ইউসুফ আলী চৌধুরী
শারদীয় দুর্গাপূজায় মন্ডপে মন্ডপে বাদ্যযন্ত্র, ঢাক-ঢোলের শব্দ আর ধুপের গন্ধে মেতে উঠে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবাই। এবছর রাজশাহী নগরীসহ জেলার ৯ টি উপজেলায় ৪৫০ টি মন্দিরে দুর্গা পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দুর্গা পূজা সামনে রেখে শেষ সময়েও ঢাক, ঢোল মেরামতের তেমন কোন কাজ নেই বলে জানান কারিগররা।
রাজশাহী নগরীর সিএনবির মোড়ে আসু বাবু ও পবা উপজেলার নওহাটা বাজারের তেঁতুল তলা মোড়ের চন্দন দাসের দোকানে ঘরে দেখা গেছে, নেই তেমন ঢাক-ঢোল তৈরি বা মেরামতের কাজ। তারা ঐতিহ্য ধরে রেখে তাদের পূর্ব পুরুষের পেশা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। এছাড়াও বাদ্যযন্ত্র তৈরি ও মেরামতের বিভিন্ন দোকান ঘুরে দেখা গেছে, ঢাক ও ঢোল মেরামত বা তৈরির কোন কাজ নেই। কারিগররা জানান, পূজাতে ঢাক-ঢোলের বাজনা অপরিহার্য। কারণ হিন্দুশাস্ত্রেও এর ব্যবহারের উল্লেখ রয়েছে। তাই ঢাক-ঢোল ছাড়া পূজা-অর্চনার কথা ভাবাই যায়না। তবে বর্তমান সময়ে আধুনিক যন্ত্রপাতির আধিক্যে ঢাক-ঢোলের বাজনা কমে যাচ্ছে। এখন যে দুই একটি ঢাক-ঢোলের কাজ হয় তাতে কাঠ, চামড়াসহ ঢাক-ঢোল তৈরির বিভিন্ন উপকরণের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন খুব একটা লাভ হয়না।
পবা উপজেলার নওহাটা বাজার তেঁতুল তলা মোড়ের ঢাক তৈরির কারিগর চন্দন দাস (৪৫) বলেন, বংশ পরম্পরায় দীর্ঘ ২০ বছর ধরে আমি এ পেশায় নিয়োজিত রয়েছি। আগের দিনের মতো এখন আর ঢাক ও ঢোলের তেমন চাহিদা নেই। যুগ পরিবর্তনের সাথে সাথে হারিয়ে যেতে বসেছে ঢাক-ঢোল, খোল ও তবলা। তবে পূজা উপলক্ষে ঢাক-ঢোলের চাহিদা কিছুটা বেড়ে যায়। তিনি আরও বলেন, অনেক কষ্ট করে বাপ-দাদার পেশার হাল ধরে রেখেছি। এ ব্যবসায় এখন যা আয় হয় তা দিয়ে পরিবারের ভরণ-পোষণ করা কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। চন্দন দাস বলেন, বড় আকারের প্রতিটি ঢাক ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। ছোট ও মাঝারি ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা দামে বিক্রি করা হয়।
চন্দন দাস আরও বলেন, দুর্গা পূজাকে সামনে রেখে মাত্র ৬/৭ টি ঢোল মেরামতের জন্য পেয়েছেন। কাজে চাপ একিবারেই কম। একাধিক কারিগর জানান, গান বাজনা, যাত্রানুষ্ঠানসহ বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান কম হওয়ায় দিন দিন ঢোলের চাহিদাও কমে যাচ্ছে। তাই সংসারের খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে। যে কারণে এ কাজে কারিগররা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। তারা আরও জানান, আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের কারণে উৎসব-অনুষ্ঠানে এখন আর ঢোলের তেমন কদর না থাকলেও পূজা-পার্বনে এখনও ঢাক-ঢোলের কদর রয়েছে। পূজার আরতিতে ঢোলের এখনও কোনো বিকল্প নেই। তাই বছরের এ সময়টাতে ব্যস্ত সময় পার করেন ঢুলি থেকে শুরু করে ঢোল ও খোল তৈরির কারিগররা। কিন্তু এবছর তেমন কোন মেরামতের কাজ নেই।
বসে বসে সময় পার করছেন কারিগররা। রাজশাহীর পবা উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মো. ওয়াজেদ আলী খাঁন বলেন, পূজার সানাইয়ে মন কেমন করে ওঠে। শুধু সানাই নয়, জোড়া কাঠিতে ঢাক কিংবা কাসরের উপর একটানা একটি কাঠির তিনটি শব্দ-সুরের যে মুর্ছনা সৃষ্টি করে এসেছে তা বাঙালির একান্ত নিজের সুর। এ সুরের ইন্দ্রজাল ছিড়ে আমাদের বাঙালির গানে প্রবেশ করেছে গিটার, প্যাডড্রাম ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র। যার প্রভাবে আমাদের ঢাক-ঢোল এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। তিনি আরও বলেন, বিচিত্র পেশার ভিড়ে দেশিও বাদ্যযন্ত্র তৈরির পেশায় অর্থের প্রাচুর্য নেই। এজন্য বংশানুক্রমিক এসব পেশা পরিবর্তন করছেন কারিগররা। ফলে বাদ্যযন্ত্র তৈরির দোকান গুলো দিন দিন কমে যাচ্ছে।