এফএনএস : ভাগ্যোন্নয়নে বিদেশ যেতে গিয়ে দালালের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হওয়া থেকে শুরু করে অন্ধকার পথে পা বাড়ানোর বিষয়ে পুনরায় সতর্ক করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, সোনার হরিণের আশায় কেউ দয়া করে অন্ধের মতো ছুটবেন না। দালালের খপ্পরে পড়বেন না। গতকাল বুধবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস ২০২১ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে অংশ নেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আসলে মানুষ অনেক সময় নানা ধরনের কথা চিন্তা করে, ভাবে বিদেশে গেলে অনেক অর্থ উপার্জন করবে; সেখানে কিছুকিছু দালালের খপ্পরে অনেকে পড়ে অন্ধকারের পথে পা বাড়ায়। সেখানেও আমি তাদের বলবো, আপনারা এ ধরনের পরিস্থিতির শিকার হবেন না। দালালের খপ্পরে পড়বেন না। এখন আমাদের দেশে কাজেরও যেমন অভাব নেই, খাবারেরও অভাব নেই আল্লাহর রহমতে। কাজেই এখন আর সোনার হরিণের আশায় কেউ দয়া করে অন্ধের মতো ছুটবেন না। আপনারা নিবন্ধন করে তার মাধ্যমে যান, সেটাই আমরা চাই।
দালালদের খপ্পরে পড়ে সব হারানোর বিষয়ে সবাইকে সতর্ক করে সরকার প্রধান বলেন, আপনারা কারো প্ররোচনায় বিদেশে গিয়ে বিপদে পড়লে সেটা নিজেদের জন্য, পরিবারের জন্য খুবই কষ্টকর, খুবই ক্ষতিকর। আপনারা জানেন যে কিছুদিন আগে লিবিয়ায় কতজনকে জীবন দিতে হলো। এমন পরিস্থিতির শিকার যেন আমার দেশের মানুষকে হতে না হয়। শেখ হাসিনা বলেন, অনেক সময় যারা বিদেশে যাবে, তারা ধোকায় পড়ে লাখ লাখ টাকা খরচ করে, এজন্য ভিটেমাটি, জমি বিক্রি করে অথবা বন্ধক রাখে। কিন্তু যে সোনার হরিণ ধরবার জন্য বিদেশে ছোটে, সেখানে গিয়ে দেখে সেই বেতনও পাচ্ছে না। আরও মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে।
একদিকে যেমন নিজেদের সম্পত্তি হারানো, অন্য দিকে সেখানে গিয়ে উপযুক্ত কাজের অভাব। এ ধরনের অবস্থাও আমরা দেখেছি। বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে ভিটেমাটি বিক্রি বা বন্ধক না রেখে প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা যারা বিদেশ যাবেন, তারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে যেতে পারবেন, খুব স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়া হয়। এ টাকা ব্যাংকে পাঠিয়ে ঋণ শোধ করতে পারবেন। জমিজমা বিক্রি বা বন্ধক রাখতে হবে না। বিদেশে যাওয়ার আগে নিবন্ধন করার করার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, সমগ্র বাংলাদেশে যেসব ডিজিটাল সেন্টার করে দিয়েছি, তারই মাধ্যমে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে নিবন্ধন করার সুযোগ আছে।
আর নিবন্ধিত যারা যেখানেই কাজের সুযোগ পায়, তাদের সেখানে পাঠানো হয়। কাজেই সেজন্য ধৈর্য্য ধরতে হবে। অভিবাসী কর্মীদের নিবন্ধন এবং প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করে এসব বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদেশ গমনেচ্ছুরা নিবন্ধন করে নিয়ম মাফিক যান, সেটাই আমরা চাই। কেননা, প্রবাসী কর্মীদের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য আমাদের সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে আরো নজরদারি করতে হবে এবং বিদেশে কর্মী পাঠানোয় সম্পৃক্তদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রবাসীদের কর্মসংস্থান ঠিকমত হচ্ছে কি না, কর্মস্থলের নিরাপত্তা, বিশেষকরে নারী কর্মীদের নিরাপত্তার বিষয়ে সকলকেই লক্ষ্য রাখতে হবে। কারণ দায়িত্বটা আপনাদের ওপরই বর্তায়, যোগ করেন তিনি। শেখ হাসিনা বলেন, অনেকেই এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ না নিয়ে কোনভাবে একটি সার্টিফিকেট নিয়ে নেন এবং বিদেশে গিয়ে সমস্যায় পড়েন। কাজেই, এই কাজটি না করে আন্তরিকতার সঙ্গে প্রশিক্ষণ নিয়ে গেলে কেউ আর বিদেশ গিয়ে হেনস্থার শিকার হবেন না।
