শাহানুর রহমান রানা
বিগত কয়েকমাস ধরেই চায়ের আড্ডায় স্থানীয়দের মাঝে বিশেষস্থান পেয়েছিল-তানোর-গোদাগাড়ী আসনে ‘বিজয়ের মুকুট পড়বে কে?’ গণসংযোগ শুরুর পর থেকে চায়ের আড্ডায় বৃদ্ধি পায় জয়-পরাজয়ের গুঞ্জন। কোথাও চলে ফারুকের বিজয় নিয়ে আলাপ; কোথাওবা রাব্বানী কিংবা আখতারের বিজয়ের বিষয়টি। গত ৩০-১২-২০২৩ তারিখ দুপুরের মধ্যেই স্থানীয়দের মাঝে অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে যায় সম্ভাব্য জয়-পরাজয়ের বিষয়টি। দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর এককাট্টা হয়ে যাবার বিষয়টি মূহুর্তেই নির্বাচনের ফলাফলকে অনেকটাই একপেশি করে ফেঁলে। সম্ভাব্য বিজয়ের দিকে এগিয়ে নেয় আরো একধাঁপ। রাব্বানী-আখতারের দলবদ্ধ হয়ে কাজ করার ঘোষণা চরমভাবে বেকায়দায় ফেঁলে চৌধুরী ও তার সমর্থকদেরকে। এছাড়াও মাহিয়া মাহির নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার ব্যাপকতা দিনদিন বৃদ্ধির কারণে চৌধুরীর জন্য আরো বেশি কঠিণ হয়ে পরে নির্বাচনী মাঠে ভোট ব্যাংক সংগ্রহে। কাঁচি প্রতীক নিয়ে রাব্বানী-আখতাদের একত্রে গণসংযোগ ভোটের মাঠে ঝড় তুলেছে বলে মন্তব্য সাধারণ ভোটারদের। এই দুই হেভিওয়েট প্রার্থীকে নিয়েই বেশি চিন্তিত চৌধুরীর সমর্থকরা।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী-১ (তানোর-গোদাগাড়ী) আসনের লড়াইয়ে ত্রিমূখী চ্যালেঞ্জ নিয়ে লড়তে হবে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী ও বর্তমান সংসদ সদস্য ফারুক চৌধুরীকে। প্রথমদিকে, শুধু একতরফা চ্যালেঞ্জ থাকলেও পরবর্তীতে সেটি ত্রিমূখি চ্যালেঞ্জে রূপ নেয়। এই আসনের সর্বোচ্চ শক্তিধর প্রার্থী গোলাম রাব্বানী আর আখতারুজ্জামান আখতারের একাট্ট হয়ে নির্বাচনী মাঠে দাঁপিয়ে বেড়ানোর চাঁপ সহ্য করতে না করতেই আরেক প্রার্থী মাহিয়া মাহির ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার বিষয়টিও এখন চরম ভাবনার বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে চৌধুরীর জন্য বলে মন্তব্য স্থানীয় ভোটারদের। রাব্বানী-মাহি-আখতার এই তিন শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বির সাথে ত্রিমূখী লড়াই করে বিজয়ের মুকুট ছিনিয়ে আনাটা যতটা না কঠিণ হবে চৌধুরীর জন্য; ঠিক ততটাই সহজ হবে রাব্বানীর জয়ের পথটি বলে মন্তব্য স্থানীয় ভোটার, সমর্থক ও দলের নেতাকর্মীদের।
ফারুক চৌধুরী সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পরে রাব্বানী-আখতার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একাট্টা হয়ে নির্বাচনী মাঠে আদাজল খেয়ে নেমে পরার পর থেকে। এবারের নির্বাচনে চৌধুরী-রাব্বানী ও আখতার এই তিন হেভিওয়েট প্রার্থীরই জয়ের সম্ভাবনা ছিল। এখন দুজন পরাশক্তি একত্রে অবস্থান নেবার কারণে জয়-পরাজয়ের বিষয়টি প্রায় একতরফা রূপ নিচ্ছে বলে মন্তব্য স্থানীয় ভোটারদের। তবে, স্থান ও অঞ্চল ভেদে ভোটারদের বিভিন্ন মতামত, অতীতের বেশকিছু আলোচিত ঘটনাসহ স্থানীয়দের চাওয়া পাওয়ার বিষয়গুলো বিচার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, রাব্বানী-আখতার এগিয়ে আছে বেশ কয়েক ধাঁপ। অন্যদিকে, ট্রাক প্রতীকের প্রার্থী চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহির প্রচার-প্রচারণার গতি আর পরিধি দিনদিন ব্যাপক থেকে