শাহানুর রহমান রানা : গতকাল থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয়েছে ২০২০-২১ শিক্ষা বর্ষের ভর্তি পরীক্ষা। যার কারণে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী প্রবেশ করেছে রাজশাহী মহানগরীতে। অতিরিক্ত শিক্ষার্থী আর তাদের অভিভাবকদের আগমনের জন্য একদিকে নগরীর রাস্তাগুলোতে চলাচল বৃদ্ধি পেয়েছে ছোট ও হালকা বাহনের; ঠিক একই কারণে নগরীর অধিকাংশ রাস্তাতে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় জ্যামের। একদিকে, জ্যামের ভোগান্তি তো অন্যদিকে, প্রায় চার থেকে পাঁচগুণ ভাড়ার বিষয়টি নিয়ে নাজেহাল আগত পরীক্ষার্থীরা। যদিও রিক্সা-অটোরিক্সা সমিতিকে ভর্তিচ্ছুদের কাছ থেকে ভাড়া বেশী না নিতে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন আগেই অনুরোধ করেছিলো কিন্তু কে শুনে কার কথা!
বিশ টাকার ভাড়া আশি, চল্লিশের ভাড়া দুইশ, আর তিন থেকে চার কিলোমিটারের উর্দ্ধে হলে কেউ কেউ ভাড়া হাকিয়েছেন তিন থেকে চারশ টাকা পর্যন্তও! ট্রাফিক জ্যাম আর অতিরিক্ত ভাড়ার বেড়াজালে নাজেহাল হয়েছেন শহরের স্থানীয় বাসিন্দারাও। অতিরিক্ত ভাড়া চাওয়ার জন্য অনেকেই এই ভ্যাপসা গরমে দাঁড়িয়ে ছিলেন রাস্তার ধার ঘেঁষে। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে পায়ে হেঁটেই শুরু করেছিলেন গন্তব্যস্থানে পৌছানোর জন্য। সাধ্যের চাইতেও অতিরিক্ত ভাড়ার বিষয়টি নিয়ে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই করেছেন বিরূপ মন্তব্য।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র থেকে জানা গেছে, ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক প্রথম বর্ষের এবারের ভর্তি পরিক্ষায় ৪ ১৯১ আসনের বিপরীতে পরীক্ষা দিতে নিবন্ধন করেছেন ১ লাখ ২৭ হাজার ৬৪৭ জন্য শিক্ষার্থী। আজ মঙ্গলবার ‘এ’ (মানবিক) ইউনিট ও পরেরদিন বুধবার ‘বি’ (বাণিজ্য) ইউনিটের পরিক্ষার মধ্য দিয়ে শেষ হবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি যুদ্ধ।
গতকাল বেল বারোটা থেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত নগরীর রেলওয়ে স্টেশন আর বাসটার্মিনাল ও ভদ্রাস্থ বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখাগেছে, বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা ব্যাগ ও লাগেজ নিয়ে দাড়িয়ে আছেন তাদের গন্তব্যস্থানে যাবার উদ্দেশ্যে। কেউ যাচ্ছেন রিক্সা যোগে আবার কেউবা ইজিবাইকে করে। কিন্তু, বাহনে ওঠার পূর্বে অধিকাংশ শিক্ষার্থী ও চালকের মধ্যে লক্ষ্য করা গেছে বাকবিতন্ডার বিষয়টি। আর এই বাকবিতন্ডার প্রধান কারণ ছিল অতিরিক্ত ভাড়া। সামর্থবানরা অতিসহসায় পেয়ে গেছেন গন্তব্যে যাবার জন্য কোন না কোন বাহন। কিন্তু, যাদের কাছে অর্থ ছিল সীমিত তারা পড়েছিলেন বিপাকে। শুধু যে রিক্সা আর অটো ভাড়ায় ছিল বেশি তা কিন্তু নয়। স্টেশন ও বাসটার্মিনালের আশেপাশের খাবারের হোটেল ও চা-বিস্কিটের দোকনগুলোতেও ছিল খাবারের দাম তুলনামূলক অনেক বেশি বলে মন্তব্য আগতদের।
