প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, উপজেলা পর্যায়ে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী ও ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান। চিকিৎসকের উপদেশ আন্তরিক ব্যবহার রোগীর কাছে ওষুধের মতো কার্যকরী হয়ে ওঠে। তাই চিকিৎসকদের জন্য পেশাগত উৎকর্ষতার পাশাপাশি মানবিক মানুষ হয়ে ওঠাও জরুরি। শনিবার (১১ জুলাই) দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ‘ডিএমসি ডে-২০২৬’-এর উদ্বোধন শেষে প্রতিষ্ঠানের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকায়নে ডিএমসিয়ানদের ভাবনা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় চিকিৎসকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যেই হাসপাতালগুলোতে ১০ জন করে আনসার সদস্য ও রোগীদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতে আরও পাঁচ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট, মিডওয়াইফ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য পেশাজীবীর বিদ্যমান শূন্যপদ পূরণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’ সরকার এই নীতিতে সবার কাছে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে চায়। অনেক বিষয় সম্পর্কে আগেভাগেই স্বাস্থ্যসম্মত পরামর্শ পেলে শুরুতেই রোগের নিরাময় অনেকাংশেই সহজ হয়ে যায়। তাই পরামর্শ অনুযায়ী সচেতনতা অবলম্বন করলে নিয়মিত পরীক্ষা এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে অনেক রোগ গোড়াতেই নিরাময় কিংবা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণ যাতে শুরুতেই স্বাস্থ্যসেবা পরামর্শ পায় এ লক্ষ্যে সরকার সারা দেশে এক লাখ হেলথ কেয়ারার বা স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এদের মধ্যে ৮০ শতাংশ হবেন নারী হেলথ কেয়ারার। যারা পরিবারভিত্তিক প্রতিরোধমূলক ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেবেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, একজন চিকিৎসক হওয়ার জন্য অধ্যয়নরত প্রতিটি মানুষের মনোজগতে আপনাদের অবস্থান তাদের সুস্থ জীবনের রক্ষক হিসেবে বিবেচিত। এ উপলব্ধি থেকেই, সম্প্রতি উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের একটি অনুষ্ঠানে আমি বলেছিলাম, চিকিসকই সত্যিকার অর্থে মানুষের বিপদের বন্ধু। চিকিৎসকই রোগে শোকে কাতর মানুষটির পরম বন্ধু হয়ে ওঠেন। একজনের চিকিৎসকের উপদেশ আন্তরিক ব্যবহারও একজন রোগীর কাছে ঔষধের মতো কার্যকরী হয়ে ওঠে। সুতরাং, একজন চিকিৎসকের জন্য পেশাগত উৎকর্ষতার পাশাপাশি মানবিক মানুষ হয়ে ওঠাও জরুরি।
সেরা বাজেট : প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষাখাতের পর সরকার দেশের ইতিহাসে এবারই স্বাস্থ্যখাতে সবচেয়ে বেশি বাজেট বরাদ্দ দিয়েছে। এ বছর জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দের পরিমাণ ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা। এই বরাদ্দ জিডিপির ১ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। পর্যায়ক্রমে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দের পরিমাণ আগামী ৫ বছরে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, শুধু বাজেট বৃদ্ধি নয়, সরকার বিভিন্ন চিকিৎসা সামগ্রী এবং কয়েকটি ক্ষেত্রে চিকিৎসা ব্যয় কমিয়েছে। ডায়ালাইসিস ফিল্টার, হার্টের স্টেন্ট, হার্টের ভাল্ব, পেসমেকার, অক্সিজেনাটোরস, পেরিফেরাল ভাসকুলার স্টেন্ট, রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি এবলেশন ফাইবার, চোখের লেন্স এবং ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু কাঁচামালের ওপর ভ্যাট এবং ট্যাক্স কমানো হয়েছে। কোনা কোনা ক্ষেত্রে ট্যাক্স সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। তিনি জানান, দেশের ৫০০টি উপজেলার মধ্যে বর্তমানে মাত্র পাঁচটিতে ১০০ বেডের হাসপাতাল রয়েছে। উপজেলাগুলোর জনসংখ্যার তুলনায় এটি অপ্রতুল। ফলে চিকিৎসার প্রয়োজনে রোগীদেরকে শহরমুখী হতে হয়। এ কারণে সরকার দেশের সবকটি উপজেলায় বর্তমানে বিদ্যমান ৩১ থেকে ৫১ বেডের প্রতিটি