ব্যাপকতর হবার কারণে তিনিও এখন চিন্তার বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে চৌধুরীর জন্য বলে মন্তব্য স্থানীয়দের। একদিকে, মাহিয়া মাহির ভোট ব্যাংকের পরিধি ও ব্যাপকতা দিনদিন বৃদ্ধির কারণে চৌধুরীর হিসেব থেকে কমে যাচ্ছে ভোটের সংখ্যা। তো অন্যদিকে, আখতার-রাব্বানী একাট্ট হয়ে দিনদিন বাড়িয়েই চলেছে নিজেদের সম্ভাব্য ভোট ব্যাংকের আকার-আকৃতি। যার কারণে, চরম বেকায়দায় আছে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী ওমর ফারুক চৌধুরী। তবে, বেশ কয়েকটি স্থানের ভোটাররা মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, চৌধুরী বর্তমানসহ তিনবারের সংসদ সদস্য। তাকে হারানো খুব একটা সহজ হবেনা। কারণ, তিনি যেমনই হোক, এমপি হবার কারণে উনার নিজস্ব একটি ভোট ব্যাংক আছে; এটাই স্বাভাবিক। কেউবা মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, বিগত বেশকয়েকটি ঘটনার প্রেক্ষিতে ফারুক চৌধুরীর ভোট ব্যাংকে ফাঁটল ধরেছে। তাছাড়া, রাব্বানী-আখতার দুজনেই হেভিওয়েট প্রার্থী। কাঁচি প্রতীকের প্রার্থীর উপর স্থানীয়দের কোন বিষয়েই কোন মান-অভিমান নেই। তাই, নিজদলীয় নেতাকর্মীসহ সাধারণ ও নতুন ভোটারদের ভোট পাবার দিক দিয়ে গোলাম রাব্বানী বেশখানিকটা এগিয়ে আছে। এছাড়াও, রাব্বানীর সম্ভাব্য জয়ের আরো একটি অন্যতম কারণ হলো, ঈগল প্রতীকের হেভিওয়েট প্রার্থী আখতার নির্বাচন থেকে সরেগিয়ে রাব্বানীকে সমর্থন করার পাশাপাশি একট্টা হয়ে করছেন নিয়মিত গণসংযোগ। প্রতিটি গণসংযোগে রাব্বানীর সাথে আখতার থাকার কারণে এবারের নির্বাচনে রাব্বানীর কাঁচি প্রতীকের জয়ের সম্ভাবনাই বেশি দেখছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় ও তার সমর্থকরা মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, তানোর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও মুন্ডমালা পৌরসভার সাবেক মেয়র ও এই আসনের কাঁচি প্রতীকের প্রার্থী গোলাম রাব্বানীর রয়েছে ভোটের মাঠে চমৎকার একটি ভোট ব্যাংক। তিনি ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রথম মনোনয়ন প্রত্যাশায় এলাকায় গণসংযোগ করে ভোটের মাঠে বেশ পরিচিত লাভ করেন তিনি। বিগত চার-পাঁচ বছরে সেই পরিচিতি আর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েকগুণ। অন্যদিকে, রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজ কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক ও গোদাগাড়ী উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের তিনবারের নির্বাচিত সাবেক চেয়ারম্যান ও এই নির্বাচনে ঈগল প্রতীকের প্রার্থী (বর্তমানে নির্বাচন থেকে সড়েগিয়ে রাব্বানীকে সমর্থন দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন) আখতারুজ্জামান আখতারেরও রয়েছে শক্তিশালী একটি ভোট ব্যাংক। উল্লেখ্য, গত ২৩ ডিসেম্বর শনিবার সন্ধ্যায় রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার মাটিকাটা ইউনিয়নে নির্বাচনী প্রচারণাকালে মাহি বলেছিলেন, ‘৭ তারিখে বিপুল ভোটের মাধ্যমে জয়ী হয়ে আমরা সবাই হাসব, আর চৌধুরী একলা একলা কাঁদবে। চৌধুরীকে বিপুল ভোটের মাধ্যমে আমরা পরাজিত করব, ইনশাআল্লাহ।’
ত্রিমূখী ভোটযুদ্ধ করে বিজয় ছিনিয়ে আনা চৌধুরীর জন্য কতটা কঠিণ সেটা সময়ই বলে দেবে বলেও মন্তব্য অনেকের।