ইব্রাহিম হোসেন মুন
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২২তম জাতীয় সম্মেলন আগামী ২৪ ডিসেম্বর ঢাকার ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। দলীয় প্রধানের নির্দেশনায় এবারের সম্মেলন সীমিত পরিসরে করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। আলোচনা সমালোচনা চলছে সর্বত্র দলের কর্মী থেকে নীতি নির্ধারক পর্যন্ত। দলীয় অফিস ভরপুর। জানান দিতে হরেক রকম শো ডাউন। তবে একটা বিষয়ে হতবাক হচ্ছি যে, পার্টি অফিসে প্রতিনিয়ত নিয়ম করে এক এক নেতার কিছু ব্যক্তিগত লোক তাদের বডি ল্যাংগুয়েজ দেখলেই আমরা বুঝতে পারতাম ওমক নেতা আসছে। যদিও এসমস্ত লোকদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে সন্দেহ আছে। তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে! এরকম দু,একজনের কাছে জিজ্ঞাসা করেছি নেতার খবর কি? উত্তরে বলেন ‘টেনশনে আছি ভাই কি যে আছে কপালে’? যাক শেষমেষ তারা উপলদ্ধী করতে পেরেছেন। তবে মুল প্রতিপ্রাদ্য বিষয় হল “উপলদ্ধী, চমক, ধমক আর নির্বাচন”। আওয়ামী লীগের দুইবারের সফল সাধারণ সম্পাদক ডায়নামিক জননেতা জনাব ওবায়দুল কাদের এমপি ইতিমধ্যে বিরোধী দলকে ডায়নামিক ধমক দিয়ে ঘোষাণা দিলেন ১০ লক্ষ্যাধীক মানুষের সমাগম হবে সম্মেলনস্থলে। অনেকের মতে, আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতায় আছে বলেই বিশাল জনগোষ্ঠী নিয়ে এত বড়সড়ো সম্মেলন আয়োজন করতে সাহস দেখচ্ছে। কিন্তু কেবল ক্ষমতায় থাকলে এবং অর্থ জোগানের অফুরন্ত উৎস থাকলেই বড় ও সুশৃঙ্খল সম্মেলন করা যে সম্ভব হয় না, সেটা অতীতে ক্ষমতাসীন কোনো কোনো দলের সম্মেলনের ক্ষেত্রে আমরা তা দেখেছি। তবে বিরোধী দলের সাথে টেক্কা দিয়ে ১০ লক্ষ্যাধীক জনগোষ্ঠী সম্মেলনে হাজির করা দুর্ভোগের কারণ হতে পারে। এ বিষয়টি মাথায় নিয়ে যথাযথ প্রদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে।বিরোধী দলকে হিসাবে নেওয়ার পুর্বে নিজ দলের অবস্থান নেতা-কর্মী তথা দেশের জনতার কাছে স্পষ্ট হওয়া জরুরী। এই সম্মেলনে বড় চ্যালেন্স থাকবে হাইব্রিড আর অনুপ্রবেশকারীদের ঠেকানোর পাশাপাশি বঞ্চিতদের কাছে টানা।
সাধারণত সম্মেলনের মূল লক্ষ্য থাকে তিনটি। (১) দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন উৎসাহ উদ্দীপনা সৃষ্টি করা। (২) একটি নতুন কমিটি নির্বাচন ( ৩). রাজনীতি ও সাংগঠনিক বিষয়ে আলাপ আলোচনা। এই তিনটি লক্ষ্যের আলোকে এখন আমরা দেখে নেওয়ার চেষ্টা করবো আওয়ামী লীগের ২২তম সম্মেলন কতটুকু সফল হতে পারে।
(১) ইতিমধ্যে সারাদেশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন উৎসাহ উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে যা অতিতের সমস্ত রেকর্ড অতিক্রম করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
(২) এবারের সম্মেলনে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শ্রদ্ধেয় শেখ হাসিনা আপাই যে সভাপতি পদে নতুন করে দায়িত্ব পাবেন সে ব্যাপারে দলে বা দলের বাইরে কারো মনেই কোনো সন্দেহ-সংশয় নেই। শ্রদ্ধেয় নেত্রীর বিকল্প আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সহযোগী কোনো নেতা কর্মী কল্পনাও করতে পারি না। তিনি আওয়ামী লীগের ঐক্য ও সংহতির প্রতীক। তাঁকে বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগের কমিটি গঠনের কথা কারো বিবেচনাতেই নেই। তাই ২২তম সম্মেলনেও তিনি টানা দশমবারের মতো আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হবেন।
