এফএনএস
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে কৃষি মার্কেটের কাঁচাবাজার ও নতুন কাঁচাবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ভোর ৩টা ৪৩ মিনিটে মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে আগুনের খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। প্রথমে একটি ইউনিট এলেও মার্কেট বন্ধ থাকায় সেটির সদস্যরা ভেতরে ঢুকতে পারেনি। যে কারণে আগুন দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। পরে পৌনে ৬ ঘণ্টা পর সকাল ৯টা ২৫ মিনিটে কৃষি মার্কেটের আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এ তথ্য নিশ্চিত করেন ফায়ার সার্ভিস মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহজাহান শিকদার। তিনি জানান, ভোরে লাগা আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে ফায়ার সার্ভিসের ১৭ ইউনিট ও ১৩৭ জন কর্মী। আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর অগ্নি নির্বাপণী সাহায্যকারী দল। এ ছাড়া আগুন নিয়ন্ত্রণ, উদ্ধার অভিযান ও সার্বিক শৃঙ্খলায় ঘটনাস্থলে কাজ করে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, এনএসআই, স্কাউটের ভলান্টিয়ার সদস্যরা। বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টারের মাধ্যমে মার্কেটে ওপর থেকে পানি ছিটানো হয়। এদিকে এই মার্কেটে বৈধ-অবৈধ মিলে দোকানের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭০০। গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে লাগা আগুনে মার্কেটে চার শতাধিক দোকান পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা জানান, মার্কেটের হক বেকারিতে আগুনের সূত্রপাত হয়। পরবর্তীতে বাতাসের কারণে আগুন ছড়িয়ে পড়ে একে একে অন্যান্য দোকানগুলোয় লাগে। কৃষি মার্কেটের কাপড়ের বিক্রেতা মাহবুব হাসান জানান, তার দোকানে পাঁচ লাখ টাকার মালামাল ছিল। কিছুই বের করতে পারেননি। মার্কেটের পাশে যাদের দোকান ছিল তারা কিছু মালামাল বের করতে পারলেও ভেতরের দিক থেকে কেউ কিছু বের করতে পারেনি। শফিকুল ইসলাম নামে এক জুতার দোকানি বলেন, প্রথমে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ভেতরে ঢুকতে পারলে আগুনে চার-পাঁচশ দোকান পুড়তো না। ব্যবসায়ীদের সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। দোকান থেকে কিছুই বের করতে পারেনি তারা। ওয়াহিদ নামে এক কাপড় ব্যবসায়ী জানান, তিনি রাত সাড়ে ৩টার দিকে ঘটনাস্থলে আসেন। মার্কেটে এ সময় আগুর জ¦ললেও তার দোকান স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু ৩০ মিনিটের মধ্যে আগুন তার দোকান পর্যন্ত পৌঁছে যায়। মার্কেটের ভেতর হওয়ায় তিনি দোকানে যেতে পারেননি। দুই মার্কেটে প্রায় পাঁচশোর বেশি দোকান ছিল সব পুড়ে গেছে। ওয়াহিদ বলেন, হক বেকারি থেকে প্রথমে আগুন লাগে। নিরাপত্তাকর্মীরা প্রথম ফায়ার ইস্টিংগুইসার দিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। কিন্তু দোকানের শাটার বন্ধ থাকায় কোনো কাজে আসেনি। মুহূর্তেই আগুন পুরো মার্কেটে ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের ঘটনায় ১৮টি স্বর্ণের দোকান পুড়ে গেছে। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্লাস্টিকের মালামাল, ক্রোকারিজ ও ব্যাগের দোকানগুলো। এদিকে রাজধানীতে ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেটের যে তালিকা করেছে সিটি করপোরেশন, তার মধ্যে নেই মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেট। তবে এবার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর সংশ্লিষ্টরা বলছেন মার্কেটটিতে ছিল না অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সেলিম রেজা বলছেন, যেই কমিটি ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেটের তালিকার করেছে সেসময় এ মার্কেটটি তালিকায় ঢুকেনি। গতকাল বৃহস্পতিবার কৃষি মার্কেটে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। রাজধানীতে ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেটের মধ্যে মোহাম্মদপুরের দুটি মার্কেট রয়েছে যেখানে অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। আগুনে পুড়ে যাওয়া কৃষি মার্কেট কাঁচাবাজার মার্কেটটিতেও অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। তাহলে এ মার্কেটটি কেন তালিকায় এল না, এমন