নতুন ঝুঁকিতে নেপাল সতর্ক করলেন বন্যা বিশেষজ্ঞ
নেপাল ও তিব্বতে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর এখন নতুন করে সৃষ্ট ঝুঁকিই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় বলে সতর্ক করেছেন এক বন্যা বিশেষজ্ঞ। রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্যার আগাম সতর্কতা ও দুর্যোগ ঝুঁকি বিষয়ক গবেষক জেফ দা কস্তা জানিয়েছেন, ওই অঞ্চলের অবকাঠামোও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে দ্বিতীয়বারের বন্যা প্রথমবারের মতো বড় না হলেও গুরুতর ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে পারে। দা কস্তার মতে, দুর্যোগের ফলে ধ্বংসাবশেষ নদীর গতিপথ আটকে দিয়ে উজানে নতুন নতুন হ্রদ তৈরি করেছে। এসব হ্রদ ও নদীর প্রবাহ আটকে দেওয়া বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে এবং সেগুলো কোথায় ভেঙে পড়তে পারে, তা এখন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’। তিনি বলেন, চীন ও নেপালের মধ্যে এসব পর্যবেক্ষণসংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান করাও জরুরি। কারণ উজানে যা ঘটে, তা খুব দ্রুত সীমান্তের ওপারে থাকা মানুষের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এই দুর্যোগের প্রেক্ষাপট হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক উষ্ণতা হিমালয়জুড়ে হিমবাহ, পারমাফ্রস্ট (স্থায়ীভাবে জমে থাকা মাটি) এবং পাহাড়ের ঢালের স্থিতিশীলতায় পরিবর্তন আনছে বলেও জানান তিনি। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, আরও বিশ্লেষণ ছাড়া এবারের দুর্যোগকে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল হিসেবে দায়ী করা যায় না।
এদিকে চীন সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়াবহ বন্যায় নেপালে অন্তত ৭৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এখনো ২ হাজার ৪৯৮ জন নিখোঁজ রয়েছে। গতকাল রোববার দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এ তথ্য জানিয়েছে। এদিকে উদ্ধার তৎপরতা পঞ্চম দিনে গড়িয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এর আগে জানায়, বুধবারের দুর্যোগে তিব্বতে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছে। এ হিসাবে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৫০ এবং নিখোঁজ ৩ হাজার ৪৪ জন। নেপালে নিখোঁজের সংখ্যা গত শনিবার সন্ধ্যায় প্রকাশিত সর্বশেষ হিসাবের ২ হাজার ৪২৬ থেকে বেড়ে ২ হাজার ৪৯৮ জনে দাঁড়িয়েছে। নিখোঁজদের তালিকায় ৫৮৯ জন বিদেশি রয়েছে। আগের তালিকায় এ সংখ্যা ছিল ৫১৭ জন। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এ তালিকায় নদীর তীরে অবস্থিত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর ৯৩৩ জন শ্রমিকও রয়েছেন। ওই নদীপথেই বন্যার প্রবল স্রোত ধেয়ে যায় বলে ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি জানিয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ পর্যন্ত মোট ৮ হাজার ১৮৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ২২৭ জন বিদেশি। ভারতে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নেপাল থেকে প্রবাহিত নদীগুলো থেকে সাতটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এগুলো বন্যায় মৃতদের মরদেহ বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এই সংখ্যা মোট এদিকে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় বিপর্যস্ত নেপালে উদ্ধার হওয়া পরিচয়হীন ও দাবিদারহীন মরদেহগুলো দাফন শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। মরদেহের দ্রুত পচন এবং এ থেকে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে দাফনের আগে প্রতিটি মরদেহ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে আলাদা শনাক্তকরণ বা রেফারেন্স নম্বরও সংরক্ষণ করা হচ্ছে। গত বুধবার সকালে সুনামির মতো পানি ও কাদার প্রবল স্রোত নেপালের বিভিন্ন গ্রাম ও শহরে আঘাত হানার পর এখন পর্যন্ত অন্তত ৭৩৪টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ভারতের সীমান্তবর্তী দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা চিতওয়ানে সবচেয়ে বেশি ২৩৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পর্যাপ্ত জায়গা ও প্রয়োজনীয় সুবিধার অভাবে চিতওয়ানের হাসপাতালগুলোতে মরদেহ সংরক্ষণে সংকট দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় গত শনিবার জেলার কর্তৃপক্ষ মরদেহগুলো দাফনের সিদ্ধান্ত নেয়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, অস্থায়ী ব্যবস্থায় রাখা মরদেহগুলোতে পচন বাড়তে থাকায় দুর্গন্ধের পাশাপাশি সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। এক কর্মকর্তা বলেন, ‘মরদেহের সংখ্যা বাড়তে থাকায় আমরা একটি বাড়িকে শীতলীকরণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে সেখানে মরদেহ রাখছিলাম। এখন ওই বাড়িতেও জায়গা শেষ হয়ে যাওয়ায় মরদেহ দাফন করা ছাড়া আমাদের আর কোনো বিকল্প ছিল না।
ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ : ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম এনডিটিভি বলছে, দাফনের আগে প্রতিটি মরদেহ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করছেন কর্মকর্তারা। ভবিষ্যতে পরিচয় শনাক্তের সুবিধার্থে প্রতিটি মরদেহের জন্য আলাদা শনাক্তকরণ বা রেফারেন্স নম্বরও সংরক্ষণ করা হচ্ছে। প্রতিটি মরদেহের জন্য একটি স্বতন্ত্র পরিচয় নম্বর ও অবস্থানের তথ্য রাখা হচ্ছে। পরবর্তীতে ডিএনএ পরীক্ষায় পরিচয় মিলে গেলে স্বজনরা সেই মরদেহ কবর থেকে তুলে নিতে পারবেন। কর্মকর্তারা জানান, গত শনিবার বিকেল পর্যন্ত ১০০টির বেশি মরদেহের ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করা হয়েছে এবং সেগুলো দাফনের জন্য প্রস্তুত ছিল। পরে মরদেহগুলো পরিচয় নম্বর লেখা ব্যাগে রাখা হচ্ছে। দাফনের পরবর্তীতে সহজে উত্তোলন করা যায়, সে জন্য দেড় মিটার গভীর গর্ত খোঁড়া হচ্ছে। প্রতিটি মরদেহের মধ্যে প্রায় ৪০ সেন্টিমিটার দূরত্ব রাখা হচ্ছে, যাতে ডিএনএ পরীক্ষায় শনাক্ত হওয়া নির্দিষ্ট মরদেহটি সহজে উত্তোলন করা যায়।
যেভাবে মিলবে পরিচয় : নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে থাকা ব্যক্তিদের দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ডিএনএ নমুনা দিতে হবে। পরীক্ষার ফল পাওয়ার পর নেপালের স্বাস্থ্য বিভাগ তা দাফন করা মরদেহের ডিএনএর সঙ্গে মিলিয়ে দেখবে। পরিচয় শনাক্ত হলে মরদেহের নম্বরের ভিত্তিতে পুলিশ তাদের নথি যাচাই করে কবরের সঠিক অবস্থান বের করবে। এরপর মরদেহটি কবর থেকে তুলে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এদিকে, পরিচয়হীন ও দাবিদারহীন মরদেহগুলোর তথ্য একটি ওয়েবসাইটেও প্রকাশ করেছে নেপাল পুলিশ। কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, শতাধিক বিদেশি নাগরিকসহ নেপালে এখনো প্রায় ২ হাজার ৫০০ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।-এফএনএস