২২তম সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক কে হবেন এটা বলা মুশকিল। আওয়ামী লীগের ইতিহাসে পরপর তিনবার সাধারণ সম্পাদক হওয়ার নজির নেই। তবে অনেকের ধারণা আগামী নির্বাচনে ডায়নামিক নেতৃত্ব অতিব জরুরী। এই গুনের অধিকারী জননেতা ওবায়দুল কাদেরের বিকল্প নেই। তিনিই হতে পারেন এই বিরল রেকর্ডের অধিকারী। এছাড়া সাংগঠনিক বিবেচনায় ড. হাসান মহমুদ চৌধুরী, শেকড়ের বিবেচনায় জাতীয় চার নেতার অন্যতম শহীদ কামারুজ্জামানের সুযোগ্য উত্তরাধিকারী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন এবং পরিচ্ছন্ন ও ক্লিন ইমেজ হিসাবে খ্যাত ড. আব্দুর রাজ্জাক ও খালিদ মাহমুদ চৌধুরী প্রমুখ বিশ্বস্ত সুত্রে এগিয়ে রয়েছেন। অনেকেই মনে করছেন প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানিক ও যুগ্ন সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ চমক দেখাতে পারেন। দেশের জনতা এবং আওয়ামী লীগের কর্মীদের যে সমস্ত নেতারা পালস বুঝে নাই অথবা বুঝতে চায় নাই তাদের বিপক্ষে তৃনমুল জনগণ ও বিরক্ত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল নেতারা তাদের নেতূত্তের সুবাতাস যথাযথ ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। স্বজনপ্রীতি ও লেনদেনের কার্যক্রম আলোচনার টেবিলে এবারের সম্মেলনে তাদের বাদ পড়া প্রায় নিশ্চিত। এসমস্ত জায়গায় দুর্দিনের ছাত্রলীগের সাবেক পরীক্ষিত নেতাদের অন্তভুক্ত করার বিরাট সম্ভাবনা রয়েছে। এই সম্মেলনে অবাক করা কিছু ঘটনার জম্মদিতে পারে যেমন আওয়ামী লীগের অঙ্গ ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতা নির্বাচনে সাম্প্রতিক সময়ে বায়োডাটা চাওয়া হয় একটি নিদিষ্ঠ ফরমেটে আজ যে কর্মী হয়েছে সেও নিজেকে যোগ্য মনেকরে নেতা হতে চায়। আওয়ামী লীগের এই সম্মেলনে বায়োডাটা চাওয়া হলে আওয়ামী লীগ বুঝবে কত ধানে কত চাল।
(৩)সাংগঠনিক পর্যালোচনা ঃ ২২তম “এই সম্মেলনে আওয়ামী লীগকে কঠোর ও তিক্ত সত্যগুলো বিশ্লেষণ করতে হবে, দল পুনর্গঠনে বাস্তব কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। নইলে এই সম্মেলন পাকিস্তানের আইয়ুব খানের আমলের উন্নয়ন দশকের উৎসবের পরিণতি বরণ করতে হতে পারে। আমি এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের হাই কমান্ডের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।” দুঃখজনক হলেও সত্য এটাই যে, আওয়ামী লীগের সম্মেলনে ‘কঠোর ও তিক্ত’ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা খুবই কমই হয়।যা অনাকাঙ্ক্ষিত বটে। দলের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক লক্ষ্য পূরণেই সরকারের কাজ করার কথা। কিন্তু টানা তিন মেয়াদে সরকারে থাকায় দল হিসেবে আওয়ামী লীগের মধ্যে নানা ধরনের ত্রুটি-দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে যে দুর্বলতা দেখা দিয়েছে, তার প্রকট বহিঃপ্রকাশ লক্ষ করা গেছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যার মধ্য দিয়ে। দলের মধ্যে সর্বস্তরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে না আনতে পারলে পরবর্তী নির্বাচনে বড় রকমের খেসারত দিতে হবে। ১০ লক্ষ্য সমাগম বৃথা যেতে পারে।