তিনি বলেন, আমরা যে সমস্ত ডিজিটাল সেন্টার করেছি, তার মাধ্যমে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে নিবন্ধন করার যে সুযোগ রয়েছে তাকে কাজে লাগান। যেখানেই কাজের সুযোগ হয় সেখানে নিবন্ধিতদের মধ্য থেকেই প্রেরণ করা হয়। কাজেই ধৈর্য্য ধরতে হবে। নিজেদের নিরাপত্তার কথা এবং পরিবারের কথাটা সব সময় চিন্তা করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, কারো প্ররোচনায় বিদেশে গিয়ে কেউ বিপদে পড়লে সেটা নিজেদের জন্য এবং তার পরিবারের জন্য খুবই ক্ষতিকর এবং কষ্টদায়ক হয়। গত মে মাসে যুদ্ধ বিগ্রহ চলমান তেল সমৃদ্ধ দেশ লিবিয়াতে মরুভূমি পেরিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ কালে পাচারকারি চক্রের নির্যাতন ও হত্যার শিকার বাংলাদেশীদের হৃদয় বিদারক ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, কিছুদিন আগে লিবিয়াতে কতজনকে জীবন দিতে হলো।
এই পরিস্থিতির শিকার যেন আমাদের দেশের মানুষকে আর হতে না হয়। তিনি সেখানে আটকে পড়াদের আর্থিক সহায়তা প্রদান থেকে শুরু করে উদ্ধারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপ গ্রহণেরও উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের কর্মীরা যেসব দেশে কাজ নিয়ে যান সেখানকার সরকার ও রাষ্ট্র প্রধান এবং নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনায় তিনি এবং তাঁর সরকার সব সময় সে দেশের উন্নয়নে বাংলাদেশী শ্রমিকদের ভূমিকা তুলে ধরেন। সরকার প্রধান বলেন, আমার দেশের মানুষ আমার কাছে অনেক সম্মানের এবং বাইরে গিয়ে যেন তারা অসম্মানে না পড়েন, সেদিকে লক্ষ্য রেখেই আমরা কাজ করছি। তিনি বলেন, সে জন্যই চলমান মুজিববর্ষে এবারের আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবসের জন্য আমাদের প্রতিপাদ্য হচ্ছে- ‘মুজিববর্ষের আহ্বান দক্ষ হয়ে বিদেশ যান।’
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, আমাদের দেয়া প্রণোদণার ফলে প্রবাসি রেমিটেন্সও আজকে বেড়েছে, সেজন্য তাদেরকে আমি ধন্যবাদ জানাই। শুধুমাত্র বৈধ ও নিবন্ধিত অভিবাসী মৃত কর্মীর পরিবারকে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তহবিল থেকে ক্ষতিপূরণ বাবদ ৩ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদানের বিধানটিও করোনা পরিস্থিতিতে পরিবর্তন করা হয়েছে বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় বর্তমানে করোনা ভাইরাসে মৃত্যুবরণকারী নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত নির্বিশেষে সকল প্রবাসী কর্মীর পরিবারকে পুনর্বাসনের জন্য ৩ লাখ টাকা প্রদান করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনাভাইরাসে যারা ক্ষতিগ্রস্থ অবশ্যই তাদেরকে আমাদের দেখতে হবে।
করোনার কারণে বিশ^ অর্থনীতির স্থবিরতায় অনেক প্রবাসী কর্মীদের দেশে ফিরতে বাধ্য হওয়ায় তাদের পূনর্বাসনে আওয়ামী লীগ সরকারের ভূমিকাও প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অনেকে আজকে করোনার কারণে কাজ হারাচ্ছেন। তারপরেও আমি বলবো যারা দেশে ফিরে এসেছেন তাদের জন্য আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা আমাদের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক, এসএমই ফাউন্ডেশন বা অন্যান্য ক্ষেত্রে আমরা যে প্রণোদনা দিচ্ছি সেখান থেকে বা ঋণ নিয়ে নিজেরা ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারেন।
তিনি বলেন, বিদেশ ফেরত কর্মীদের আর্থিকভাবে পুনর্বাসনের জন্য ৭ শ’কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রায়াত্ত বিশেষায়িত ‘প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক’-এর মাধ্যমে সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে প্রবাসীগণ এই ঋণ নিতে পারবেন। তিনি আরো বলেন, আপনারা হতাশ না হয়ে পূর্নোদ্যমে নিজেরা নিজের দেশে কাজ করুন। আমাদের পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল, কর্ণফুলী টানেল, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ বহু মেগা প্রজেক্ট অব্যাহত রয়েছে, যেখানে বহু কর্মী কাজ পেয়েছেন এবং তাদের অভিজ্ঞতার ভান্ডার সম্প্রসারিত হচ্ছে। এর মাধ্যমে দেশে-বিদেশে তাদের আরো নতুন কাজের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে, বলেন তিনি।