃতি ইতিহাস ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্তিমুলক শিখন এখন জরুরি। বিভিন্ন স্তরের শিক্ষাক্রমকে যদি তা দিয়ে সাজানো যায় তাহলে শ্রীবৃদ্ধি ঘটবে আমাদের ভিতর বাহির, পুরুষ নারীর যুবক বৃদ্ধের প্রগতির উম্মেষ ঘটবে। ভাষা শিক্ষা সাহিত্য সংস্কৃতি এমনকি বিজ্ঞান পাবে নতুন মাত্রা। পূর্বাপর ক্ষনজন্মা কীর্তিমান কবি শিল্পী, সাহিত্যিক কিংবা বিপ্লবী আন্দোলনের দ্রষ্টাগন পাঠককুলে চিরভাস্বর হবেন ! কৃতজ্ঞতার রেওয়াজ তৈরি হবে পরমপরায়। প্রাবন্ধিক চর্চায় আজকের গৌড়জন খ্যাত অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়’র মতো বহুমুখী প্রতিভার সূর্য সন্তানগন টিকে থাকবে স্মার্ট প্রজন্মের মনিকুঠায়। ফলশ্রুতিতে জাতী আলোকিত হবে মৌলবাদী কুসংস্কার দূরভিত হবে, প্রজন্ম শেকড়ের অর্জনে দীপ্তপায়ে নতুন গর্বের সূচনা ঘটাবে। আলোকিত হউক নবপ্রজন্ম ইতিহাসের নতুন চাষে। লেখক : সভাপতি সেভ দ্যা ফিউচার ফাউন্ডেশন, রাজশাহী মহানগর।