প্রশ্নের জবাবে সেলিম রেজা বলেন, যেই কমিটি তখন কাজ করেছে সেসময় এ মার্কেটটি তালিকায় ঢুকেনি। উত্তর সিটির আটটি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে। ভবন ও যেই মার্কেট ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে সেগুলোর বিরুদ্ধে ১৫ দিন বা এক মাসের মধ্যে ব্যবস্থা নিতে আমরা ম্যাজিস্ট্রেটকে বলে দিয়েছি। তিনি বলেন, কোনো বাধা, কোনো কিছুর মুখেই আমরা আর থামবো না। এ ভবনগুলোতে ব্যবসায়ী এবং বসবাসকারী যারাই থাকুন তাদের সেখান থেকে বের করে দিয়ে ভবনগুলোকে সিলগালা করে দিতে হবে। দ্রুত সময়ের মধ্যে এ ভবনগুলোকে ফাঁকা করতে হবে। এ লক্ষ্যে আমরা ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করে দিয়েছি। তারা দ্রুততম সময়ের মধ্যে কাজগুলো সম্পন্ন করবেন। এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কৃষি মার্কেটের এখন পর্যন্ত ডিএনসিসি ক্ষতিগ্রস্ত ২১৭টি দোকানের তালিকা পেয়েছে জানিয়ে সেলিম রেজা বলেন, অবৈধ দোকানগুলো ছিল ফুটপাতে। আমাদের বরাদ্দ দেওয়া দোকান ছিল ৩১৭টি। এরমধ্যে এখন পর্যন্ত আমরা তথ্য পেয়েছি ২১৭টি দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর ফায়ার সার্ভিসও বলেছে ভেতরে পর্যাপ্ত অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। এ ব্যাপারে আমাদের সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। এখানে বাজার সমিতি আছে তাদের আমরা এই কাজগুলো করার জন্য বারবার নির্দেশনা দিয়েছি, অনুরোধ করেছি। এ কাজগুলো না করার কারণেই আমরা এখন এর ভয়াবহতা দেখতে পাচ্ছি। তিনি বলেন, মার্কেটের ব্যবসায়ী যারা আছেন, যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন আমরা তাদের তালিকা করছি। আমরা সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে তাদের পাশে দাঁড়াবো। আমাদের কর্মীরা কাজ করছেন। যতটুকু সম্ভব ডিএনসিসির পক্ষ থেকে তাদের সহযোগিতা করা হবে। মালিক সমিতি ও ব্যবস্থাপনা কমিটি দায়ী কি-না এমন প্রশ্নের বিষয়ে সেলিম রেজা বলেন, এটা তদন্ত করে জানা যাবে কারা দায় ছিল। তদন্তেই বিষয়টি বেরিয়ে আসবে। এ সময় ঢাকার জেলা প্রশাসক (ডিসি) আনিসুর রহমান বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা অতি দ্রুত ক্ষতিগ্রস্তদের একটি তালিকা করবো। তারপর আমরা সরকারের পক্ষ থেকে তাদের মানবিক সহায়তা করার চেষ্টা করবো। এদিকে ঢাকা মহানগর দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হাসান বলেন, মোহাম্মদপুর কাঁচা বাজার (কৃষি মার্কেট) ঝুঁকিপূর্ণ ছিল ফায়ার সার্ভিস ও সিটি কর্পোরেশনের এমন অভিযোগ করছে, মার্কেটটি ঝুঁকিপূর্ণ থাকলে ভেঙে দেওয়া হলো না কেন? গতকাল বৃহস্পতিবার কৃষি মার্কেটের দক্ষিণ অংশের সামনের মোড়ে গণমাধ্যম কর্মীদের সামনে এই প্রশ্ন করেন তিনি। নাজমুল হাসান বলেন, মার্কেটটি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে এমন কোনো কাগজ আমরা পাইনি। তারা যদি জানতেন, তবে এটি ভেঙে দিতে পারতেন। যিনি এই দোকানে ব্যবসা করছেন তিনিই যেন পরবর্তীতে দোকানটি বরাদ্দ পান। যার দোকান সেই যেন পায় এখানে বাইরের লোক এসে যেন দোকান না পায়। এই দুর্ঘটনায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরাই যেন ক্ষতিপূরণ পান এটিও নিশ্চিত করার কথা বলেন তিনি। এ সময় বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক ফারুক আহমেদ বলেন, এ মার্কেট ঝুঁকিপূর্ণ আমরা এখনো তেমন কোনো কাগজ পাইনি আর আমাদেরও মনে হয়নি মার্কেটটি ঝুঁকিপূর্ণ। এর আগে, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশনস এণ্ড ম্যানটেনেন্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. তাজুল ইসলাম বলেন, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট আগুনের খবর পেয়ে ৯ মিনিটের মাথায় আমরা এখানে চলে আসি। রাত তিনটা ৫২ থেকে আমরা এখানে আগুন নির্বাপণের চেষ্টা করি। সকাল ৯টা ২৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণ করেছি। ১৭টি ইউনিটে ১৫০ জন ফায়ার ফাইটার কাজ করেছেন। রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে কোনো ফায়ার সেফটি ছিল না। আগুনের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এসে মার্কেটের নিরাপত্তা রক্ষীদেরও খুঁজে পাননি। ফায়ার ফাইটারদের সঙ্গে বিজিবি, পুলিশ, র্যাব, সেনাবাহিনী-নৌবাহিনীর সদস্যরাও সহযোগিতা করেছেন বলেও জানান এই কর্মকর্তা।