বিভিন্ন পর্যায়ে দলের মধ্যে হাইব্রিড আর অনুপ্রবেশকারীদের দাপটে নাজেহাল অধিকাংশ দুর্দিনের নেতা/কর্মী।যারা ক্ষমতার কাছাকাছি রয়েছে তাদের মধ্যে অনেকেই বিনয়ী ভাব ভূলেই গিয়েছেন বলে ধরে নেওয়া যায়।অনেককেই একতরফা সমর্থন দিয়ে অন্যদের বঞ্চিত করেছে।যত বড়ই নেতা, এমপি বা মন্ত্রী হোক দলের সবার্থে তাদের খুজে বের করতে হবে। এসবের বিরুদ্ধে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার অবস্থাও হয়তো থাকবে না। সম্মেলনে এই দুর্বলতাগুলো আলোচিত হওয়া অতীব জরুরী।
আওয়ামী লীগে সরকারের ১৪ বছরের এত সফলতা মেগা প্রজেক্ট স্যাটালাইট যুগে প্রবেশ, মেট্রোরেল,বঙ্গবন্ধু টানেল,বিদ্যুতে অভাবনীয় সফলতা, জঙ্গি দমন,ডিজিটাল বাংলার রুপায়ন,মহামারী করোনা মোকাবেলায় অকল্পনীয় সফলতা এত কিছুর পরেও ভোট নিয়ে কেন ভাবতে হচ্ছে আওয়ামী লীগকে? এই প্রশ্নের উত্তর এই সম্মেলনে বের করতে হবে।সমীক্ষায় দেখা গেছে দলীয় সভানেত্রীর জনপ্রিয়তা আকাশ চুম্বি আর সেই দলের অধিকাংশ নেতা এবং জনপ্রতিনিধিদের জনপ্রিয়তা নিম্ন মুখি কিন্তু কেনো? এর জবাব চাইতে হবে। হাইব্রিড, অনুপ্রবেশকারী এবং তেল মারা নেতাদের সংগঠন থেকে বাদ দিতে হবে।
আমরা গত ২১তম সম্মেলনে দেখেছিলাম অধিকাংশ কেন্দ্রীয় ও জেলার নেতারা তাদের বক্তৃতায় নিজ নিজ এলাকার সমস্যা ও সাংগঠনিক দুর্বলতার কথা তুলে না ধরে এতটাই নেত্রীবন্দনায় মেতে উঠেছিলেন যে একপর্যায়ে সভানেত্রীকেই বলতে হয়েছে, “এত বেশি তেল দিয়েন না!”যদিও এটাই সত্য দলীয় সভানেত্রীর আকাশ চুম্বী জনপ্রিয়তার উপর ভর করেই অধিকাংশ নেতা এম পি বা মন্ত্রী হয়েছেন।এরপর তারা আর পিছন ফিরে দেখেনি।আয়নায় নিজেদের চেহারা কবে যে দেখছেন তা হয়ত ভুলে গেছেন।আমরা জানি ঔযুদ খেলে রোগ ভালো হয় কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত খেলে বিষ হয়ে যায়।এই তো কদিন আগে দেখলাম ডায়াসে দাঁড়িয়ে চলছে “বন্দনা” ডায়নামিক জননেতা ওবায়দুল কাদের বাধ্য হয়ে ধাক্কা মেরে করে দিলেন চিতপাটাং বেশ মজা পেলাম দালালীর পুরুস্কারটা তো ভালই পেলো। ইস সব ক্ষেত্রে যদি এমনটা হতো।
আওয়ামী রাজনীতিতে দীর্ঘদিন শিক্ষণীয় র্ক্যাক্রম সভা সেমিনার অনুপস্থিত কিন্তু কেন? রাজনীতিতে শিক্ষতে হবে জানতে হবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান নিজে সভা সেমিনারে প্রতিনিয়ত অংশ গ্রহন করতেন।তিনি নিজে জ্ঞান আহরন করতেন এবং অন্যদের সাথে তা শেয়ার করতেন।প্রশিক্ষনের অভাবে কোথায় কি বলতে হয় তা আমাদের অনেক বড় বড় নেতারাই জানে না।তাদের অগ্রহনযোগ্য কথাবর্তা দল এবং সরকারের ভাবমুর্তি বিনষ্ট করছে।সফল সম্মেলন হতে হলে এ বিষয়গুলো গুরুত্বের সহিত নিতে হবে। এত কিছুর পরেও আশায় বাধিঘর তাই তো মনে করি সকল বাধা বিপত্তি আর অপশক্তি বিন্যাস করে প্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনার প্রাজ্ঞ নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে বিশেষ সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে মাথা আরো উঁচু করে দাঁড় করাতে সক্ষম হবে। মনে রাখতে হবে এই দেশের মানুষ বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের কাছে প্রত্যাশা করে অন্য কোনো দল বা ব্যক্তির কাছে নয়। আওয়ামী লীগের ২২তম সম্মেলনের সাফল্য কামনা করি। লেখক পরিচিতি : সাবেক সভাপতি বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।