৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিজ্ঞাপন
Amader Rajshahi

বারানয় নদীতে হঠাৎ বিভিন্ন প্রজাতের মাছে মড়ক

প্রকাশিত: ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮:৫৯ অপরাহ্ণ | বিভাগ: স্পেশাল নিউজ
বারানয় নদীতে হঠাৎ বিভিন্ন প্রজাতের মাছে মড়ক
বিজ্ঞাপন

ফারুক আহমেদ : রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার বারনয় নদীর তালতলী মৎস্য অভয়াশ্রম এলাকায় হঠাৎ মাছ মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বিকেল ও রাতে নদীর পানিতে অস্বাভাবিকতা দেখা দেওয়ার পর শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) সকালে বিভিন্ন স্থানে মরা মাছ ভেস উঠতে দেখা যায়। খবর ছড়িয়ে পড়লে নদীর দুই তীরে মাছ ধরতে শত শত মানুষের ভিড় জমে। নদীপাড়ের স্থানীয়দের অভিযোগ, বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হলেও ঘটনার পরপরই নদীর পানির নমুনা সংগ্রহ, মাছের মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান বা দূষণের উৎস শনাক্তে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। নদী পাড়ের পার্শ্ববর্তী স্থানীয়দের ভাষ্য, বৃহস্পতিবার রাতে থেকেই নদীর পানিতে গ্যাসের মতো বুদবুদ ও অস্বাভাবিকতা দেখা যায়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীর বিভিন্ন অংশে মাছ মরে ভেসে উঠতে থাকে। শুক্রবার সকালে বিষয়টি আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন বয়সী মানুষ জাল, হাতজালসহ নানা উপায়ে মাছ ধরতে নদীর দুই পাড়ে জড়ো হন। বারানয় নদীতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই বারনই নদীর দুই তীরে মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। কেউ পানিতে নেমে, আবার কেউ তীর থেকে জাল ফেলে মাছ সংগ্রহ করছেন। মাছ মারা যাওয়ার প্রকৃত কারণ নিশ্চিত না হলেও মরা ও দুর্বল মাছ সংগ্রহে মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যায়। বাগমারা এলাকার স্থানীয়রা জানান, ঘটনার খবর বাগমারা উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। তবে দ্রুত পানির নমুনা সংগ্রহ, মৃত মাছ পরীক্ষা কিংবা দূষণের সম্ভাব্য উৎস চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে তাদের অভিযোগ।তবে নদীতে মাছ মারা যাওয়ার প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পানিতে গ্যাসের মতো বুদবুদ দেখা গেলেও এটিই মাছ মৃত্যুর কারণ- এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা প্রয়োজন।
দূষণে বিপর্যস্ত বারনই : বারনই নদীতে হঠাৎ মাছ মারা যাওয়ার ঘটনায় নতুন করে সামনে এসেছে নদীটির দীর্ঘদিনের দূষণ ও পরিবেশগত সংকটের বিষয়টি। ২০২৫ সালের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজশাহী নগরীর তরল বর্জ্য বিভিন্ন খাল হয়ে বারনই নদীতে গিয়ে পড়ছে। পাশাপাশি নদীর দুই পাশের হাট-বাজারের বর্জ্যও নদীতে ফেলার অভিযোগ রয়েছে। এসব বর্জ্যের কারণে নদীর পানি দূষিত হয়ে মাছ ও জলজ জীববৈচিত্র্য হুমকিতে পড়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীরা অভিযোগ করে আসছেন। নওহাটা, বাগমারা ও তাহেরপুর এলাকার পৌর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণেও নদীতে আবর্জনা পড়ছে বলে বিভিন্ন সময় অভিযোগ উঠেছে। নির্দিষ্ট ডাম্পিং ব্যবস্থা না থাকায় নদী ও আশপাশের জলাশয়কে বর্জ্য ফেলার স্থান হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।এর আগে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বারনই নদীর পানিতে রাসায়নিক ও দূষিত বর্জ্য মেশার বিষয়টি উঠে এসেছে। এর ফলে মাছের অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে এবং নদীপাড়ের জেলে পরিবারের অনেকে মাছের সংকটের কারণে পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হয়েছেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
