স্টাফ রিপোর্টার : স্থানীয় বাসিন্দাদের আপত্তি সত্তেও রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় তিন ফসলী জমিতে ইটভাটা স্থাপন কাজ অব্যাহত রয়েছে। ইতোপূর্বে এলাকাবাসীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে ওই ইটভাটা নির্মান কাজ বন্ধ থাকলেও পুনরায় শুরু হয়েছে। এই ইটভাটা নির্মানের ফলে পরিবেশ ও চাষাবাদকৃত ফসলের ক্ষতির আশংকা করছেন আশেপাশের জমির মালিকরা। এর বিরুদ্ধে রাজশাহী জেলা প্রশাসক ও পরিবেশ অধিদপ্তরে সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকরা একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, তারা রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার ডুমুরিয়া, কাঁঠালবাড়িয়া, বিদিরপুর, সেখেরপাড়া ও পুরাপাড়া গ্রামের কৃষক। পুরাপাড়া মৌজায় তাদের সবার ফসলি জমি রয়েছে। বরেন্দ্র বহুমুখি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডি) গভীর নলকূপ থাকায় আমাদের জমিতে বছরে তিনবার ধান চাষ করা সম্ভব হয়। জমির আশপাশে রয়েছে আম ও পেয়ারা বাগান। পাশেই পুরাপাড়া গ্রাম। এই গ্রাম ঘেঁষে আমাদের ফসলি জমির পাশে একটি ইটভাটা স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার হাটরামচন্দ্রপুর গ্রামের মৃত নেশ মোহাম্মদের ছেলে আবদুর রাজ্জাক এখানে ইট ভাটা স্থাপনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন।
এতে আরো উল্লেখ করা হয়, গোদাগাড়ী উপজেলার পাঁচগাছি গ্রামে মেসার্স বিবিএফ ব্রিকস কোম্পানী লিমিটেড নামে আবদুর রাজ্জাকের একটি ইটভাটা ছিলো। বার বার গ্রামবাসীর বাঁধার মুখে সেখানে ইটভাটাটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন আবদুর রাজ্জাক। এখন আমাদের ফসলি জমির পাশে সেই ইটভাটা স্থানান্তরিত করার প্রচেষ্টা চলছে। এ জন্য আবদুর রাজ্জাক আমাদের জমির আশপাশের কৃষকদের মোটা অঙ্কের অর্থ দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে জমি ইজারা নেয়া শুরু করেছেন। তার প্রলোভনে পড়ে ইতোমধ্যে পুরাপাড়া মৌজার জেএল নং-৩০০ এর ৯৩, ৯৪, ৯৫, ৯৬, ৯৭, ৯৮ ও ১০০, ১০১, ১০২ এবং ১১৬ নং দাগের বেশ কয়েক বিঘা জমি ইজারা নিয়েছেন।
আরও জমি নেয়ার প্রচেষ্টা করছেন। এখানে ইটভাটা নির্মাণ করলে আমাদের তিন ফসলি জমির আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফলন কমবে। ইটভাটার কারণে আম ও পেয়ারা বাগানও নষ্ট হয়ে যাবে। তাছাড়া পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হবার পাশাপাশি সার্বিকভাবে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটবে। এতে পাশের পুরাপাড়া গ্রামের মানুষের স্বাস্থ্যহানি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। আর ইটভাটার কারণে আমাদের জমির ফসলের উৎপাদন কমে গেলে পরিবার-পরিজন নিয়ে আমরা মারাত্মক দুর্ভোগের মধ্যে পড়ব। এমতাবস্থায় আমাদের জমির ভেতর ইটভাটা স্থাপন বন্ধ করা অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে।
অভিযোগ পত্রের মাধ্যমে আরো জানাগেছে, স্থানীয় কৃষি অফিসে বিষয়টি নিয়ে গত ১৩-০৫-২০২০ ইং তারিখে একটি লিখিত অভিযোগ পত্র দেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা বিষয়টির সুরাহা করে দেবার মৌখিক আশ্বাস দিলেও সেটি পরবর্তীতে হিতে বিপরীত হয়ে প্রতিয়মান হয়। ইটভাটা বন্ধের জন্য ভুক্তভোগী কৃষকদের পক্ষে গোদাগাড়ী কৃষি অফিস ও রাজশাহীর পরিবেশ অধিদপ্তর বরাবর লিখিত অভিযোগ পত্রটি প্রত্যাহার করা হয়েছে মর্মে একটি আবেদন জমা দেন জমির মালিক।
উল্লেখ্য যে, অভিযোগ প্রত্যাহারকারী স্বাক্ষরকারীগণের অধিকাংশ ব্যক্তির উক্ত স্থানে কোন জমি নেই বলে জানান ভুক্তভোগী কৃষকরা। জালিয়াতি ও প্রতারণার সীমাবদ্ধতা এখানেই শেষ হয়নি। জালিয়াতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে জেল হাজতে থাকা শাহাবুদ্দিন (হিটলার) নামক এক ব্যক্তির স্বাক্ষরও উক্ত প্রত্যাহারকৃত আবেদন পত্রে দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও অনেক কৃষকের স্বাক্ষর নকল করেও উক্ত প্রত্যাহারকৃত আবেদনপত্রে দেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগী ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের পক্ষে রাজশাহী জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ পত্রের প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসকের পক্ষে সহকারী কমিশনার (তথ্য ও অভিযোগ শাখা) এ বিষয়ে গত ০৫-০১-২০২১ ইং তারিখে উক্ত অভিযোগ পত্রের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বরাবর একটি চিঠি প্রদান করেন। ভুক্তভোগী কৃষকদের লিখিত অভিযোগপত্র ও জেলা প্রশাসক দপ্তর থেকে নির্দেশনামূলক চিঠি প্রাপ্তির বিষয়টি সম্পর্কে সত্যতা স্বীকার করেন গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার জানে আলম।
তিনি আরো বলেন, জেলা প্রশাসকের দপ্তর থেকে চিঠি আসা মাত্রই এসি ল্যান্ড কর্তৃক অভিযোগের সত্যতা সরেজমিনে তদন্তের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি আরো নিশ্চয়তা প্রদান করতে গিয়ে বলেন, আমি নিজেও আজ (বুধবার) উক্ত অভিযুক্ত স্থানে সরেজমিনে গিয়ে তদন্ত করবো। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণেরও নিশ্চয়তা দেন গোদাগাড়ী নির্বাহী অফিসার জানে আলম।
এ বিষয়ে গ্রামবাসি ও ভুক্তভোগী কৃষকেরা বলেন, যদি সরকারি কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে সত্যি সত্যি ইটভাটা নির্মাণ বন্ধ করা হয় তবে রক্ষা পাবে তিন ফসলী জমিসহ আম ও পেয়ারার বাগান। এছাড়াও রক্ষা পাবে এলাকার পরিবেশের ভারসাম্য। সবাই মুক্ত হবেন সম্ভাব্য ক্ষতিকর ইটভাটার নির্গত দূষিত বাতাস থেকেও।