দু’চোখ হারানো আইয়ুবের যুদ্ধ
হারুন আল রশীদ, ধামইরহাট : নওগাঁর ধামইরহাটে চোখের জ্যোতি নিভে গেলেও সংসার যুদ্ধে অপ্রতিরোধ্য দুই চোখ হারানো আইয়ুব হোসেন। অন্ধ হয়েও চানাচুর, বিস্কুট ও চা বিক্রি করে তিনি সংসার চালাচ্ছেন। অর্থের অভাবে চোখের আলো ফিরে পেতে চিকিৎসা করতে পারছেন না। ভূমিহীন ও গৃহহীণ হলেও মুজিববর্ষে তার ভাগ্যে জুটেনি মাথা গোঁজার আশ্রয় প্রধানমন্ত্রীর উপহার একটি বাড়ী।
জানা গেছে, উপজেলার ধামইরহাট ইউনিয়নের অন্তর্গত ঐতিহাসিক আলতাদিঘী (জোতমাহমুদপুর) গ্রামের মৃত ইয়াকুব আলীর ছেলে কৃষক আইয়ুব হোসেন (৫৬) প্রায় ১৬ বছর ধরে অন্ধ জীবন যাপন করছেন। দুই ছেলে দুই মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে সংসার বেশ ভালো চলছিল আইয়ুব হোসেনের।
নিজের কৃষি জমি না থাকলেও অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করতেন। কিন্ত ২০০৫ সালের কোন একদিন বিকেলে মাঠে ধানে সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করে সন্ধ্যার আগ মুর্হুতে বাড়ী ফিরছিলেন। বাড়ীর সন্নিকটে হটাৎ তার দুচোখ অকেজো হয়ে পড়ে। সেই থেকে পুরোপুরি দুচোখ অন্ধ হয়ে যায়। শুরু হয় তার অন্ধ জীবনের পথচলা। পরবর্তীতে দেশের বিভিন্নস্থানে চোখের চিকিৎসা করা পরও তেমন উন্নতি হয়নি। চোখের আলো ফিরে পেতে সহায় সম্বল গরু,ছাগল সব কিছু বিক্রি করে ২০১৯ সালের নেপালে যায় চিকিৎসার জন্য। সেখানে চিকিৎসা বাবদ ১ লক্ষ ৪৩ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়।
চিকিৎসক আশ্বাস দিয়েছিলেন ধীর ধীরে তার চোখের উন্নতি হবে। পরের বছর আবারও তাকে ফলোআপের নেপালে আসতে বলেন চিকিৎসকরা। কিন্তু অর্থের অভাব এবং করোন পরিস্থিতিতে তার আর যাওয়া হয়নি। বর্তমানে অনেক কষ্ট করে সংসার চালাচ্ছেন অন্ধ আইয়ুব হোসেন। এ ব্যাপারে অন্ধ আইয়ুব হোসেন বলেন, তার কোন সহায় সম্পত্তি নেই। খাস জমিতে কোন রকম কুঁড়ে ঘর তুলে বসবাস করছেন। এক মেয়ে ও দুই ছেলেকে বিয়ে দিয়েছেন। ছোট ছেলে বিয়ে করলেও বউ নিয়ে তার সংসারে থাকলেও খরচ তেমন দেয় না।
ছোট মেয়ে আলতাদিঘী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়াশুনা করছে। গত কয়েক বছর ধরে বাড়ীর পার্শে আলতাদিঘীর উত্তর সীমান্ত ঘেঁষা পাড়ে বাঁশের ম্যাচা বসিয়ে উপর খোলা আকাশের নিচে পান,বিড়ি-সিগারেট,বাদাম,বুট,মুড়ি মাখা,কোমল পানীর দোকান বসিয়েছে। বর্তমানে স্কুল বন্ধ থাকায় তার ছোট মেয়ে দোকানে তাকে সাহায্য করছে। খোলা আকাশের নিচে দোকান হওয়ার রোদ ও বৃষ্টিতে তাকে ভিজে দোকানের মালামাল রক্ষা করতে হয়। তাছাড়া সীমান্তে জিরো পয়েন্টের কাছাকাছি হওয়ায় অনেক সময় ভারতীয় সীমান্ত রক্ষাবাহিনী (বিএসএফ) তার দোকান উঠিয়ে দেয়।
