শাহানুর রহমান রানা : “সুইসাইড নোট” এই সময়ের আলোচিত একটি বিষয়। যখন কোনো ব্যক্তি তার মৃত্যুর পূর্বে মৃত্যুর কারণ সংবলিত কোনো বক্তব্য লিখে যান, ওই বক্তব্যকেই সুইসাইড নোট বলে। এর সাথে সম্পৃক্ত থাকে মৃত্যুতে সহযোগিতা বা আত্মহত্যার প্ররোচনা। বাংলাদেশে প্রচলিত সাক্ষ্য আইন-১৮৭২ এর ৩২ ধারা অনুযায়ী উক্ত সুইসাইড নোট প্রাসঙ্গিক সাক্ষ্য হিসেবে গণ্য হবে। তবে শুধুমাত্র একটি সুইসাইড নোটের ভিত্তিতে কাউকে শাস্তি দেওয়া যাবে না। যখন উক্ত সুইসাইড নোটের সমর্থনে অপরাপর সাক্ষ্য উপস্থাপন এর মাধ্যমে কারো বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ সন্দেহের বহির্ভূতভাবে প্রমাণিত হবে তখনই শাস্তি প্রদান করা যাবে।
তাই নির্দ্বিধায় বলা চলে আত্মহত্যার পেছনে কোন ব্যক্তি বা কারো প্ররোচনা বা সহোযোগিতা থেকে থাকলে থানায় মামলা দায়েরপূর্বক উক্ত ব্যক্তি বা ব্যক্তিগণকে গ্রেফতার করে যথাযথ নিয়মে বিজ্ঞ আদালতের নিকট সোপর্দ করা একটি আইনী বাধ্যবাধকতা। কিন্তু, রাজশাহীর কাটাখালি থানা আত্মহত্যায় প্ররোচনাদানকারী আকাশের চারবন্ধুকে গ্রেফতার করাতো দূরের কথা আত্মহত্যার প্ররোচনায় মামলা না নিয়ে একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করেছেন বলে অভিযোগ ভ্ক্তুভোগী পরিবারের।
উল্লেখ্য, গেল নভেম্বর মাসের ২৫ তারিখে কাটাখালি থানাধীন কুখুন্ডি গ্রামের আবু তালুকদারের ছোট ছেলে মারুফ হোসেন আকাশের ধারে ক্রয়কীত একটি অপ্প মোবাইল সেট তারই চারবন্ধু প্রথমে আকাশকে ও পরবর্তীতে সেটিফেরত চাইতে গেলে মারধর করে জোড়পূর্বক কেড়ে নেওয়ার পাশাপাশি ত্রিশ হাজার টাকা না দিলে তাকে চোর বলে গ্রামের সকলের সামনে অপদস্ত করার হুমকি দেবার পরেরদিন ২৬ নভেম্বর আকাশ নিজ কক্ষে গলায় ওড়না পেচিয়ে আত্মহত্যা করে। আত্মহত্যার পেছনে আকাশ তার লিখা একটি সুইসাইড নোটে ঐ চারবন্ধুরকে তার মৃত্যুর জন্য দায়ি করলেও তাদেরকে আইনের আওতায় না এনে উপরন্তু, থানা পুলিশ উল্টো আকাশের পরিবারের কাছে ত্রিশ হাজার টাকা দাবি করেছেন বলে অভিযোগ আকাশের পরিবারের সদস্যদের!
গেল ২৬ নভেম্বর সকালে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটলেও আজ অবদি পুলিশ আকাশের সেই চারবন্ধুকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হননি! বর্তমান ডিজিটালাইজেশনের যুগেও কাটাখালি থানা পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তির সহযোগিতায় ঐ চারবন্ধুর কোন হদিস না পেলেও গ্রামের বাসিন্দাদের তথ্য মতে, ঐ চারজন নিজ গ্রামসহ আশেপাশের গ্রামে নিয়মিতভাবেই ঘোরাফেরা করা ছাড়াও বিভিন্ন হোটেলে সেরে নিচ্ছেন দুপুর আর রাতের খাবার! উক্ত মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই শাহীন ও ওসি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, তাদেরকে গ্রেফতার করতে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
তবে, অভিযোগ উঠেছে আকাশের সেই চারবন্ধুকে আইনের হাত থেকে রক্ষার করার জন্য প্রভাবশালী বেশ কয়েকজন ব্যক্তি নানা জায়গায় জোর ততবির চালাচ্ছেন প্রথমদিন থেকেই। কাটাখালি থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনা মামলা না নেওয়াতে আকাশের বড় ভাই আল-আমিন বাদী হয়ে আত্মহত্যার চারদিন পর গত ১-১২-২০২১ ইং তারিখে রাজশাহী মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও কাটাখালি থানা আমলী আদালতে আত্মহত্যায় প্ররোচনাদানকারী হিসেবে আকাশের চারবন্ধুর নামে একটি নালীশি মামলা দায়ের করেন।
বর্তমানে অভিযোগটি ‘পিবিআই’ কে দেয়া হয়েছে তদন্ত সাপেক্ষে প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য। আদালতে দায়ের করা নালীশি মামলা-অভিযোগের কাগজপত্র ও আকাশের পরিবারের দেয়া তথ্যানুযায়ী আকাশের মৃত্যুর পেছনে রবিন, হৃদয়, সজল ও জুয়েল এর প্রত্যক্ষ প্ররোচনা রয়েছে। পরবর্তী প্রতিবেদনে প্ররোচনার বিষয়গুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুলে ধরা হবে।
এ বিষয়ে আরো বেশি তথ্য জানার জন্য কুখুন্ডি গ্রাম, রনহাট, মোসলেমের মোড় ছাড়াও আশেপাশের বেশ কয়েকটি স্থানে সরেজমিনে গেলে জানতে পারা যায় আকাশের সেই চারবন্ধুর বিভিন্ন ধরনের কীর্তিকলাপ। গ্রামের মহিলারা ছাড়া আরো অনেকেই বলেন, অভিযুক্ত রবিন, হৃদয়, সজল ও জুয়েল এই চারজনের অত্যাচারে গ্রামে বসবাস করা দায় হয়ে পড়েছে। ছোট্ট কোন বিষয়কে কেন্দ্র করে তারা যাকে তাকে মারধর করে। তাদের কাছে সর্বদাই অস্ত্র থাকে বিধায় তারা অপরাধ করলেও গ্রামের অনেকেই ভয়ে মুখ খোলেন না। মোসলেমের মোড় এলাকার ব্যবসায়ি উজ্জল এর কাছ থেকেও এই চারজন একটি মোবাইল সেট জোড়পূর্বক কেড়ে নিয়েছে গত ২৫ নভেম্বর রাতে বলেও ক্ষতিগ্রস্থ ব্যবসায়ী উজ্জল জানান।
মালবাহী কোন ট্রাক গ্রামে প্রবেশ করলে সেটিকে থামিয়েও চাঁদা নেবার অভিযোগ আছে বলেও জানান কুখুন্ডি গ্রামের অনেকেই। তাদের চারজনকে দেখলে গ্রামের যুবতী মেয়েরাসহ ভাল মানুষেরা রাস্তা পরিবর্তন করে অন্যদিক দিয়ে চলাচল করেন বলেও অভিযোগ অনেকের। আকাশ হত্যার বিষয়টি নিয়ে সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে ন্যায় বিচারের দাবি জানান তার পরিবার ও স্বজনরা। কেউ কেউ এবিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, শুনেছি এবছরে নাকি আরএমপি’র শ্রেষ্ঠ অফিসার্স ইনচার্জ হিসেবে কাটাখালি থানার ওসি সিদ্দিকুর রহমান পুরষ্কিত হয়েছেন। তিনি যদি শ্রেষ্ঠ ওসি’ই হয়ে থাকেন তবে কেনো আকাশের মৃত্যুটি আত্মহত্যায় প্ররোচনা হিসেবে মামলা নিত চাননি। উপরন্তু, তড়িঘড়ি করে একটি ইউডি (অপমৃত্যু) মামলা দায়ের করে নিজের দায়িত্ব ও কতর্ব্যবোধকে প্রমাণ করতে চাইলেন! বিষয়টি অনেকের কাছেই প্রশ্নবিদ্ধ হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে বলে মন্তব্য অনেকের।