স্বস্তির বৃষ্টিতে আমনের বেশি ফলনের আশা রাজশাহীর কৃষকদের
আবুল কালাম আজাদ : ফুল আসা ও দানা গঠনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বৃষ্টির জন্য অপেক্ষায় ছিলেন রাজশাহীর আমনচাষিরা। কয়েক দিনের টানা শুষ্ক আবহাওয়ায় জমিতে সেচ দিতে গিয়ে বাড়ছিল উৎপাদন খরচ। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত আর্দ্রতার অভাবে ফলন নিয়েও তৈরি হয়েছিল শঙ্কা। এর মধ্যে ভারী বৃষ্টিতে সেই দুশ্চিন্তা অনেকটাই কেটেছে। জমিতে ফিরেছে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা, কমেছে সেচের প্রয়োজন। এতে একদিকে আমনের ফলন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে বিঘাপ্রতি প্রায় এক হাজার টাকা পর্যন্ত সেচ খরচ সাশ্রয়ের আশা করছেন কৃষকেরা। আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে সর্বোচ্চ ৯৯ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। দীর্ঘ শুষ্কতার পর এ বৃষ্টিতে আমনখেতে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা ফিরে এসেছে। ফলে সবুজে ছেয়ে গেছে জেলার বিস্তীর্ণ মাঠ। খরা ও বাড়তি সেচ ব্যয়ের চাপ কিছুটা কমে এখন কৃষকের অপেক্ষা ধানের শিষে দানা ভরা এবং শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত ফলন ঘরে তোলার।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর)জেলার পবা উপজেলার বিভিন্ন এলাকার আমনখেত ঘুরে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক বৃষ্টির পর ধানগাছগুলো বেশ সতেজ হয়ে উঠেছে। অনেক জমিতে নতুন করে সেচ দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। কৃষকেরা বলছেন, বৃষ্টির কারণে শুধু সেচের খরচই কমেনি, জমিতে প্রাকৃতিকভাবে পানি পাওয়ায় ধানের বৃদ্ধি ও শিষ বের হওয়ার অবস্থাও ভালো হয়েছে। পবা উপজেলার উজিরপুকুর এলাকার কৃষক হেফাজ উদ্দিন সাড়ে পাঁচ বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছেন। তিনি বলেন, “বৃষ্টিতে ধানখেতের কোনো ক্ষতি হয়নি, বরং অনেক উপকার হয়েছে। কৃত্রিম সেচের পানির চেয়ে বৃষ্টির পানি পেয়ে ধানগাছগুলো অনেক সতেজ ও সুন্দর হয়ে উঠছে। গত বছর বিঘাপ্রতি ২২ মণ ধান পেয়েছিলাম। এবারও ভালো ফলনের আশা করছি।
কৃষকদের হিসাবে, বিএমডিএর ডিপের সেচে একবার পানি দিতে বিঘাপ্রতি প্রায় ২৫০ টাকা খরচ হয়। জমির প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিকবার সেচ দিতে হয়। সাম্প্রতিক বৃষ্টির কারণে দুই থেকে তিন দফা সেচ কম লাগলে বিঘাপ্রতি প্রায় ৫০০ থেকে ৭৫০ টাকা, আর পরিস্থিতিভেদে সর্বোচ্চ প্রায় এক হাজার টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় হতে পারে বলে কৃষকেরা মনে করছেন।
পবা উপজেলার খড়খড়ি এলাকার কৃষক হাসিব আলী বলেন, “আমন ধানের জন্য বৃষ্টির পানি খুবই উপকারী। সেচের খরচ কমে যায়। বৃষ্টিতে ধানের পাতাও পরিষ্কার হয়ে যায়। গত বছর বিঘায় ২০ মণ ধান পেয়েছিলাম। এবারও ভালো ফলনের আশা করছি।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রাজশাহী জেলায় ৮২ হাজার ৪৫২ হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ হয়েছে। এসব জমি থেকে ৩ লাখ ১৪ হাজার ৩৩৬ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
মৌসুমের শুরুতে বীজতলা তৈরি ও চারা রোপণের পর কৃষকেরা সার প্রয়োগ, আগাছা পরিষ্কার, সেচ ও রোগবালাই দমনে ব্যস্ত ছিলেন। তবে বৃষ্টির ঘাটতি থাকায় অনেক এলাকায় জমির আর্দ্রতা ধরে রাখতে সেচের ওপর নির্ভরতা বাড়ে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি আমনের কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
কৃষকদের মতে, সময়মতো বৃষ্টি পাওয়ায় এখন সেচের ওপর চাপ কমবে। ফলে ডিজেল, বিদ্যুৎ বা গভীর নলকূপের পানি ব্যবহারের ব্যয় কমার পাশাপাশি জমিতে আর্দ্রতা ধরে রাখা সহজ হবে। এতে আমন উৎপাদনে সামগ্রিক ব্যয় কিছুটা কমে কৃষকের নিট লাভ বাড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, ধানে ফুল আসা ও দানা গঠনের সময় জমিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে পানির ঘাটতি হলে ধানের শিষে দানা কম হওয়া কিংবা অপুষ্ট দানা তৈরির ঝুঁকি থাকে। সে দিক থেকে দীর্ঘ শুষ্কতার পর পাওয়া বৃষ্টি আমনের জন্য ইতিবাচক।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোস্তফা কামাল হোসেন বলেন, চলতি মৌসুমে জেলায় ৮২ হাজার ৪৫২ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ হয়েছে। ধানে ফুল আসা ও দানা গঠনের সময়ে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া ফলনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক বৃষ্টি ধানের বৃদ্ধি ও ফলনের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, এবার আধুনিক জাত ও কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহারও বেড়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বৃষ্টিতে আমনখেতে স্বস্তি ফিরলেও কৃষকেরা এখন শেষ সময়ের আবহাওয়া নিয়ে সতর্ক। অতিরিক্ত বৃষ্টি বা জলাবদ্ধতা হলে ধানের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। আবার ধান পাকার সময় অতিবৃষ্টি হলে শিষ থেকে ধান ঝরে পড়া কিংবা রোগবালাইয়ের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তাই বাকি সময়ে স্বাভাবিক আবহাওয়া চান কৃষকেরা। দীর্ঘ শুষ্কতার পর কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি রাজশাহীর আমনচাষিদের আপাতত স্বস্তি দিয়েছে। কমেছে সেচের চাপ, কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে উৎপাদন খরচও। এখন আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে সবুজ আমনখেত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পরিণত হবে সোনালি ধানের মাঠে—এমন প্রত্যাশাই কৃষকদের।