পানিতে অক্সিজেন : বারনয় নদীর পানি নিয়ে আগের গবেষণার তথ্যও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নদীর একটি নমুনায় দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা প্রতি লিটারে ১ দশমিক ২ মিলিগ্রাম পাওয়া গিয়েছিল। জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনধারণের জন্য পানিতে পর্যাপ্ত দ্রবীভূত অক্সিজেন প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে জৈব বর্জ্যসহ বিভিন্ন দূষণ নদীর পানিতে জমলে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গিয়ে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর জন্য প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি হতে পারে। তবে আগের গবেষণায় পাওয়া অক্সিজেনের ঘাটতির সঙ্গে শুক্রবারের মাছ মারা যাওয়ার ঘটনার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা বর্তমান পানির নমুনা পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বারনয় নদী নিয়ে আগের বিভিন্ন আলোচনা সভায়ও নদীর বিভিন্ন অংশে কচুরিপানা, নাব্যতা সংকট ও বর্জ্য জমে থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে। নদীর কোনো কোনো অংশে দীর্ঘদিন কচুরিপানা জমে নৌচলাচল ব্যাহত হওয়ার কথাও বলা হয়েছে। তবে কচুরিপানা বা পচনশীল বর্জ্যই বর্তমান মাছ মৃত্যুর সরাসরি কারণ -এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে পানির রাসায়নিক ও জীববৈজ্ঞানিক পরীক্ষা প্রয়োজন। বারনয় নদী ও এর জলজ প্রাণী রক্ষায় মৎস্য বিভাগের কার্যক্রমও রয়েছে। গত ১৫ আগস্ট বাগমারায় বারনয় ও ফকিরনী নদীর সংযোগস্থলে নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি জালের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। এ সময় নিষিদ্ধ জাল জব্দ ও ধ্বংস করা হয়। তবে মাছ ধরার নিষিদ্ধ পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নদীর পানির গুণগত মান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং অভয়াশ্রমের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায়ও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
নমুনা পরীক্ষার দাবি : বর্তমান পরিস্থিতিতে তালতলী মৎস্য অভয়াশ্রমের পানি ও মৃত মাছের নমুনা দ্রুত পরীক্ষাগারে পাঠানো জরুরি। পানির দ্রবীভূত অক্সিজেন, অ্যামোনিয়া, পিএইচ, জৈব দূষণসহ প্রয়োজনীয় সূচক পরীক্ষা করা হলে মাছ মারা যাওয়ার সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ধারণা পাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে পানিতে কোনো রাসায়নিক বা বিষাক্ত পদার্থ মিশেছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে কচুরিপানা ও পচনশীল বর্জ্য জমে পানিতে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা দরকার। স্থানীয়দের দাবি, শুধু মরা মাছ তুলে নেওয়া নয়, মাছ মৃত্যুর মূল কারণ চিহ্নিত করে স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে তালতলী মৎস্য অভয়াশ্রম থেকে কচুরিপানা ও বর্জ্য অপসারণ, নদীর পানির নিয়মিত মান পরীক্ষা এবং নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। বারনয় নদী ঘিরে দীর্ঘদিনের দূষণ, নাব্যতা সংকট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব সংকটের মধ্যে নতুন করে মাছ মারা যাওয়ার ঘটনা তাই শুধু এক দিনের মাছ মৃত্যুর ঘটনা নয়; এটি নদীটির দীর্ঘস্থায়ী পরিবেশগত সংকটেরও একটি সতর্ক সংকেত। এই নদীতে যে সকল মাছগুলো পাওয়া যেত তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বোয়াল, রুই, কাতলা, টেংরা, বাতাসী, নোনা-দুধা, জাল মাছ, শোল ও চিংড়ি মাছ, আইড় মাছ, ছোট-বড় অনেক প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। এছাড়া এই নদীতে এক সময় শুশুর দেখা মিলতো। চলাচল করত ছোট-বড় লঞ্চ,পাল তোলা নৌকা। বারানয় নদী এখন আর সেই গভীরতা নেই ভরাট হয়ে গেছে। ফলে নদী দূষণ আক্রান্ত হয়ে নদীর জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রায় বিলুপ্ত হওয়ার পথে। তবে বর্তমান ঘটনার প্রকৃত কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সরকারি পানি ও মাছের পরীক্ষার প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

পাঠকদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন