আর কে রতন : রাজশাহীতে লকডাউনের পঞ্চম দিনেও আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা শহরের প্রবেশ মুখে ও উপজেলাগুলোর প্রতিটি সীমান্ত পয়েন্টে কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। অযথা বাড়ী থেকে বের হওয়ার কারণে মানুষকে পদে পদে আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের জবাবদিহির মুখে পড়তে হয়েছে। রাজশাহী সিটি করপোরেশনসহ জেলার ৯টি উপজেলায় তিন প্লাটুন বিজিবি ও তিন প্লাটুন সেনাবাহিনী মোতায়েন রয়েছে। তারা কয়েকটি টিমে বিভক্ত রাজশাহী জুড়ে টহল দিচ্ছে।
এছাড়াও মানুষ যাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে সেজন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঠে রয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। প্রশাসন শক্ত অবস্থানে থাকার জন্য জেলা শহর ও উপজেলা শহরের রাজারগুলোতে এবং মেইন রোডে মানুষের উপস্থিতি না থাকলেও গ্রামাঞ্চলের মোড়ে মোড়ে অলিগলিতে এক শ্রেনীর মানুষরা সরকারি বিধি নিষেধ উপেক্ষা করে অযথা আড্ডা এবং ভীড় করছে। প্রশাসনের লোকজনের উপস্থিতি টের পেলে ঘাঁ ঢাকা দিলেও সুযোগ বোঝে আবার জমায়েত হচ্ছে।
রাজশাহীর উপজেলাগুলোর সদরে মানবশূন্য হলেও গ্রাম-গঞ্জের চিত্র ভিন্ন। বিশেষ করে পাড়া মহল্লার চায়ের দোকান, পানের দোকান, ক্যারাম বোর্ড খেলার দোকানসহ মোড়ে মোড়ে বেশ সংখ্যক মানুষের ভিড় চোখে পড়ছে। মরণঘাতী করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ফলে দেশের বিভিন্ন জেলায় হুহু করে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। সারা দেশের ন্যায় রাজশাহী জেলাতে ভাইরাসে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে।
দেশের মানুষকে ভয়ানক ভাইরাসের থাবা থেকে রক্ষার জন্য সরকারী সারা দেশে গত ১লা জুলাই হতে ৭ জুলাই পর্যন্ত সর্বাত্বক লকডাউন ঘোষণা কররেও জাতীয় কারিগরি কমিটির সুপারিশে এই চলমান সর্বাত্বক লকডাউন আগামী ১৪ জুলাই পর্যন্ত বাড়িয়ে গতকাল সোমবার প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করেছেন। সরকারি-বে সরকারি অফিস ছুটিসহ বিচ্ছিন্ন রয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। সংক্রমণ রোধে সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখতে হাট-বাজার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে রয়েছে বিধি-নিষেধ।
সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন উপজেলার বাজারগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, ঔষধের দোকান খোলা রাখার কথা থাকলেও, খোলা রাখছে চায়ের দোকানগুলো থেকে শুরু করে গ্রামের বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে পান, ধূমপান দোকান। কিছু এলাকায়, ক্যারাম খেলাসহ মাঠে ফুটবল-ক্রিকেট খেলায় ব্যস্ত লক্ষ্য করা গেছে যুবকদের।
উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ এসব বাজারগুলোতে সচেতনতামূলক অভিযান পরিচালনার পরেও মানুষের মধ্যে করোনার কোনো ভীতি বা আশংকা লক্ষ্য করা যাচ্ছেনা। প্রশাসনের লোক চলে যাওয়া মাত্রই, ফিরে আসে আগের অবস্থায়। কিছু কিছু মানুষ পুলিশের সাথে যেন চোর-পুলিশ খেলছে। পুলিশ গেলে পালিয়ে যায়। পুলিশ ফিরে আসলে আবার আড্ডায় মেতে ওঠে। এতে আতঙ্কের মধ্যে পড়েছে স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।
মোহনপুর বাজার বণিক সমিতির সভাপতি ও বিশিষ্ট মুদি ব্যবসায়ী আবুল হোসেন জানান, সামাজিক দুরত্ব অনেক কাস্টমার বুঝতেই চায় না। এক সঙ্গে ৪/৫ জনের বেশি লোক ভিড় করে। এতে আমার দোকানের লোকজনের জীবনেরও ভয় আছে। এজন্য কাস্টমারকে একজন করে আসতে বলি। দু’একজন কথা শুনলেও বেশির ভাগ লোক তা মানতে চায় না।
কেশরহাট পৌর বাজারের সবজি রেজাউল ইসলাম জানান, সবাই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়ে জানে কিন্তু মানেনা। ক্রেতারা আবার একাধিক দোকান ঘুরে বেড়াচ্ছে। এতে ভাইরাসের সংক্রমণ বিস্তার ছড়িয়ে পড়ার আশংকা রয়েছে। এসব বাজারে প্রশাসনের লোকজন নিয়মিতভাবে টহল দিলেও সাধারণ মানুষ সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে অনীহা দেখায়।
মোহনপুর থানা ইনচাজ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, জনসাধারনকে সুস্থ্য রাখতে প্রশাসনের লোকজন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দিন-রাত সমান ভাবে সচেতন করার পরেও ভয়াবহ করোনাকে অনেকেই পাত্তা দিচ্ছে না। তারপরও পুলিশ বাহিনী দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাবে। তিনি মোহনপুর তথা জেলার প্রত্যেকটি মানুষকে নিজের এবং পরিবারের জীবন রক্ষার্থে ঘরে থাকার আহ্বান জানান।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানওয়ার হোসেন বলেন, পুলিশ, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এর টহল অব্যাহত রয়েছে। যেখানে লোক সমাগম থাকবে সেখানেই ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া আছে। আমরা রাত-দিন পরিশ্রম করছি। জনগণকে বুঝানো চেষ্টা করছি। এ ছাড়াও সেনাবাহিনীর, বিজিবি ও র্যাব টিম টহল অব্যাহত আছে। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিফাত আরা বলেন, মানুষ যেনো স্বাস্থ্যবিধি মেনে, মাস্ক পড়ে তার জন্য আমরা উদ্বুদ্ধ করছি।
যারা এগুলো বিধি নিষেধ মানছেন না তাদের জরিমানা ও সতর্ক করা হচ্ছে। এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। সোমবার সকাল পর্যন্ত চিকিৎসাধীন অবস্থায় তারা মারা যান । রামেক হাসপাতালের পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এ নিয়ে জুলাই মাসের ৫ দিনে রামেক হাসপাতালে করোনা ও উপসর্গে ৮২ জনের মৃত্যু হলো। আর জুন মাসে মৃত্যু হয়েছে ৩৫৪ জনের। তিনি আরো বলেন, আজ সোমবার সকাল পর্যন্ত এ হাসপাতালের ৪০৫ বেডের বিপরীতে করোনা ও উপসর্গের রোগী ভর্তি রয়েছেন ৪৯৫ জন। গতকাল রবিবার ভর্তি ছিলেন ৪৮৫ জন।
অতিরিক্ত বেডের ব্যবস্থা করে অতিরিক্ত রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। রবিবার রাজশাহীর দুই ল্যাবে দুই জেলার ৬৫৪ জনের নমুনা পরীক্ষায় করোনা পজিটিভ হয়েছে ২১৮ জনের। এদিন রাতে প্রকাশিত দু’টি পিসিআর ল্যাবের নমুনার ফলাফলে দেখা যায়, রাজশাহী শনাক্তের হার ৩৪ দশমিক ০৯ শতাংশ। চাঁপাইনবাবগঞ্জে শনাক্তের হার ২১ দশমিক ০৫ শতাংশ।