হাসপাতালকে পর্যায়ক্রমে ১০১ বেডে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষা : প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের শিশুরাই আগামীর বাংলাদেশ। তাই শিশু স্বাস্থ্য রক্ষায়ও বর্তমান সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। তিনি জানান সরকার ইতোমধ্যেই শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বরিশাল ও রাজশাহীতে নির্মিত ২০০ শয্যাবিশিষ্ট শিশু হাসপাতালসহ মোট পাঁচটি শিশু হাসপাতাল দ্রুত চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এতে বিশেষায়িত শিশুচিকিৎসারাজধানীকেন্দ্রিক না থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সহজলভ্য হবে।
মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা : প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিজ্ঞানসম্মত ডিসপোজ কিংবা অপসারণের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই সবাই মিলে মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিজ্ঞানসম্মতভাবে অপসারণ এবং হাসপাতালগুলোকে ক্লিন রাখার চেষ্টা করতে হবে। আজকের শিক্ষার্থী-ইন্টার্নিদের হাত ধরেই চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখিতা বন্ধ হবে।
হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জেলা-উপজেলার হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ অব্যাহত রেখেছে সরকার। বিশেষ করে গ্রামের রোগীদের ঢাকামুখী প্রবণতা কমানোরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সে জন্য জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি সেবার মান উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, খ্যাতিমান ও বড় চিকিৎসকদের প্রান্তিক পর্যায়ে গিয়ে সেবা দেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের উদার দৃষ্টিভঙ্গি প্রত্যাশা করেন তিনি। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল শুধু একটি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি বাংলাদেশের ইতিহাসেরও জীবন্ত সাক্ষী। ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানÑদেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়েই এই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ শুধু দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান চিকিৎসকই তৈরি করেনি; এই প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষক, গবেষক, সমাজনেতা ও মুক্তিযোদ্ধাসহ বহু কৃতী মানুষ বের হয়েছেন। মানুষের জীবন রক্ষায় নিজেদের জীবন ও স্বার্থ উৎসর্গ করতেও তারা কখনও কুণ্ঠাবোধ করেননি। তিনি বলেন, ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী, শিক্ষক, চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীসহ এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানাই। একই সঙ্গে যেসব মহান মানুষ আজ আমাদের মধ্যে নেই, তাদেরও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। তাদের রেখে যাওয়া এই প্রতিষ্ঠান আজও মানুষের সেবায় অনন্য ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, দীর্ঘ পথচলায় দেশের প্রায় প্রতিটি মানুষের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রাজধানীবাসীর চিকিৎসাসেবার অন্যতম ভরসার জায়গা এই হাসপাতাল। এর প্রতিটি ওয়ার্ড ও করিডোর প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের আশা-নিরাশা, আনন্দ-বেদনা এবং নতুন জীবনের গল্পের সাক্ষী হয়ে থাকে। তিনি বলেন, এখানে যেমন প্রতিদিন অনেক জীবনের অবসান ঘটে, তেমনি অসংখ্য নতুন জীবনেরও সূচনা হয়। স্টেথোস্কোপের এক প্রান্তে যখন একজন চিকিৎসকের কান থাকে, অন্য প্রান্তে তখন স্পন্দিত হয় একটি মানুষের জীবন। চিকিৎসক ও রোগীকে ঘিরেই আবর্তিত হয় একটি পরিবারের অগাধ বিশ্বাস। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল, প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত, সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী ও প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান প্রমুখ।-এফএনএস