স্টাফ রিপোর্টার : গেল বছরের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের অক্টোবর রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২২ জন সাপেকাটা রোগীর মৃত্যু হয়েছে। তবে মারা যাওয়া অধিকাংশ রোগীই সাপে কামড়ানোর নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দেরিতে হাসপাতালে পৌঁছার কারণে তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। রামেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে- গত ১ বছরে (নভেম্বর ২০২০-অক্টোবর ২০২১) ৫৮২ জন সাপেকাটা রোগী এই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলো। এদের মধ্যে ১১৪ জনের শরীরে ‘এন্টিভেনাম’ প্রয়োগ করা হয়।
গত ১ বছরে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ২২ জন সাপেকাটা রোগী মারাও যায়। বাকিরা সবাই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। এদিকে সাপেকাটা রোগী যাতে চিকিৎসার অভাবে না মারা যায় সেজন্য রাজশাহীর ৯টি উপজেলা স্বাস্থ কমপ্লেক্সেও পূর্ণকোর্স চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এমনকি বর্তমানে এসব স্বাস্থ কমপ্লেক্সে সাপেকাটা রোগীর জন্য ‘এন্টিভেনাম’ ভ্যাকসিনও সংরক্ষিত রাখা হচ্ছে। ফলে কাউকে বিষধর সাপে কামড়ালেও দ্রুত নিকটতম স্বাস্থ কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে অকাল মৃত্যুর ছোঁবল থেকে হয়তো অনেকেই রক্ষা পাবেন। সূত্র জানায়, চলতি বছরে জুলাই-আগস্ট মাসে বিষধর রাসেল ভাইপার সাপ নিয়ে রাজশাহীতে পদ্মাপাড়ে জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ওই সময় পদ্মাপাড়ের লোকজন কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রায় শতাধিক সাপ পিটিয়ে মেরে ফেলে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিশ্বের পাঁচ নম্বর ভয়ংকর বিষধর সাপ এই রাসেল ভাইপার। প্রথম স্থানে রয়েছে রাসেল ভাইপার সাপের কামড়ের ক্ষিপ্রতা। এ ছাড়া বিশ্বে দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ বিষদাঁত রাসেল ভাইপারের। এই সাপের বিষ ‘হেমোটক্সিন’ হওয়ায় মাংস পঁচে আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু হয়। আর বিপন্ন প্রজাতির এই সাপ সাধারণত নদীর তীরবর্তী এলাকা ও চরের মধ্যে অবস্থান করে থাকে। সংশ্লিষ্টরা ওই সময় ধারণা করেছিলেন- নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় ভারত থেকে এই সাপগুলো পদ্মার তীরে উঠে আসে।
রাসেল ভাইপার যেহেতু চরাঞ্চলে বসবাস করে তাই দুই-তিন মাস আগে বর্ষাকালের ওই সময় নদীতে পানি বাড়ায় সাপগুলো আশ্রয় নিয়েছিলো তীরবর্তী এলাকায়। ফলে ওই সময় পদ্মা নদীর ধার ঘেষাঁ পরিবারগুলো এ বিষধর সাপের আতঙ্কে দিন পাড় করছিলো। রাজশাহী সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা গেছে- আগে রাজশাহীতে সাপেকাটা রোগীর পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসার কোর্স হিসেবে একমাত্র ভরসা ছিল রামেক হাসপাতাল। শুধু রামেক হাসপাতালেই বিষধর সাপে কামড়ানো রোগীদের জন্য ভ্যাকসিন অর্থাৎ ‘এন্টিভেনাম’ প্রয়োগ করা হতো।
কিছুদিন আগে রাজশাহী অঞ্চলে রাসেল ভাইপারসহ অন্যান্য বিষধর সাপের উৎপাত বেড়ে যাওয়ায় স্বাস্থ অধিদপ্তরের নির্দেশে রাজশাহীর উপজেলা স্বাস্থ কমপ্লেক্সগুলোতে সাপেকাটা রোগীর পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাঘা উপজেলা স্বাস্থ কমপ্লেক্সের ইমারজেন্সি মেডিক্যাল অফিসার ডা. কামরুন্নাহার কান্তা বলেন, ‘আগে উপজেলা স্বাস্থ কমপ্লেক্সে সাপেকাটা রোগীদের চিকিৎসার জন্য পূর্ণাঙ্গ কোর্স ছিল না। সম্প্রতি সিভিল সার্জন অফিস থেকে স্বাস্থ কমপ্লেক্সে ‘এন্টিভেনাম’সহ প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র সরবরাহ করা হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় স্বাস্থ কমপ্লেক্সে ২৫টি এন্টিভেনাম সরবরাহ করা হয়েছিল।
গত মাসে দুইজন সাপেকাটা রোগী বাঘা স্বাস্থ কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়েছিল। এদের মধ্যে একজনকে বিষধর সাপে কেটেছিল। তাকে সিভিল সার্জন অফিস থেকে সরবরাহ করা ‘এন্টিভেনাম’ প্রয়োগ করায় ওই রোগী প্রাণে বেঁচে যায়।’ রামেক হাসপাতাল পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী বলেন, ‘রাজশাহী অঞ্চলে বিষধর সাপের উৎপাত অন্যান্য এলাকার চেয়ে একটু বেশি। কিন্তু এতদঅঞ্চলে রামেক হাসপাতাল ছাড়া অন্য কোথাও সাপেকাটা রোগীর চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল না। যার কারণে সাপেকাট রোগী নির্ধারিত সময়ের পরে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় গত এক বছরে ২২ জন মারা গিয়েছে। তবে সম্প্রতি উপজেলা স্বাস্থ কমপ্লেক্সে এর চিকিৎসার ব্যবস্থা করায় হয়তো সাপের কামড়ে মারা যাওয়া রোগীর সংখ্যা কমে আসবে।’
রাজশাহীর ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মো. রাজিউল ইসলাম বলেন, ‘উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে আগে সাপেকাটা রোগীর জন্য প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল। বর্তমানে প্রত্যেক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অন্তত ২ জন সাপেকাটা রোগীর জন্য এন্টিভেনামসহ প্রয়োজনীয় যাবতীয় ওষুধ সরবাহ করা হচ্ছে। এছাড়া প্রত্যেক মাসিক মিটিংয়ে সাপেকাটা রোগীর জন্য ওষুধ মজুদ আছে কিনা সেটির খোঁজ-খবর নেয়া হচ্ছে। আশা করছি, সাপেকাটার পর দেরি না করে সংশ্লিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে রোগী প্রাণে বেঁচে যাবে।’