১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিজ্ঞাপন
Amader Rajshahi

পশ্চিমাঞ্চল রেলে মুখস্থ কন্ট্রোলিংয়ে ট্রেন চলাচল, বাড়ছে বিলম্ব-ভোগান্তি

প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯:৪৯ অপরাহ্ণ | বিভাগ: জাতীয়
পশ্চিমাঞ্চল রেলে মুখস্থ কন্ট্রোলিংয়ে ট্রেন চলাচল, বাড়ছে বিলম্ব-ভোগান্তি
বিজ্ঞাপন

স্টাফ রিপোর্টার : প্রযুক্তির যুগে ট্রেনের অবস্থান, গতি ও চলাচল নিয়ন্ত্রণ এখন অনেক বেশি সহজ হওয়ার কথা। আধুনিক ট্র্যাকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি ট্রেন কোথায় আছে, কত গতিতে চলছে এবং পরবর্তী স্টেশনে কখন পৌঁছাতে পারে—এসব তথ্য মুহূর্তেই জানা সম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের পাকশী কন্ট্রোলের ট্রেন পরিচালনায় এখনো পুরোনো ধাঁচের ‘মুখস্থ কন্ট্রোলিং’ পদ্ধতি অনুসরণের অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে এক ট্রেনের বিলম্ব সামাল দিতে গিয়ে অন্য ট্রেনও অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ সময় আটকে পড়ছে। সাম্প্রতিক পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের একটি ঘটনাকে ঘিরে এমন প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। রংপুরগামী বিলম্বিত রংপুর এক্সপ্রেস টাঙ্গাইল স্টেশন থেকে প্রায় ৫ দশমিক ৭ কিলোমিটার দূরে করটিয়া এলাকায় অবস্থান করার সময় ঢাকা অভিমুখী চিলাহাটি এক্সপ্রেসকে ইব্রাহিমাবাদে আটকে রাখা হয়। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ওই সময় ট্রেন দুটির অবস্থান ও গতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কন্ট্রোলিং করা হলে অপেক্ষার সময় অনেকটাই কমানো সম্ভব ছিল।
রেলওয়ের সংশ্লিষ্টদের মতে, রংপুর এক্সপ্রেস যে গতিতে এগোচ্ছিল, তাতে টাঙ্গাইল এলাকায় চিলাহাটি এক্সপ্রেসের সঙ্গে ক্রসিংয়ের ব্যবস্থা করা গেলে রংপুর এক্সপ্রেসকে সর্বোচ্চ আনুমানিক ১০ থেকে ১২ মিনিটের মতো সময় ক্ষতির মুখে পড়তে হতো। কিন্তু বাস্তবে চিলাহাটি এক্সপ্রেস ইব্রাহিমাবাদে ৩০ মিনিটেরও বেশি সময় আটকে থাকে। এতে একটি ট্রেনের বিলম্বের প্রভাব অন্য ট্রেনের ওপরও পড়ে এবং যাত্রীদের সময়ের অপচয় বাড়ে।
রেলওয়ের অপারেশন ব্যবস্থায় ‘কন্ট্রোলিং’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোন ট্রেনকে কোথায় থামানো হবে, কোন ট্রেনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এবং কোথায় দুটি ট্রেনের ক্রসিং করানো হবে—এসব সিদ্ধান্তের ওপর ট্রেন চলাচলের সময়ানুবর্তিতা অনেকাংশে নির্ভর করে। বিশেষ করে একই রুটে একাধিক আন্তনগর ট্রেন চলাচল করলে কয়েক মিনিটের ভুল সিদ্ধান্তও পরবর্তী সময়ে বড় ধরনের বিলম্ব তৈরি করতে পারে।
অভিযোগ রয়েছে, আধুনিক প্রযুক্তি ও ট্রেনের অবস্থান শনাক্ত করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো অভিজ্ঞতা ও প্রচলিত হিসাবের ওপর নির্ভর করেই ট্রেন নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ এটিকে ‘মুখস্থ কন্ট্রোলিং’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাদের প্রশ্ন, যখন ট্রেনের অবস্থান হাতের মুঠোয় থাকা প্রযুক্তির মাধ্যমে জানা সম্ভব, তখন বাস্তব সময়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে কেন আরও দক্ষভাবে ট্রেন পরিচালনা করা হবে না?
রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলে ট্রেনের বিলম্ব নিয়ে যাত্রীদের অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। নির্ধারিত সময়ের তুলনায় ট্রেন দেরিতে চলা, স্টেশনে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা এবং এক ট্রেনের কারণে অন্য ট্রেনকে আটকে রাখার মতো ঘটনায় যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে রেলওয়ের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, লাইন ও সিগন্যাল ব্যবস্থার বিভিন্ন সমস্যা এবং অপারেশনাল সিদ্ধান্তের বিষয়টি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সব বিলম্বের দায় কন্ট্রোলিংয়ের ওপর চাপানোও ঠিক হবে না। কোনো ট্রেন আগে থেকেই বিলম্বিত থাকলে, লাইনের সক্ষমতা, সিগন্যাল, ক্রসিং পয়েন্ট ও অন্যান্য ট্রেনের অবস্থান বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তবে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে সেই বিলম্ব আরও দীর্ঘ হয়—এটিও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
রেলওয়ের দায়িত্বশীল একটি সূত্র বলছে, আধুনিক ট্রেন পরিচালনা ব্যবস্থায় শুধু ট্রেনের অবস্থান জানা যথেষ্ট নয়; সেই তথ্য ব্যবহার করে সম্ভাব্য সংঘাত বা বিলম্ব আগেই অনুমান করে বিকল্প পরিকল্পনা নেওয়াও জরুরি। কোথায় ট্রেন থামালে যাত্রীদের কম সময় নষ্ট হবে, কোন ট্রেনকে আগে চলতে দিলে পুরো সেকশনের ওপর বিলম্বের চাপ কমবে—এসব বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে কন্ট্রোলিং করা প্রয়োজন।
রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রযুক্তিনির্ভর ট্রেন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে মাঠপর্যায়ের কন্ট্রোলিং পদ্ধতির আরও সমন্বয় প্রয়োজন। একই সঙ্গে কন্ট্রোলারদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন এবং বিলম্বের কারণ পর্যালোচনার ব্যবস্থা জোরদার করা হলে ট্রেন চলাচলে সময়ানুবর্তিতা বাড়ানো সম্ভব।
যাত্রীদের প্রশ্ন, আধুনিক প্রযুক্তি ও ট্রেন ট্র্যাকিং ব্যবস্থা থাকার পরও যদি একটি ট্রেনকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে আধা ঘণ্টার বেশি দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, তাহলে প্রযুক্তির সুফল কোথায়? রেলের সময়ানুবর্তিতা শুধু নতুন ট্রেন বা নতুন রেললাইন নির্মাণের ওপর নির্ভর করে না; সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এ বিষয়ে পাকশী কন্ট্রোলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি (দেননি)। এছাড়া পশ্চিমাঞ্চলের চিফ কন্ট্রোলার(সিওপিএস) অফিসে গেলেও, সিওপিএস মাহাবুবুর রহমান সাক্ষাত বা বক্তব্য দেননি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে পরবর্তী প্রতিবেদনে তা যুক্ত করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই গুরুত্বপূর্ণ পদটিতে বসেও মাহবুবুর রহমান (সিওপিএস)তিনি সময় মত অফিসে আসেন না, এমন কি সপ্তাহের ৩/৪ দিন অফিসেই থাকেন’না। এছাড়া তার ওপর রয়েছে, তিনি কোন মিডিয়াকর্মীর সাথে দেখা করেন না, কথাও বলেন না।
রেলওয়ের পুরো নেটওয়ার্কে নিরাপদ ও সময়নিষ্ঠভাবে যাত্রীবাহী ও মালবাহী ট্রেন চলাচল পর্যবেক্ষণ করা। ট্রেনের ইঞ্জিন (লোকোমোটিভ) এবং বগি (ওয়াগন ও কোচ) সঠিক নিয়মে বণ্টন ও নিয়ন্ত্রণ করা। সময়ানুবর্তিতা বজায় রাখা এবং মালবাহী ট্রেনের ধারণক্ষমতা সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা।
ভারত বা নেপালের সাথে আন্তর্জাতিক ট্রেন ও পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে যোগাযোগ ও সমন্বয় রক্ষা করা। নির্দিষ্ট ঘটনাটির কন্ট্রোলিং সিদ্ধান্ত, সংশ্লিষ্ট ট্রেনগুলোর প্রকৃত অবস্থান ও সময় এবং কেন চিলাহাটি এক্সপ্রেসকে ইব্রাহিমাবাদে দীর্ঘ সময় আটকে রাখা হয়েছিল—তা খতিয়ে দেখা হলে বিষয়টির বাস্তব চিত্র আরও স্পষ্ট হবে। প্রশ্ন এখন একটাই—আধুনিক ট্র্যাকিং প্রযুক্তির যুগে রেলের ট্রেন নিয়ন্ত্রণ কি এখনো পুরোনো অভ্যাস ও অনুমাননির্ভর পদ্ধতিতে চলবে, নাকি যাত্রীদের সময়ের মূল্য বিবেচনায় এনে কন্ট্রোলিং ব্যবস্থায়ও আধুনিকায়ন করা হবে?

পাঠকদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন