রুবেল সরকার : কারাগারের উঁচু প্রাচীর, লোহার কপাট আর কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাঝে মানবিকতার বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করল রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এক বন্দীর দীর্ঘ দুই বছরের আকুতি ও মানবিক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তার অবুঝ শিশুকন্যার সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ করে দিলেন সিনিয়র জেল সুপার আল মামুন। এই ঘটনা কারাগারের কঠোর কাঠামোর ভেতরেও ভালোবাসার এক অনন্য আখ্যান তৈরি করেছে।
সূত্র জানায়, ২০১০ সালের একটি হত্যা মামলায় আড়াই বছর আগে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ওই বন্দী রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে আসেন। কারাগারে আসার সময় তার স্ত্রী ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। এরপর দীর্ঘ সময়ে অনেক জল গড়িয়েছে, কারাগারে কেটেছে বন্দীর দিনলিপি। তার অগোচরেই পৃথিবীর আলো দেখেছে তার কন্যা সন্তান। কিন্তু আইনি সীমাবদ্ধতা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত কঠোরতার কারণে বাবার সঙ্গে সন্তানের সরাসরি দেখা করার বা তাকে কোলে নেওয়ার সুযোগ হয়নি কখনো।
সম্প্রতি কারাগারের নিয়মিত পরিদর্শনকালে ফাঁসির সেলে থাকা ওই বন্দী সিনিয়র জেল সুপার আল মামুনের কাছে আবেগঘন এক আবেদন করেন। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তিনি জানান, সন্তান হওয়ার পর থেকে গত দুই বছরে তিনি তাকে কখনো সামনে থেকে দেখার বা কোলে নেওয়ার সুযোগ পাননি। জীবনের অনিশ্চিত গন্তব্যে পৌঁছানোর আগে সন্তানের স্পর্শটুকু পাওয়ার আকুল আবেদন জানান তিনি।
বন্দীর এই আবেগপ্রবণ আকুতি বিষয়টি একান্ত মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করেন সিনিয়র জেল সুপার আল মামুন। তিনি বিদ্যমান আইন ও নিরাপত্তার বিষয়টি চুলচেরা বিশ্লেষণ করে কারাগারে এক বিশেষ পরিবেশ নিশ্চিত করেন। যেখানে দীর্ঘ দুই বছর পর বাবার কোলে ওঠার সুযোগ পায় ফুটফুটে সেই শিশু। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন ওই বন্দী। এই আবেগঘন মুহূর্তে উপস্থিত অনেকের চোখেই জল নেমে আসে। এ বিষয়ে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার আল মামুন বলেন, ‘কারাগারের মূল উদ্দেশ্য কেবল অপরাধের শাস্তি প্রদান নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধ ও পারিবারিক বন্ধনকে সমুন্নত রাখাও আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। বন্দীর মানসিক সুস্থতা এবং তার পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কের এই সেতুবন্ধন পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।’ কারাগারে এমন মানবিক উদ্যোগ সহকর্মী ও সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কঠোর দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মানবিকতার এমন নিদর্শন সমাজে এক ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেয়। অপরাধীকে সংশোধন করে মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে এ ধরনের মানসিক প্রশান্তি ও মানবিক আচরণের কোনো বিকল্প নেই। দুই বছরের প্রতীক্ষার শেষে কারাগারে বাবার কোলে সন্তানের সেই ক্ষণিকের উপস্থিতি যেন কারাগারের ধূসর দেওয়ালে মানবিকতার এক নতুন আলো ছড়িয়ে দিলো।