অনেকটা তাদের দয়ার উপর দোকান বসানো হয়। আলতাদিঘীতে আসা ভ্রমণ পিপাসু মানুষজন তার দোকাে এসে নিজে হাতে মালামাল উঠিয়ে নেন এবং সঠিক মূল্য দিয়ে থাকেন। তার অসহায়ত্ব দেখে মানুষ তাকে এ কাজে সহায়তা করেন। টাকা পয়সা লেনদানে মানুষের বিশ্বাস তার একমাত্র সম্বল। তার স্ত্রী আকতার বানু (৪৮) প্রতিদিন শালবনের পাতা কুড়িয়ে বাজারে বিক্রি করে থাকে। তার দোকানের আয় এবং স্ত্রীর পাতা বিক্রির অর্থ দিয়ে অভাব অনটনের মধ্যে দিয়ে সংসার চলছে। ১৬ বছরের অন্ধ জীবন হলেও গত বছর থেকে তিনি প্রতিবন্ধি ভাতা পাচ্ছেন।
তিন মাস পর দুই হাজার দুইশত ৫০ টাকা পাচ্ছেন। এতে সংসার চালাতে কিছুটা উপকার হচ্ছে। খাস জমিতে বাড়ী করে কোন রকমে বসবাস করছেন। তার দুচোখের আলো ফিরে পেতে চিকিৎসা করতে চান। সেক্ষেত্রে অর্থ তার কাল হয়ে দাঁড়িয়ে। তাই সরকার এবং সমাজের বিত্তশালী হৃদয়বান মানুষকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে আকুল আবেদন জানান। হৃদয়বানদের কে তার মুঠোফোন নম্বর ০১৭৯৯১৫০১৮৪ এ যোগাযোগ করতে অনুরোধ করেন। সেই সাথে মুজিব বর্ষে তাকে ভূমিহীন হিসেবে যেন একটি গৃহ প্রদান করা হয় সে ব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করেন।
উপজেলার আবিলাম (বড় চকগোপাল) গ্রামের সমাজসেবক ফসিউল বলেন,ওই পরিবারটি একটি অসহায় পরিবার। অনেক কষ্ট করে পাঁচ সদস্যের পরিবার চালাচ্ছে অন্ধ আইয়ুব হোসেন। তার চিকিৎসা ও মাথার গোঁজার ঠাঁই একখন্ড জমির জন্য সকলকে এগিয়ে আসা উচিত। ধামইরহাট ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান বিশিষ্ট সমাজসেবক এটিএম বদিউল আলম বলেন,আমি চেয়ারম্যান থাকাবস্থায় ভূমিহীন অন্ধ আইয়ুব হোসেন কে চিকিৎসা ও সংসার চালানো জন্য সাহায্য সহযোগিতা করেছি।
তারপরও একজন কর্মক্ষম ব্যক্তি যাতে তার চোখের আলো ফিরে যায় সে ব্যাপারে সকলের সহযোগিতা করা দরকার। এ ব্যাপারে ধামইরহাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার গনপতি রায় বলেন,অন্ধ মানুষ নিজে দোকান করে সংসার চালাচ্ছেন বর্তমান সমাজে বিরল। বিষয়টি আমার জানা ছিল না। সে প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীণ হলে মুজিব বর্ষে তাকে আবশ্যই তাকে গৃহ প্রদান করা হবে। এছাড়া তার চিকিৎসার জন্য সকলকে এগিয়ে আসার জন্য উদাত্ত আহবান জানান।
