শোয়েব বিন জামান, রুয়েট : বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পানির নিচের রোবট তৈরির প্রতিযোগিতা ‘রোবোসাব ২০২৬’-এর সেমিফাইনাল পর্বে উত্তীর্ণ হয়ে ইতিহাস গড়েছে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) গবেষণা দল ‘ টিম বেঙ্গলসাব’। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে টক্কর দিয়ে বাংলাদেশের পানির নিচের রোবট প্রযুক্তির সক্ষমতা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে ৩৫ কেজি ওজনের স্বয়ংক্রিয় আন্ডারওয়াটার ভেহিকল ‘হাঙর ২.০’ নিয়ে এই গৌরবোজ্জ্বল সাফল্য অর্জন করেছে দলটি।
আন্তর্জাতিক আয়োজক প্রতিষ্ঠান ‘রোবোনেশন’-এর তথ্য অনুযায়ী, এবারের বিশ্ব আসরে অংশ নিতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে মোট ৫৮টি দল নিবন্ধন করে। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়, ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়, জর্জিয়া টেক, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর (এনইউএস), ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া বার্কলি এবং বিভিন্ন আইআইটি-র মতো বিশ্বের নামী-দামী সব প্রকৌশল ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ থেকে অংশ নেয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়সহ মোট ৪টি দল। এসব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও শক্তিশালী দলের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সরাসরি সেমিফাইনালে জায়গা করে নেওয়াকে রুয়েটের জন্য একটি বিরাট ও যুগান্তকারী অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সেমিফাইনালের টিকিট পাওয়ার জন্য অংশগ্রহণকারী দলগুলোর সামনে ছিল অত্যন্ত কঠিন এক চ্যালেঞ্জ। পানির নিচে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি নির্ধারিত গেট অতিক্রম করা, একটি নির্দিষ্ট বারকে নিখুঁতভাবে প্রদক্ষিণ করা এবং কোনো মানুষের সাহায্য ছাড়াই সফলভাবে নির্ধারিত স্থানে ফিরে আসার মিশন সম্পন্ন করতে হতো। রুয়েটের ‘টিম বেঙ্গলসাব’ তাদের তৈরি রোবট ‘হাঙর ২.০’-এর মাধ্যমে পানির নিচের এই চ্যালেঞ্জিং মিশনটি সফলভাবে সম্পন্ন করে বিচারকদের মন জয় করে নেয়। বাংলাদেশ থেকে নিবন্ধিত ৪টি দলের মধ্যে রুয়েটের ‘টিম বেঙ্গলসাব’ এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দল সরাসরি সেমিফাইনালে উত্তীর্ণ হতে পেরেছে। বাকি দুটি দলের ফলাফল এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি আয়োজকরা।
এই অভাবনীয় সাফল্য নিয়ে দলটির সদস্যরা জানান, গত বছরের অভিজ্ঞতা, দীর্ঘদিনের চুলচেরা গবেষণা, সুপরিকল্পিত প্রস্তুতি এবং দলের প্রত্যেকের নিরলস পরিশ্রমের ফলেই এই আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাফল্য পাওয়া সম্ভব হয়েছে। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তুলে ধরার পাশাপাশি প্রতিযোগিতার আগামী ধাপগুলোতে আরও বড় গৌরব বয়ে আনার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তারা। রুয়েটের এই অদম্য দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন রুয়েটের তড়িৎ ও টেলিযোগাযোগ কৌশল বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সুদীপ্ত মণ্ডল। দলের অন্য সদস্যরা হলেন ইলেকট্রনিক ও কম্পিউটার কৌশল বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী খন্দকার রাদওয়ানুর রহমান, সিরাজুম মুনির, আসাদুল্লাহ আল গালিব এবং রাহুল দেবনাথ। গত ২৪ জুন প্রতিযোগিতার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত কারিগরি তথ্যাবলি জমা দেয় রুয়েট দল এবং ২৫ জুন আয়োজক কমিটি তা আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে। আগামী ১১ জুলাই থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে রোবোসাব ২০২৬-এর মূল সেমিফাইনাল পর্ব, যেখানে বিশ্বজয়ের লক্ষ্যে পানিতে নামবে বাংলাদেশের ‘বেঙ্গলসাব’। বিশ্বের বুকে রুয়েটের শিক্ষার্থীদের এই উদ্ভাবনী চিন্তা, গবেষণাভিত্তিক কাজ এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাংলাদেশের স্বয়ংক্রিয় আন্ডারওয়াটার রোবট প্রযুক্তি গবেষণার ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে থাকবে।