ঈশ্বরদী থেকে আসা কাউজিয়া এসেছেন ‘বি’ ইউনিটে পরীক্ষা দেবার জন্য। তার সাথে ছিলেন বান্ধবী রিফতি। তারা ট্রেন থেকে নেমে বিনোদপুর যাবার জন্য একটি অটোরিক্সা ভাড়া করছিলেন। রিক্সার প্যাটলার তাদের কাছে ভাড়া চেয়েছিলেন দুইশত টাকা! অন্যদিকে, ঢাকার উত্তরা থেকে ‘এ’ ও ‘বি’ ইউনিটের পরীক্ষার্থী রায়হান ট্রেন থেকে নেমে লক্ষিপুরস্থ পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পাশে যাবার জন্য রিক্সা ভাড়া করছিলেন। তার কাছে চালক চেয়েছেন চারশ টাকা! খুলনা থেকে রুনা ও শাম্মি এসেছেন ‘বি’ ইউনিটে পরীক্ষা দেবার জন্য। তাদের গন্তব্যস্থান ছিল উপশহর দুই নাম্বার সেক্টরে। তাদের কাছে ভাড়া চাওয়া হয়েছে। দুইশত পঞ্চাশ টাকা। এছাড়াও আগত শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের কাছ থেকে ইজিবাইকের ভাড়াও গতকাল নেয়া হয়েছে সচরাচর ভাড়ার চাইতে কয়েকগুণ বেশি।
পাঁচ টাকার ভাড়া বিশ টাকা। দশ ও পনের টাকার ভাড়া পঞ্চাশ টাকা। অতিরিক্ত ভাড়া নেবার বিষয়টিকে কেন্দ্র করে গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজলা ও বিনোদপুর গেটে শিক্ষার্থীরা বেশ কয়েকজন অটোচালক ও রিক্সার প্যাটলারকে মারধর করেছে বলেও জানায় স্থানীয় সূত্র। ঈশ্বরদী থেকে আসা কাউজিয়া, ঢাকা উত্তরার রায়হান ও খুলনা থেকে আসা রুনা ও শাম্মি এবিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, করোনার প্রাদুর্ভাবের মাসখানেক আগে রাজশাহী এসেছিলাম এক আত্মীয়ের বাসায়। ঐসময় ভাড়া ছিল ত্রিশ থেকে চল্লিশ টাকা। আর এবার, ঐ একই স্থানে যাবার জন্য ভাড়া চাওয়া হচ্ছে দুই থেকে তিনশ টাকা। ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদেরকে এমন জিম্মি করাটা কখনোই সভ্য সমাজের কাজ নয়। আমরা এই শহরে এসেছি অতিথী হিসেবে।
অতিথীদের সাথে এমন আচরণ আর জিম্মি করে চার থেকে পাঁচগুণ ভাড়া হাতিয়ে নেয়াটা এই শহরের মানুষের মানুষিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটাবে অন্যদের কাছে। আতিথেয়তা কিংবা সহোযোগিতামূলক মনোভাবের অভাব আমাদের সকলের মাঝে থাকাটা ব্যঞ্জনিয় বলেও মন্তব্য তাদের। এদিকে, কয়েকদিন আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাসিকের ১৯ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর তৌহিদুল হক সুমন একটি পোস্টে লিখেছিলেন, রাজশাহীতে যারা ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসবেন তাদের সাথে যেনো আমরা নগরবাসি বন্ধুসুলভ ও সহোযোগিতামূলক আচরণ করি। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়টি হলো সম্মানিত ঐ কাউন্সিলরের সেই আশাবাদ ব্যক্ত করাটাও আমরা ধুলিসাৎ করে দিয়েছি শিক্ষার্থীদেরকে অতিরিক্ত ভাড়ার বেড়াজালে ফেঁলে বলে মন্তব্য নগরীর একাধিক ফেসবুক ব্যবহারকারীদের। বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাইলে কাউন্সিলর সুমন বলেন, এমন ধরনের আচরণ করাটা ঠিক হয়নি শিক্ষার্থীদের সাথে। কারণ, রাজশাহী শহরের মানুষদের দেশজুড়ে একটি সুনাম আছে। যেটা ক্ষুণ্ন হলো নগরীতে চলাচলকারী চালকদের জন্য।